শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ:
শিশু আছমা খাতুন পুতুল নিয়ে বাড়ির উঠোনে খেলছিল। তখন সে জানত না, একটু পরেই তার শৈশব রক্তাক্ত হতে যাচ্ছে। হঠাৎ একদল বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয় শিশুটি। চারপাশের মানুষের চিৎকার আর কান্নায় যখন পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল, তখন রক্তাক্ত শিশুটির চোখে ছিল আতঙ্ক।
এটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়; নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব এখন অনেকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর ও উপজেলার বিভিন্ন অলি-গলিতে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ানো এসব কুকুরের কারণে পথচারী, বিশেষ করে শিশু ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বেওয়ারিশ কুকুরের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণে কোনো সাম্প্রতিক সরকারি জরিপ না থাকায় উপজেলার মোট কুকুরের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জে নিয়মিতই কুকুরের কামড় ও আঁচড়ের শিকার হয়ে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসছেন। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
কুকুরের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে হয়। গভীর ক্ষতের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত চিকিৎসাও দেওয়া হয়।
কুকুরের আক্রমণের শিকার আনাস ও জান্নাতুল বলেন, ‘হঠাৎ কুকুরটি এসে লাফ দিয়ে কামড়ে দেয়। সামনে যাকে পেয়েছে, তাকেই আক্রমণ করেছে।’
মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবে রাস্তায় হাঁটাও দায় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও শিশুদের জন্য এটি ভয়ের কারণ।’
নগরপাড়া এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগে কুকুরের কামড়ে তার ছোট ভাই মারা গেছেন।
রুহিলা এলাকার আবুল হোসেনের শিশু মেয়ে রাফিয়াও দুই বছর আগে কুকুরের কামড়ে মারা যায় বলে জানান তিনি। আবুল হোসেন বলেন, ‘কুকুরের কারণে পোলাপান ঘর থেকে বাইরে বের হতে পারে না। আমার মেয়েটা রুটি নিয়ে বাইরে গিয়েছিল। তখনই কুকুরে কামড় দেয়। টিকা দেওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন ভোগার পর সে মারা যায়।’
এদিকে কুকুরের কামড়ের পর চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও রয়েছে। অনেক সময় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় টিকা না পেয়ে রোগীদের অন্যত্র যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।
আনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘আমার নাতিকে কুকুর কামড় দিলে রূপগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে বলা হয়, এখানে টিকা নেই; মহাখালী চলে যেতে হবে।’
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জোবায়ের নাদিম বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালেও কুকুরে কামড়ানো রোগী আসে। কুকুর কামড়ানো বা আঁচড়ানোর পর ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও প্রবাহিত পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এআরভি এবং গভীর ক্ষতের ক্ষেত্রে আরআইজি দেওয়ার বিষয়টি চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।’
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সজল কুমার বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমাদের কাছে কুকুরের টিকা নেই। কোনো সরবরাহও নেই। আদালতের নির্দেশনার কারণে কুকুর নিধন করা যায় না। তবে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে।’
স্থানীয়দের দাবি, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মানবিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কুকুরের কামড়ের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে এ ধরনের আতঙ্ক ও দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।