সোমবার, ২০ Jul ২০২৬, ০৭:২৬ অপরাহ্ন
ফুটবলে সবচেয়ে সহজ হিসাবটাই মাঝে মাঝে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর। গোল আর অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানে সব গল্প লেখা থাকে না—বিশেষ করে গল্পটা যখন এক কিশোরের, যার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে গোটা দেশের প্রত্যাশা। লামিন ইয়ামালকে ঘিরে ২০২৬ বিশ্বকাপের বিতর্ক শুরু হয়েছে ঠিক সেখানেই: একটি গোল, কোনো অ্যাসিস্ট নয়—এতে কি টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় তারকার মূল্যায়ন হয়ে গেল? সংখ্যা বলছে এক কথা, মাঠের নব্বই মিনিট বলছে অন্য কথা। আর ঠিক এর ফাঁকেই লুকিয়ে রয়েছে ফাইনালে ওঠা স্পেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদানের আলো—যেখানে প্রতিটি প্রতিপক্ষের পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল একটাই নাম: ইয়ামাল।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বেশি আলোচিত-পরীক্ষিত ফুটবলারদের একজন লামিন ইয়ামাল। পরিসংখ্যান অনেক সমর্থককে নিরাশ করেছে; বিশেষ করে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় তারকার ওপর যে প্রত্যাশা, তার বিবেচনায়। কিন্তু তার খেলার দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই ফুটে ওঠে ভিন্ন চিত্র। পরিসংখ্যান হয়তো চোখে পড়ার মতো নয়, তবে স্পেনের সামগ্রিক খেলায় তার প্রভাব স্কোরশিটের চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বার্সেলোনার এই উইঙ্গার তার অল্পবয়সী ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দাপুটে বিশ্বকাপটা খেলেননি—এটা সত্য। কিন্তু তিনি যে নগণ্য চরিত্র ছিলেন, তাও একেবারেই নয়। উরুগুয়ে, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের মতো শীর্ষ প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই তিনি ছিলেন বিপক্ষ রক্ষণভাগের মূল কেন্দ্র। একসঙ্গে একাধিক ডিফেন্ডারকে নিজের দিকে টেনে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরির ক্ষমতার কারণে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষদের বারবার বদলাতে হয়েছে তাদের খেলার পরিকল্পনা। রক্ষণভাগের পরিকল্পনাই গড়া হয়েছে তাকে ঘিরে।
ইয়ামালকে থামাতে গিয়ে নাজেহাল ডিফেন্ডাররা
ইয়ামালকে সামলানোর দায় পাওয়া বহু ডিফেন্ডার এতটাই বিপর্যস্ত হয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত তাদেরই বদলি হয়ে যেতে হয়েছে। উরুগুয়ের সানাব্রিয়া, বেলজিয়ামের মাক্সিম ডে কইপার ও ফ্রান্সের লুকাস দিনে—সবাই তার গতি আর ড্রিবলিংয়ের কাছে বারবার ব্যর্থ হয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি পর্তুগালের বিপক্ষেও—যেটি সম্ভবত টুর্নামেন্টে তার সবচেয়ে নীরব পারফরম্যান্স—নুনো মেন্দেসকে তিনি এমনভাবে অক্লান্ত আক্রমণ করেছেন যে পর্তুগিজ ফুলব্যাক চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন; তার জায়গায় নামতে হয় নেলসন সেমেদোকে।
ইয়ামাল জাদু পরিসংখ্যানের বাইরের সম্মোহন
বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেনের প্রথম গোলটি তৈরিতে ভূমিকা ছিল তার—ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনেই তিনি পথ করে দিয়েছিলেন, যেখান দিয়ে পেদ্রো পোরোর বল খুঁজে পান ফাবিয়ান রুইস। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তিনি জিতে নেন সেই পেনাল্টি, যা থেকেই আসে প্রথম গোল; আর টুর্নামেন্টের সেরা গোলগুলোর একটি করেছিলেন তিনি, যেটি অবশ্য বাতিল হয়ে যায়। কোনোটাই গোল বা অ্যাসিস্টের খাতায় গণ্য হয়নি, কিন্তু স্পেনের সাফল্যে দুটি মুহূর্তই ছিল নির্ণায়ক।
সংখ্যাগুলো বলছে গোল-অ্যাসিস্টের চেয়ে বড় কথা তার অন্তর্নিহিত পরিসংখ্যানও বলছে আকর্ষণীয় এক গল্প।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইয়ামালের পাস সফল হয় ৮৩ শতাংশ, ছয়টি শট নেন, চারটি ড্রিবলিং সম্পন্ন করেন এবং চারটি ফাউল আদায় করেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার পাস সফলতার হার ছিল ৯০ শতাংশ, সৃষ্টি করেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ—ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।
পর্তুগালের বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলে ছয়বার বল উদ্ধার করেন এবং অবিরাম রক্ষণাত্মক চাপের মধ্যেও পুরোপুরি সক্রিয় থাকেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও বড় অবদান রাখেন—একটি পেনাল্টি আদায়, একটি বড় সুযোগ তৈরি, একটি গুরুত্বপূর্ণ পাস এবং ৮৩ শতাংশ সফল পাস।
সবাই যখন গোলের নেশায় বিভোর, ইয়ামালের ভাষা ভিন্ন
তার গোলসংখ্যা নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ককে অবশ্য পাত্তা দিচ্ছেন না এই ১৯ বছরের তরুণ। সম্প্রতি লামিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সবাই যেন গোলের নেশায় পড়ে গেছে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও আমি একটি গোলই করেছিলাম, এখানেও একটি করেছি।’
সামনে শুধু বিশ্বকাপের ফাইনাল। একটি সিদ্ধান্ত অবশ্য এখনই স্পষ্ট। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নন ইয়ামাল, স্পেনের সবচেয়ে নির্ণায়ক পারফরমারও নন। কিন্তু তার অবদান গোল-অ্যাসিস্টের সারণি যা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা এই স্পেন দলের জন্য তার পা ছিল অবিরাম—কয়েকজন সতীর্থের তুলনায় ব্যাপারগুলো কম চোখে পড়লেও।