শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০২ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞাপন:
আমাদের ওয়েব সাইটে আপনাকে স্বাগতম...
শিরোনাম :
রূপগঞ্জের সাওয়ানার হাত ধরে চীনে বাংলাদেশের গৌরবময় সাফল্য সিলেটে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্বে তরুণকে ছুরিকাঘাত, ওসমানীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি রূপগঞ্জে স্কাফ-উইনসিরেক্স, নগদ টাকা ও মোটরসাইকেলসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার নাগেশ্বরীতে স্কুল ছাত্রীকে হেনস্তা করার জন্য বখাটেকে পুলিশে দিলো স্থানীয় জনতা মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ভিতরবন্দের হিরার দক্ষিণ সুরমায় আবারও ‘রিজিক ফুডকার্ট’-এর বৈদ্যুতিক তার চুরি মশক নিধন কার্যক্রম চোখেই পড়ে না রূপগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে আতঙ্কে মানুষ রূপগঞ্জে সিটি গ্রুপের অটো রাইস মিলে বয়লার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ২ সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তাণ্ডব: আম্বরখানায় প্রতিবন্ধী কিশোরকে আহত করার অভিযোগ নাগেশ্বরীতে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পৌর বিএনপির সদস্য সচিব আজিজুল হকের শুভেচ্ছা বার্তা

হারিয়ে যাচ্ছে কলু সম্প্রদায়, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলাচ্ছেন পেশা

নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ:
কাঠের ঘানিতে গরু দিয়ে সরিষা ভেঙে খাঁটি তেল উৎপাদনের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। বাজারে মেশিনে উৎপাদিত তেল ও ভেজাল তেলের দাপট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং লাভ কমে যাওয়ায় রূপগঞ্জের কলু সম্প্রদায়ের অনেকেই পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে কাঠের ঘানি, অন্যদিকে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী কলু সম্প্রদায়ের এই পেশা।

একসময় গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে মাটির হাঁড়িতে বিক্রি হতো কাঠের ঘানিতে উৎপাদিত খাঁটি সরিষার তেল। কলু সম্প্রদায়ের লোকজন দিন-রাত পরিশ্রম করে গরু দিয়ে কাঠের ঘানি ঘুরিয়ে সরিষা ভাঙতেন। পরে সেই তেল মাটির হাঁড়িতে করে বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ফেরি করে এবং হাট-বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই ‘কলু’ শব্দটি অপরিচিত। অথচ একসময় গ্রামবাংলার অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে এই সম্প্রদায়ের পেশাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। তেল বিক্রির সময় মাটির হাঁড়ির ঢাকনার নিচে তেল তোলার জন্য বিশেষ ধরনের হাতল বা পাত্র ব্যবহার করা হতো। কাঠের ঘানিতে উৎপাদিত খাঁটি সরিষার তেলের সঙ্গে কলু সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা গভীরভাবে জড়িত ছিল।

কলু সম্প্রদায়ের প্রধান কাজ ছিল সরিষা ও বিভিন্ন তেলবীজ পেষাই করে তেল উৎপাদন করা। পশু দিয়ে চালিত দেশীয় এই যন্ত্রকে বলা হয় ‘ঘানি’। ঘানি টানার কাজে সাধারণত গরু বা বলদ ব্যবহার করা হতো। কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ঘানিতে ধীরে ধীরে সরিষা পেষাই করে তেল বের করা হতো। একটি ঘানি তৈরিতেও প্রয়োজন হতো বিভিন্ন ধরনের কাঠ এবং দক্ষ কারিগরের।

রূপগঞ্জ উপজেলার বানিয়াদী গ্রাম একসময় কাঠের ঘানিতে উৎপাদিত সরিষার তেলের জন্য পরিচিত ছিল। উপজেলার বানিয়াদী, কাঞ্চনসহ বিভিন্ন গ্রাম ও এলাকায় কলু সম্প্রদায়ের লোকজন কাঠের ঘানিতে সরিষা ভেঙে তেল উৎপাদন করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে ঐতিহ্যবাহী এই পেশায় পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে কাঠের ঘানির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক মোটরচালিত লোহার মেশিনে সরিষা, তিল, তিসি, পাম ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন তেলবীজ ভাঙা হচ্ছে। এতে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ তেল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরিষার সঙ্গে চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচসহ বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে ভেজাল তেল উৎপাদন করছেন।

কম খরচে উৎপাদিত মেশিনের তেল বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় কাঠের ঘানিতে উৎপাদিত খাঁটি সরিষার তেল নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাঠের ঘানিতে তেল উৎপাদনে সময় ও শ্রম বেশি লাগায় উৎপাদন খরচও বেশি। ফলে অনেক কলুই ধীরে ধীরে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

কেরাব গ্রামের আজিজুল বলেন, “আমার বাপ-দাদার মূল ব্যবসাই ছিল কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল উৎপাদন করা। বর্তমানে এই তেলের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন করে খরচ পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। তাই আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে তেল মাড়াই করছি।”

বানিয়াদীর মজিবর বলেন, “আগে বাবার সঙ্গে কাঠের ঘানিতে সরিষা ভেঙে তেল উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করতাম। বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে এ পেশায় তেমন লাভ না হওয়ায় পেশাটি ছেড়ে অন্য কাজ বেছে নিয়েছি।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা বলেন, “আবাসন চাহিদা বৃদ্ধির কারণে অনেক কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। এতে সরিষার আবাদও কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তির বিপ্লবের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই কাঠের ঘানিতে তেল তৈরির ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া হারিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কলু সম্প্রদায়ের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করছেন।”

স্থানীয়দের মতে, ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘানিতে উৎপাদিত সরিষার তেল শুধু একটি পণ্য নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার পুরোনো সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রারও অংশ। যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে কাঠের ঘানি ও কলু সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে পারে।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2026 shomoyerkhobor.com
Design & Developed BY starwebhostit