শুক্রবার, ২৪ Jul ২০২৬, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন
সময়ের খবর ডেস্ক:
পাবনার বেড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখিয়ে ‘স্কুল ফিডিং’ কর্মসূচির অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে এসব অতিরিক্ত ডিম, বনরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট শিক্ষকেরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত উপস্থিতির তথ্যের সঙ্গে হাজিরা খাতার হিসাব এবং বরাদ্দকৃত খাবারের পরিমাণের মধ্যে বিস্তর গরমিল ও অসংগতি রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তি দেখিয়ে এই বরাদ্দ তোলা হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়ার চেয়ে ভুয়া উপস্থিতি দেখিয়ে খাবার আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্যে চালু ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে চালু হয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। এর আওতায় সপ্তাহের পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিম, বনরুটি, দুধ, বিস্কুট ও কলা বিতরণ করা হয়। পাবনার শুধু বেড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২৪ হাজার ৬৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রতিটি বিদ্যালয়ে গড়ে ৯০ শতাংশ হারে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিদিন ২২ হাজার শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাচ্ছে।
এদিকে, গত ১৯ জুলাই সকাল ১১টার দিকে গোবিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথম শিফটে সব শ্রেণি মিলিয়ে মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। তবে শিক্ষকদের দাবি, বিদ্যালয়ে ৫৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ জন উপস্থিত ছিল। এ সময় প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি। সহকারী শিক্ষকরা জানান, তিনি মোবাইল ফোন মেরামত করতে পাশের মাসুন্দিয়া বাজারে গেছেন। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন দাবি করেন, প্রথম শিফটে ২৬ জন ও দ্বিতীয় শিফটে ২৮ জন উপস্থিত ছিল।
একই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে হাজিরা খাতায় পাওয়া যায় ১১১ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিত। এ সময় শিক্ষক অসিত কুমারকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ সিদ্ধ ডিম খেতে দেখা যায়। তবে সংবাদকর্মীদের দেখে তিনি ডিমের খোসা নিয়ে সরে যান। শিক্ষকদের দাবি অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৯০ জন। তবে অভিভাবক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে ১৭১ জনের নামে প্রতিদিন শিশুখাদ্য বরাদ্দ আসে। তবে প্রতিদিন ৪০-৫০ জনের খাবার উদ্বৃত্ত থাকে, যা শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আসমা (ছদ্মনাম) বলে, সবাইকে একটা করেই ডিম দেয়, বাকিগুলো স্যারেরা নিয়ে যান। আমরা চাইলেও কখনো দুইটা দেয় না। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যার বেশি টিফিন আসে বলে সে জানায়।
উদ্বৃত্ত খাবারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক ইশ্রাফিল হোসেন জানান, পচনশীল খাবারের মধ্যে ডিম, পাউরুটি, কলা শিক্ষার্থীদেরও দিয়ে দেন। অনেক সময় শিক্ষকরাও নেন। তবে দুধ ও বিস্কুট তারা স্টকে রেখে দেন।
মির্জাপুর-শীতলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় ৫৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৬ জন উপস্থিত দেখানো হয়েছে গত রোববার। তবে দ্বিতীয় শিফটে দুপুর ২টার দিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে মাত্র ৭ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। একইভাবে কোমরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি রেজিস্টারে ৩১৫ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৫০ জনের বেশি উপস্থিত দেখানো হয়। তবে অভিভাবকদের দাবি, নিয়মিত উপস্থিতি ২০০-২২০ জনের বেশি নয়। এই বিদ্যালয়ে ২৭৫ জনের জন্য শিশুখাদ্য বরাদ্দ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসিম (ছদ্মনাম) বলে, ‘স্যারেরা ডিম, কলা বাসায় নিয়ে যায়। আমাদের একটার বেশি দেয় না।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, তার জানা মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কম থাকলে উদ্বৃত্ত খাবার উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হবে। সত্যতা পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা জানান, স্কুল ফিডিং প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ হয়েছে। তবে উঠে আসা অভিযোগ খুবই গুরুতর এবং তিনি তদন্ত করে দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, বেড়ার বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়মের কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র: দৈনিক শিক্ষা ডট কম