খুলনা | শনিবার | ২৫ জানুয়ারী ২০২০ | ১২ মাঘ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের দু’নেতাকে যেমন দেখেছি

এড. ফরিদ আহমেদ | প্রকাশিত ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৪১:০০


দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ হারালো এক শ্রেষ্ঠ সন্তান। গত ২৬ জুলাই’ ২০১৮ বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্য রাতে (১২:৫ মিনিট) তাঁর মৃত্যুর সংবাদে হাজারো নেতা-কর্মী অশ্র“সিক্ত হয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। অমাবশ্যার কালো অন্ধকারের মত শোকের ছায়ায় গ্রাস করেছে সমগ্র খুলনাকে। এই অঞ্চলের মাটি মানুষের সুখ দুঃখের মাঝে বেড়ে ওঠা তাদের প্রিয় নেতা, প্রিয় সন্তান, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এই অঞ্চলের মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামের অগ্রনায়ক, ক্রীড়াঙ্গন, সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রবাদ পুরুষ, রাজপথের সাহসী নেতা এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি’র মৃত্যু কাঁদিয়েছে খুলনাকে। এই বর্ণাঢ্য রাজনীতিক জীবনে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক সংগ্রামের পথ।
১৯৬৯ সালে দৈনিক পূর্বাঞ্চল-এর সম্পাদক তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আলহাজ্ব লিয়াকত আলীর হাত ধরে ছাত্র ইউনিয়নে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের ছাত্র নেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে “খুলনা ক্রেকার্স” নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এছাড়া যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির হাত ধরে তিনি সংগঠনটিতে যোগদান এবং বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শের কর্মী হিসেবে নেতৃত্বের সফলতার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামাল খুলনা ক্রেকার্স ক্লাবকে বিলুপ্ত করে “খুলনা আবাহনী ক্রীড়াচক্র” প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ইলিয়াস আহম্মেদ চৌধুরীকে সভাপতি ও এস এম মোস্তফা রশিদী সুজাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে ক্লাবের সভাপতি হিসেবে তিনি আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর খুলনা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার সাহসী ভূমিকা তাঁকে নেতৃত্বের উঁচু আসনে ধাবিত করে।
১৯৭৭ সালে আ’লীগের প্রার্থী হিসেবে খুলনা পৌরসভা নির্বাচনে তৎকালীন লিয়াকত নগর ইউনিয়ন থেকে প্রথম কমিশনার নির্বাচিত হন। একই সময় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র আলহাজ্ব তালুকদার আব্দুল খালেকও কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন এড. এনায়েত আলী। কমিশনারের পাশাপাশি এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা লিয়াকত নগর ইউনিয়ন আ’লীগের এবং তালুকদার আব্দুল খালেক মহাসিনাবাদ ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে তিনি ধাপে ধাপে শহর আ’লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন। আ’লীগ নেতাদের মুখে মুখে জানা যায়, জিয়া ও এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে টুটপাড়া থেকে সুজা ভাইয়ের নেতৃত্বে সরকার বিরোধী মিছিল বের না হলে খুলনা আ’লীগ কার্যালয় থেকে রাজপথে কোন মিছিল বের হতো না।
১৯৮৬ সালে নগর আ’লীগের সহ-সভাপতি থাকা অবস্থায় খুলনা-২ আসন থেকে আ’লীগের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরশাদ বিরোধী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন খুলনা জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. স ম বাবর আলী আ’লীগ থেকে বাদ পড়লে জেলা কমিটিতে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও ১৯৯২ সালের সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা আ’লীগের সভাপতি হিসেবে খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এস এম মোস্তফা রশিদী সুজাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি খুলনা জেলা আ’লীগের রাজনীতিতে তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের গুণাবলি দ্বারা নিজেকে দলের কান্ডারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৪ আসনে (রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া) আ’লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিম লীগ নেতা খান-এ-সবুর এর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ অঞ্চলে আ’লীগের রাজনীতিকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলেন। এরপর তিনি ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারিতে দৈনিক পাঠকের কাগজ নামে একটি পত্রিকার প্রকাশ করেন। