রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
নাগেশ্বরী উপজেলা প্রতিনিধি:
আজকের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে— চারদিকে শুধু জিপিএ-৫, গোল্ডেন এ প্লাস, অনার্স আর মাস্টার্স ডিগ্রির ছড়াছড়ি।
প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে, বেড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ। কিন্তু এই বিপুল পরিসংখ্যানিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঙ্কালসার সত্য: সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও ‘সুশিক্ষিত’ মানুষের
তীব্র আকাল দেখা দিয়েছে।
পার্থক্যটা স্পষ্ট করা যাক।
শিক্ষা হলো পুঁথিগত জ্ঞান বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন, যা মানুষকে একটি সার্টিফিকেট দেয়। অন্যদিকে সুশিক্ষা হলো সেই অর্জিত জ্ঞানকে নীতি, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংমিশ্রণ করার ক্ষমতা। একজন মানুষ উচ্চ ডিগ্রিধারী হতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি ঘুষ গ্রহণ করেন, অন্যের অধিকার হরণ করেন, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখান কিংবা সমাজে অসংবেদনশীল আচরণ করেন— তবে তিনি শিক্ষিত হলেও ‘সুশিক্ষিত’ নন।
আজ আমাদের চারপাশে নীতি-নৈতিকতার যে চরম অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদ। বর্তমান শিক্ষা অনেকাংশেই ‘পরীক্ষাকেন্দ্রিক’ এবং ‘জিপিএ-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে। আমরা সন্তানকে শেখাচ্ছি কীভাবে বেশি নম্বর পেতে হবে, কীভাবে প্রতিযোগিতায় অন্যকে পেছনে ফেলে ভালো চাকরি বা ক্যারিয়ার অর্জন করতে হবে। কিন্তু তাকে শেখাচ্ছি না কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়, কীভাবে অন্যের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়াতে হয় কিংবা কীভাবে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন আজ মানসম্মত মানুষ তৈরির কারখানার বদলে নিছক সার্টিফিকেট বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
একই সাথে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় পরিবারে সন্তানকে সততা, সত্যবাদিতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও সৌজন্যবোধের পাঠ দেওয়া হতো। এখন অনেক পরিবারেই নৈতিক শিক্ষার চেয়ে অর্জনের হিসাবটা বড় হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যম ও আধুনিকতার প্রভাবে তৈরি হওয়া চরম ব্যক্তিকেন্দ্রীকতা মানুষকে কেবল নিজের স্বার্থ বুঝতে শেখাচ্ছে, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
পরিণামে আমরা কী দেখছি? উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের হাতেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধ ও অবিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও শিক্ষিত সমাজ চুপ থাকছে। এই নীরবতা ও নীতিহীনতা কোনো সুস্থ সামাজিক লক্ষণ নয়।
এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণের উপায় কী?
প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু মুখস্থবিদ্যা ও গ্রেড-ভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে বেরিয়ে এসে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ‘মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠন সংক্রান্ত শিক্ষা’ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারকেই নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা হতে হবে। সন্তানদের কেবল সফল হওয়ার পেছনে না ছুটিয়ে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সমাজে সততা ও নৈতিকতার চর্চাকে পুরস্কৃত করতে হবে এবং কেবল অর্থ কিংবা ডিগ্রির ভিত্তিতে মানুষকে সম্মান দেওয়ার প্রবৃত্তি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
ডিগ্রি দিয়ে আত্মকর্মসংস্থান বা কর্মজীবন গড়ে তোলা সম্ভব, কিন্তু একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মেকি ঔজ্জ্বল্যে হারিয়ে যাওয়া নৈতিকতা ও মানবিকতাকে আমাদের ফিরিয়ে আনতেই হবে— তা না হলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ভিড়ে আমরা একটি দেউলিয়া সমাজের নাগরিক হয়েই রয়ে যাব।