বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ন
নাগেশ্বরী উপজেলা প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম জেলার একটি সম্ভাবনাময় ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ নাগেশ্বরী উপজেলা। এখানকার উর্বর ভূমি, নদীমাতৃক পরিবেশ এবং মানুষের সরল জীবনযাপন বরাবরই এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপদের সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলার চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। দিন দিন মাদকের বিস্তার, অনলাইন জুয়ার প্রসার, চুরি, খুন এবং আত্মহত্যার মতো গুরুতর অপরাধ ও সামাজিক ব্যাধির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজের জন্য এসব প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক অশনিসংকেত।
প্রথমত, মাদকের ভয়াল থাবা নাগেশ্বরীর যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হাত বাড়ালেই বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য হওয়ায় অনেক তরুণ বিপথগামী হচ্ছে এবং কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন আরেক বিপদ—অনলাইন জুয়া। মুঠোফোনের মাধ্যমে আড়ালে-আবডালে পরিচালিত এসব জুয়ার নেশায় পড়ে অনেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক পরিবারে তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক চাপ। এর ফলে হতাশা, পারিবারিক অশান্তি এবং নানা সামাজিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, তুচ্ছ ঘটনা, পারিবারিক কলহ কিংবা সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা সমাজে উদ্বেগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনাও অত্যন্ত মর্মান্তিক। পারিবারিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কজনিত জটিলতা, মানসিক চাপসহ নানা কারণ এ ধরনের সংকটের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। একটি প্রাণের অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।
এসব অপরাধ ও সামাজিক সমস্যার পেছনে মাদকের বিস্তার, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সচেতনতার অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো যথাযথভাবে গুরুত্ব না পাওয়ার মতো বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে নাগেশ্বরীকে রক্ষা করতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রয়োজন একটি সামগ্রিক সামাজিক আন্দোলন।
পরিবার ও অভিভাবকদের ভূমিকা:
সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের চলাফেরা, বন্ধু মহল ও অনলাইন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তুলতে হবে।
মাদক ও জুয়া নির্মূল:
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাদক কারবারি এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধি:
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও যুব সংগঠনের উদ্যোগে নিয়মিত সচেতনতামূলক সভা, কাউন্সেলিং ও আলোচনা আয়োজন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
নাগেশ্বরীর আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। একটি নিরাপদ, অপরাধমুক্ত ও মানবিক নাগেশ্বরী গড়ে তুলতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমেই সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধ ও হতাশার এই প্রবণতা মোকাবিলা করে একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।