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এই পত্রিকাটির উদ্বোধন করেন। এই পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। পত্রিকার সংবাদকর্মী হিসেবে এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা এমপি’র একান্ত সাহচার্যে যাওয়ার সুযোগ ঘটে আমার। সেই থেকে গত তিন দশকে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের বন্ধন সৃষ্টি হয়। তাকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি খুলনা-৪ আসন থেকে আ’লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনী প্রচারণার সংবাদ সংগ্রহ ও মিডিয়ার প্রকাশনার দায়িত্ব ভার বর্তায় আমার উপর। তার পায়ে পা মিলিয়ে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া উপজেলার প্রতিটি গ্রাম জনপদে পদচিহ্ন রেখেছিলাম। কত হাজার স্মৃতি কত ভালো লাগার মুহূর্তগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। একদিন নির্বাচনী প্রচারকালে এক নেতার বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের সময় নিজ প্লেটের বড় কৈ মাছটি আমার প্লেটে তুলে দিয়েছিলেন। আমি অবাক হয়েছি, তিনি এমনি একজন নেতা, যিনি প্রতিটি কর্মীকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারতেন। এটা ছিল তার নেতৃত্বের অন্যতম গুণাবলি। তিনি শত-শত নেতা-কর্মীর নাম মনে রাখতে পারতেন। ঐ তিন উপজেলাসহ-খুলনা জেলার অসংখ্য নেতা-কর্মীর পারিবারিক খোঁজ খবরও রাখতেন তিনি। যে কারনে তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতাই নয় তাদের পারিবারিক অভিভাবক হিসেবেও পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আ’লীগ সরকার গঠন করলে তাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সরকার দলীয় হুইপ নিয়োগ করা হয়। যে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া জনপদের মানুষ স্বপ্নেও ভাবেনি তার বাড়ির পাশের সব পথ পিস ঢালাই রাস্তায় পরিণত হবে। তিনি হুইপ থাকাকালে অবহেলিত এই অঞ্চলের রাস্তাঘাট ব্রিজ, কালভার্ট, মসজিদ মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। যার ফলে তিনি হয়ে ওঠেন এ অঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়নের রূপকার হিসেবে। তিনি অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে দিঘলিয়া এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা গার্লস কলেজ, সেনহাটি রাশিদা খানম কবর স্থান, এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা জামে মসজিদ, তেরখাদার চিত্রা মহিলা ডিগ্রি কলেজ, এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা দাখিল মাদ্রাসা এবং রূপসা উপজেলায় রূপসা মহিলা কলেজ অন্যতম। এছাড়া কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রূপসা এবং দিঘলিয়াকে খুলনা নগরীর সাথে সংযুক্ত করার জন্য নদীর উপর দুইটি ব্রিজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখে জাতীয় সংসদে দাবিও তুলে ছিলেন এ মহান ব্যক্তি। দিঘলিয়ার ব্রীজ বাস্তবায়নের পথে। এছাড়া রূপসা ব্রিজ, খুলনা বিশ্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক রেলস্টেশন, খুলনা বিমানবন্দর, মোংলাবন্দর সচল ইত্যাদিসহ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের যে কোন উন্নয়নের সাথে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেকে একজন সফল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিতেন,আমৃত্যু খুলনা নাট্য নিকেতনের সভাপতি ও ছিলেন।
২০০১ সালে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে জামায়াত-বিএনপি’র সরকার ক্ষমতায় আসে এবং ২০০২ সালের শেষদিকে অপারেশন ক্লিন-হার্ট নামের অভিযানে দুই সহোদরসহ তাঁকে গ্রেফতারের পর অমানবিক নির্যাচন চালানো হয়েছিল। হত্যাসহ ডজনখানেক বিভিন্ন মামলায় তাকে পাঠানো হয়েছিল রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী ও তার নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে রংপুর কারাগারে তাঁর পারিবারকে নিয়ে তাঁর সাথে আমি প্রথম সাক্ষাৎ করেছিলাম। কারা অভ্যান্তরে নির্যাতিত নেতাকে দেখার সেই দৃশ্য ও স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। দুইজন কয়েদীর কাঁধে ভর করে তিনি যখন আমাদের সামনে আসলেন মুখে দাঁড়ি, চোখে জল, পায়ের নিচেসহ সারা শরীরের আঘাতের যন্ত্রণায় কাতর ছিলেন। সেই নির্যাতনে যে তার শরীরে রোগে দানা বাঁধল আর সুস্থ হতে পারলেন না। তিনি কয়েক মাস কারাবন্দী থাকার পর সকল মামলা থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে প্রিয় খুলনা নগরীতে পদার্পণ করেন। খুলনার ঐতিহাসিক শহিদ হাদিস পার্কে খুলনাবাসী বিশাল বর্ণাঢ্য নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া করেন। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক স্পিকার, বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি এড. আব্দুল হামিদ।
