বুধবার, ২৯ Jul ২০২৬, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞাপন:
আমাদের ওয়েব সাইটে আপনাকে স্বাগতম...
শিরোনাম :
সিলেটে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারে ‘ভুতুড়ে’ টাকা কাটার অভিযোগ, ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা রূপগঞ্জে দাফনের আড়াই বছর পর কবর থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসীর লাশ উত্তোলন দক্ষিণ সুরমায় এলপিজি সিলিন্ডারে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস ক্রসিং সিন্ডিকেট সক্রিয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী চার দশকের অপেক্ষা, এখনও মেলেনি নিরাপদ আশ্রয় জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে রূপগঞ্জের দুই প্রতিবন্ধী বোন আছিয়া ও মরিয়মের রূপগঞ্জে মাদক ব্যবসা ও সেবনের অভিযোগে ১২ যুবকের কারাদণ্ড সিলেটে অবৈধ ক্রস রিফিলের সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ রূপগঞ্জে ২০০ পরিবার আবারও উচ্ছেদ আতঙ্কে, অনাবাসিক জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি এসএসসি পরীক্ষার ফল ১০ আগস্ট বিশ্বের যেকোনও দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গোলাবারুদ আছে: ট্রাম্প

রূপগঞ্জে ২০০ পরিবার আবারও উচ্ছেদ আতঙ্কে, অনাবাসিক জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি

নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ প্রতিনিধি:

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণখালী, ফুলবাড়িয়া, কুলিয়াদি, শিমুলিয়া ও রঘুরামপুর এলাকার দুই শতাধিক পরিবার আবারও উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের জন্য আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি হুকুম দখলের উদ্যোগ নেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে এ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্বাচল উপশহর নির্মাণের সময় উচ্ছেদ হওয়া আদি বাসিন্দাদের অনেকেই এসব এলাকায় নতুন করে বসতি গড়ে তুলেছেন। এখন আবারও উচ্ছেদ করা হলে তারা ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই গোপনে সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এলাকাবাসীর দাবি, বসতবাড়ি ও আবাদি জমি বাদ দিয়ে অনাবাসিক, পতিত কিংবা সরকারি খাস জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হোক।

সরেজমিনে জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে রাজউকের পূর্বাচল উপশহর নির্মাণের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ৪২টি গ্রামের ১৭টি মৌজার ৬ হাজার ১৫১ একর জমি হুকুম দখল করা হয়। পরে পূর্বাচলের আদি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে সেখানে উন্নয়নকাজ শুরু হয়। এ সময় অনেক পরিবারের বসতভিটা ও পারিবারিক কবরস্থানও বিলীন হয়ে যায়।

পরবর্তীতে পূর্বাচলের আদি বাসিন্দাদের অনেকে ফুলবাড়িয়া, রঘুরামপুর, কুলিয়াদি, শিমুলিয়া, ব্রাহ্মণখালীসহ আশপাশের এলাকায় জমি কিনে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। এরই মধ্যে পূর্বাচল উপশহরের উত্তর-পূর্ব সীমানা-সংলগ্ন এসব এলাকায় আবারও ভূমি হুকুম দখলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে রঘুরামপুর মৌজার ১৯ দশমিক ২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজার ১৫ দশমিক ৮৫ একর এবং কুলিয়াদি মৌজার ৩ দশমিক ৭০ একর জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—একবার উচ্ছেদ হওয়ার পর আবারও কি তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হবে?

স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আবাদি জমি ও বসতভিটা অধিগ্রহণ করা হলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, জীবিকার প্রধান উৎসও হারাবেন তারা। এতে সহস্রাধিক মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অনাবাসিক সরকারি খাস জমি কিংবা পতিত জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

রঘুরামপুর গ্রামের মুজিবর রহমান খান বলেন, ‘পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সেগুলো ভেঙে সেখানে প্লট নির্মাণ করা হয়েছে। এখন আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরও কি একই পরিণতির শিকার হবে?’

কুলিয়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি অধিগ্রহণের কারণে ২০০০ সালে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে কুলিয়াদি গ্রামে এসে বসবাস শুরু করি। পূর্বাচলে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এক জীবনে একবার নয়, দ্বিতীয়বার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে।’

ব্রাহ্মণখালী গ্রামের মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান এবং বহু বছরের গড়ে তোলা জীবন-জীবিকা আবারও হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পূর্বপুরুষের কবর, বসতভিটা ও জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়ে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটু দূরে এসে নতুন করে সংসার গড়েছিলাম।’

কুলিয়াদি গ্রামের মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ফসলি জমি শুধু জীবিকার উৎস নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নামমাত্র দামে জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক মানুষ সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়বে। রক্ত দেব, তবুও বাপ-দাদার বসতভিটা ছাড়ব না।’

পূর্বাচল উপশহরের আলমপুর গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে রঘুরামপুর মৌজায় এসে নতুন করে বসতি গড়েছিলেন মহসিন মিয়া। তিন শতক জমির ওপর গড়ে তোলা সেই ছোট্ট ঘরটিও এখন প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিজের দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

শিমুলিয়া গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। এই মাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সরকারি একটি সংস্থা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে। ওই টাকা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।’

আলমপুর গ্রামের মো. আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বাপ-দাদার বসতভিটা তথা নিজের জন্মস্থান হারানোর কষ্ট অন্য কেউ বুঝবে না। বসতবাড়ি হারানোদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। জমির ক্ষতিপূরণ বাস্তব বাজারমূল্য অনুযায়ী দিতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্তরা নতুন করে বসতি গড়তে পারেন।’

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, রঘুরামপুর ও কুলিয়াদি এলাকায় ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৬০০-এর বেশি।

পূর্বাচল রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ-আল-সোহান বলেন, ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যদের আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি হুকুম দখলের প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে প্রায় এক মাস আগে তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য ভূমি হুকুম দখল করা হলে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য পাওনা অবশ্যই পরিশোধ করা হবে।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, ‘ভূমি হুকুম দখলের বিষয়ে আইন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। তাদের আবেদন-নিবেদন থাকলে তা ভূমি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থাপন করা হবে।’

রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি আইন অনুযায়ী ভূমি হুকুম দখলের জমি ও ক্ষতিপূরণের বিল পরিশোধ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ বঞ্চিত হবেন না। তারা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবেন।’

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2026 shomoyerkhobor.com
Design & Developed BY starwebhostit