বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ: সূর্য ডোবার আগেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। একদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন উপজেলার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে আয়। ফলে পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জের শিল্প ও আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এবং নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। স্থানীয় সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিক আওয়ারে এ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থাকছে। এ কারণে এলাকাভেদে দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় রাতে একটানা কয়েক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রূপগঞ্জ ও এর আশপাশের তারাব, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, কাঞ্চন ও কায়েতপাড়া এলাকায় রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় শিল্পকারখানা। এসব কারখানার মধ্যে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, স্টিল, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের সামান্য ভোল্টেজ ওঠানামা ও আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটছে। ইস্পাত ও অন্যান্য শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার অনেক মালিক জেনারেটর চালানোর সামর্থ্য না থাকায় উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিল্প মালিকদের দাবি, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ওভারলোডের কারণে রূপগঞ্জে লোডশেডিং বেড়েছে।
এ ছাড়া কিছু এলাকায় পুরোনো সঞ্চালন লাইন ও অতিরিক্ত লোড নেওয়া ট্রান্সফরমারের কারণে কারিগরি ত্রুটিও দেখা দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অপচয় নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছি না। বরাদ্দ বাড়লে লোডশেডিং কমে আসবে। পাশাপাশি জরাজীর্ণ লাইন সংস্কারের কাজ চলছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে দিনে একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গভীর রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
নগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার মোল্লা বলেন, “দিনে যেমন-তেমন। রাত হলে কী যে বিদ্যুৎ যায়! বাইরে গিয়ে বসে থাকতে হয়। আমাদের কায়েতপাড়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুতের চাপ সামাল দিতে গিয়ে আবাসিক এলাকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
রূপগঞ্জের তারাব, বরপা ও ভুলতা এলাকার টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং কারখানাগুলোও বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি শিল্প উদ্যোক্তাদের।
কারখানা মালিকদের অভিযোগ, আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কখনো কখনো কাপড় ও সুতা নষ্ট হচ্ছে। অনেক কারখানা জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
ইমেজ প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কারখানার ম্যানেজার অলি উল্লাহ বলেন, “আমাদের এখানে দিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালিয়ে পোষাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
রূপগঞ্জের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ সংকটে তুলনামূলক বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জেনারেটর বা অন্যান্য ব্যবস্থা করে উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারলেও ছোট কারখানার মালিকদের সেই সক্ষমতা নেই।
তারাব, রূপসী ও ভুলতা এলাকার পাওয়ারলুম, লেদ মেশিন ও প্যাকেজিং কারখানার কয়েকজন মালিক জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
পাওয়ারলুম কারখানার মালিক আক্কাস আলী বলেন, “দিনে ১১-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালানো অসম্ভব। ডিজেলের দাম বেশি। শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।”
ভুলতা ও গাউছিয়া এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানপাটে ক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায় বিশেষ করে ফ্রিজ ও কোল্ড স্টোরেজের পণ্য সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান তারা।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, জ্বর ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ না থাকায় কোথাও কোথাও পানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
নগরপাড়া এলাকার গৃহবধূ মরিয়ম আহমেদ বলেন, “গরম আর লোডশেডিংয়ের কারণে ছোট ছেলে কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে যায়।”
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিব জুবায়ের নাদিম বলেন, “গরমের কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এ সময় হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও থাকে। সবাইকে পর্যাপ্ত পানি ও তরলজাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কিছু এলাকায় অবৈধ সংযোগ, অতিরিক্ত লোড এবং সিস্টেম লসের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ ছাড়া কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণে আবাসিক এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা জরুরি।
রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ, মিটার স্থাপন ও বিল সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে গ্রাহকদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
তারাব পৌরসভার বরাব এলাকার বাসিন্দা মোহন মিয়া অভিযোগ করেন, “মিটার সংযোগের জন্য সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে একজনের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার পর দ্রুত সংযোগ পাওয়া গেছে।”
এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, “চার মাস ঘুরেও মিটার পাইনি। পরে অফিসের পাশের এক ব্যক্তিকে টাকা দেওয়ার পর দ্রুত সংযোগ দেওয়া হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পূর্বাচল জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মুহাম্মদ মনির হোসেন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা সরকারি বিধি অনুযায়ী গ্রাহকসেবা দিচ্ছি। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুতের খুঁটি ও তার থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। নতুন সংযোগ ও অন্যান্য সেবা পেতে দালালের দ্বারস্থ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তারাব জোনাল অফিসের ডেপুটি ম্যানেজার আশরাফুল আলম খান বলেন, “আমাদের প্রতিদিন প্রায় ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকে। এটি শিল্প এলাকা হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেশি।”
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) প্রকৌশলী আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, “আমাদের লোকবল কম থাকায় কিছু সমস্যা হতে পারে। কেউ টাকা চাইলে আমাদের সরাসরি জানানো উচিত। আমরা অনিয়ম বরদাশত করি না।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়ছে।
শিল্পাঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, জরাজীর্ণ সঞ্চালন লাইন ও ওভারলোডেড ট্রান্সফরমার দ্রুত সংস্কার ও প্রতিস্থাপন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে নিয়মিত অভিযান এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অপচয় কমানো জরুরি।
পাশাপাশি শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিকল্প জ্বালানির সুযোগ তৈরি এবং স্মার্ট প্রিপেইড মিটার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
রূপগঞ্জ শুধু একটি উপজেলা নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করা না গেলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।