২০০৭ সালে ১/১১ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জননেতা মোস্তফা রশিদী সুজার পরিবারের পরে পুনরায় নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে মিথ্যা ভিত্তিহীন দুর্নীতির মামলার আসামি করা হলে তিনি প্রবাস জীবনে যেতে বাধ্য হয়। ফলে ২০০৮ সালে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। এই নির্বাচনে আ’লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসলে তিনি দেশে ফিরে ঢাকা স্পেশাল জজ আদালতে আত্মসমর্পণ এবং ঐ দুর্নীতির মামলাকে চ্যালেঞ্জ করেন। ঢাকা আইনজীবীদের সাথে তার ভগ্নিপতি বাগেরহাট সদরের সংসদ সদস্য এড. শওকত আলী বাদশা এমপি ও আমি আইনজীবী হিসেবে শুনানীতে অংশ নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টে আপিল করে ঐ মামলা থেকে খালাস হন। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় খুলনা-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর গত কয়েক বছর তিনি প্রায় অসুস্থ হতে থাকেন, দেশ-বিদেশের চিকিৎসা নিতে হয়। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ধরা পরে তার দু’টি কিডনী ড্যামেজ হওয়ার পথে। তখন নেতার জীবন বাঁচাতে খুলনা জেলা শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি ও শ্রীফলতলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলম হাওলাদার তার একটি কিডনী দান করেন। গত ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের ঐ হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে কিডনী প্রতি স্থাপন করা হয়। গত এপ্রিলের ১ম সপ্তাহে তিনি দেশে ফেরেন ৭ এপ্রিল শহিদ হাদিস পার্কে তিনি কিডনী দাতা, বঙ্গবন্ধু ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দিন (এমপি) ও খুলনাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেদিনের হাদিস পার্ক ও পার্শ্ববর্তী এলাকা জন সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। 
প্রিয় নেতা খুলনার মানুষের ভালোবাসার সিক্ত হয়ে তার ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্যে বলেছিলেন “আমার প্রতি আপনাদের এই শ্রদ্ধা ভালোবাসা আমার সারা জীবনের চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকবে। আমাকে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন, আমি আপনাদের ভাই বন্ধু সুখ, দুঃখের সাথী হয়ে থাকতে চাই। মানুষের কল্যানে এই অঞ্চলের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেছি।”আর এটাই ছিল তার জীবনে শেষ ভাষণ।
ক্লিনহার্ট অপারেশন নির্যাতনে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসায় খুলনাবাসী তাকে মৃত্যুঞ্জয়ী নেতা হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু তিনি মৃত্যুকে জয় করতে পারেনি, তিনি জয় করেছেন আমার মত বাংলাদেশের হাজার, লক্ষ নেতা ও কর্মীর হৃদয়। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে কিডনী প্রতিস্থাপনের আগের দিন ১২ নভেম্বর খুলনাবাসীর প্রতি এক খোলা চিঠিতে তিনি যে কথা বলেছিলেন “রূপসা, ভৈরব, আঠারবাকির ঘোলাজল পেরতে পেরতে আমার কথা আপনাদের মনে পড়বে”। সেদিনের খোলা চিঠি পড়ে কত নেতা-কর্মী নিরবে কেঁদেছিল, তা আমার জানা নেই। প্রিয় নেতার এই চির বিদায়ের সংবাদে আবারো কেঁদেছে খুলনা। অনন্তকাল প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আপনার রেখে যাওয়া কৃর্তি দ্বারা আপনাকে স্মরণ করবে। প্রিয় নেতা, প্রিয় ভাইজান ভালো থাতুন পরপারে- আজ শুধু এই কামনা।
গাজী আব্দুল হাদী : ছাত্র জীবন থেকে ডুমুরিয়ার একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে যার নামের সাথে পরিচিত ছিলাম তিনি হচ্ছেন গাজী আব্দুল হাদী। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ আসনে আ’লীগের প্রার্থী ছিলেন বাংলাদেশে আ’লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, জেলার সাবেক সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী মরহুম সালাহউদ্দিন ইউসুফ, জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন কর্নেল আব্দুল গফ্ফার।
ঐ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নেতা কর্মীরা ভোট ডাকাতি শুরু করলে আ’লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তোলেন দলের তৎকালীন তরুণ নেতা গাজী আব্দুল হাদী। জাতীয় পার্টির হামলায় আ’লীগের দু’জন কর্মী নিহত হন এবং গাজী আব্দুল হাদী ভাইকে গ্রেফতার করা হয়। তার মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী খুলনায় রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলে। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সাজানো মামলার শুনানী করার জন্য এড. সালাহউদ্দিন ইউসুফের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে দেশ বরেণ্য আইনজীবী ড. কামাল হোসেন খুলনার আদালতে মামলার শুনানীতে অংশগ্রহণ করেন এবং ঐ মামলায় হাদী জামিন পান। 
ডুমুরিয়া অঞ্চলে মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে গাজী আব্দুল হাদী সব সময় স্বোচ্ছার ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ডুমুরিয়া-ফুলতলা ঘেঁষে ডাকাতিয়ার বিলে তৎকালীন সরকার বাঁধ সৃষ্টি করলে বিলের মধ্যে বিলডাকাতিয়া অনাবাদী ও স্থায়ী জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এলাকায় কৃষক জনতা বিলের বাঁধ কাটার জন্য দাবি তোলেন কিন্তু সরকারী কোন উদ্যোগ না থাকায় স্বৈরাচারী  এরশাদ সরকার বিল এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। ১৯৯০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কৃষক জনতাকে সাথে নিয়ে বিল ডাকাতিয়া এলাকাতে ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা  উপেক্ষা করে সন্ধ্যা খালের বাঁধ কাটার নেতৃত্ব দেন গাজী আব্দুল হাদী। কৃষক জনতার নেতা গাজী আব্দুল হাদীকে সেদিনও গ্রেফতার করা হয়েছিল। এভাবে তিনি খুলনাবাসীর সামনে গনমানুষের নেতায় পরিচিতি লাভ করেন। 
১৯৫০ সালের ১৫ জানুয়ারি ডুমুরিয়া উপজেলার শাহাপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত গাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে শাহাপুর হাইস্কুল থেকে এসএস সি পাস করেন, ১৯৬৮ সালে শাহাপুর মধুগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭০ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের একজন কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। খুলনার প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ আ’লীগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে নিজ কর্ম প্রচেষ্টায় কর্মী বান্ধব সৎ এবং নিষ্ঠাবান নেতা হিসেবে তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক-এর দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে গাজী আব্দুল হাদী খুলনা জেলা আ’লীগের সদস্য পদ লাভ করেছিলেন। ২০০৪ সালের ১৭ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জেলা আ’লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক, সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠিত জেলা আ’লীগের সম্মেলনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। খুলনা জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক হুইপ এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা ১/১১ সরকারের মিথ্যা হয়রানীমূলক মামলায় প্রবাস জীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হলে ২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গাজী আব্দুল হাদী যোগ্যতার সাথে জেলা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্র জীবনে যে রাজনৈতিক নেতার নামের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকে গাজী আব্দুল হাদীর সহচার্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রতিটি রাজনৈতিক প্রোগ্রামে তার ভরাট কন্ঠে জ্ঞানগর্ব বক্তৃতা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। তিনি একদিকে যেমন সুবক্তা ছিলেন অন্য দিকে তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য চর্চা করতেন, আবৃতিকার ও ছিলেন। তিনি বলতেন রাজনীতি করতে হলে জানতে হবে, পড়তে হবে। 
১/১১ সরকারের সময় দুই বছর তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে আমি কমিটির দপ্তর সম্পাদক হিসেবে তার সাথে একান্তভাবে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করার অনেক স্মৃতি রয়েছে। তখন প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, খুলনা আ’লীগ কার্যালয় ছিল  প্রশাসনের দ্বারা অবরুদ্ধ। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে জেলা আ’লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গাজী আব্দুল হাদী যোগ্যতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। 
গাজী আব্দুল হাদী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না। তিনি একজন সমাজসেবক এবং বারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও  ছিলেন। তার জন্মস্থান রঘুনাথপুর ইউনিয়নের ২১ বছর নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আ’লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে খুলনা জেলার মধ্যে সর্বাধিক ভোটে বিজয়ী হয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়্যারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া শাহাপুর মধুগ্রাম কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, ঈদগা কমিটির সভাপতি, নিরালা জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তিনি খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন।
এক কথায় প্রিয় নেতা গাজী আব্দুল হাদী ব্যক্তিত্বে ও গুণাবলীর মাধ্যমে একজন স্বচ্ছ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আসন্ন ১০ ডিসেম্বর-২০১৯ খুলনা জেলা আ’লীগের সম্মেলনে তিনি হয়তো সাধারণ সম্পাদক পদে অন্যতম প্রার্থী হতেন, কিন্তু ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর আকস্মিক ভাবেই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। (লেখক ঃ দপ্তর সম্পাদক, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ








প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৪১


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


ব্রেকিং নিউজ












খুলনায় অস্থির চালের বাজার

খুলনায় অস্থির চালের বাজার

২৫ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:১৫