খুলনা | রবিবার | ১৯ জানুয়ারী ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

মায়ের স্বীকৃতি মিললেও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি মেলেনি পাইকগাছার বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর

পারভেজ মোহাম্মদ | প্রকাশিত ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৫১:০০

বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মান দিয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছে। চলতি বছরের ১৪ ফেব্র“য়ারি প্রকাশিত গেজেটে সরকার ২৭১ জন বীরাঙ্গনাকে সম্মান দিয়েছেন। তবে শুরুটা ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর। এই দিন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম গেজেট প্রকাশ করে। যদিও এই তালিকায় নাম নেই মুক্তিযোদ্ধাদের ‘‘মা’’ হিসেবে খ্যাত পাইকগাছার বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মন্ডলের।
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার অন্যতম অনুঘটক একাত্তরের অন্যতম নায়িকা গুরুদাসী মন্ডলের আবাসস্থল পাইকগাছা উপজেলার কালীনগর গ্রামে। ১৯৭১ সাল, বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের জন্মলগ্নে চলছে প্রচন্ড প্রসব বেদনা। ধাত্রি মাতারূপী লক্ষ বীরাঙ্গনার অন্যতম গুরুদাসী মন্ডল। তখন তার সুখের সংসার স্বামী গুরুদাস মন্ডল, ছেলে অংশুপতি, খোকন, অঞ্জলি ও ছোট্ট শিশু মেয়ে পারুলকে নিয়ে। পেশায় দর্জি গুরুপদের মোটা চালের দু’মুঠো ভাত, মোটা কাপড়ে বেশ যাচ্ছিল দিন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, বাড়তে থাকে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে অনেকেই, গুরুপদ মন্ডল তাদের একজন। সপরিবারে ভারতে আশ্রয় নিলেও গুরুদাসী জন্মভূমির টানে অস্থির। এক পর্যায়ে দেশে ফেরা। গুরুদাসীর ওপর নজর পড়ে বারোআড়িয়া ক্যাম্পের রাজাকারদের। নিজের সৌন্দর্য্য তখন শত্র“রূপে দেখা দিল। আর স্বামী গুরুপদ মন্ডল হলেন তাদের আক্রোশের শিকার। অপরাধ তিনি মুক্তি বাহিনীর লোক। পালাক্রমে নির্যাতনে কাতর গুরুপদর কাহিনী বর্ণনায় আজও শঙ্কিত হয় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, রাতভর নির্যাতনের পর সকালে জনসম্মুখে গুরুপদ মন্ডলকে অস্ত্রের মুখে নদীতে নামতে বাধ্য করে রাজাকাররা। একপর্যায়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর গুরুদাসী মন্ডলের ওপর চলে নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতনের পর শুরু হয় নারীত্বের প্রবল অপমান। চোখের সামনে স্বামীকে মেরে অংশুপতি, খোকন আর পারুলকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে আছড়ে মারে। মৃত সন্তানদেরকে চোখের সামনে মাটিতে পুঁতে ফেলতে দেখেছেন গুরুদাসী মন্ডল। প্রিয়জন হারাবার বেদনা, পাশবিক নির্যাতনে সম্ভ্রম হারাবার লজ্জায় পাগল প্রায় গুরুদাসী তবুও মুক্তি পায়নি এই নরপিচাশদের হাত থেকে। রাজাকারদের আদিম উন্মাদনায় খোরাক যোগাতে তাকে বহুরাত কাটাতে হয়েছে বারোআড়িয়া রাজাকার ক্যাম্পে। 
দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে বারোআড়িয়ার রাজাকার ক্যাম্প দখল করে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুরুদাসীর দেখা মেলে রাজাকার ক্যাম্প  দখলের পর। ভয়ঙ্কর স্মৃতি চারণে বীরাঙ্গনা গুরুদাসী হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘মা’। এটি ছিল গুরুদাসীর জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ সম্মান। ততক্ষণে গুরুদাসী মন্ডল হারিয়ে ফেলে মানসিক ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর খুলনা বিভাগের মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু মানসিক হাসপাতাল পাবনাতে ভর্তি করান গুরুদাসীকে। তবে আর কোন দিন পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফিরেছে প্রতিদিন। হাতে লাঠি নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়াতো গুরুদাসী। কখনও শহরে আবার কখনও গ্রামের পথ ধরে পাগল প্রায় নারীর পথচলা আজ শুধুই স্মৃতি। ‘‘সাপ-সাপ’’ শব্দে ভয় দেখানো আর হঠাৎ পিঠে লাঠির আঘাতে আঁতকে ওঠা শুধুই গল্প। গুরুদাসী স্বাধীন দেশের মানুষের কাছে পাগলী মাসি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘‘মা’’। স্বাধীন দেশে যার প্রাপ্তি ছিল পাইকগাছার কপিলমুনি জাফর আউলিয়া সড়কের ধারে এক টুকরো সরকারি জমি আর থাকার ছোট্ট বাড়ি। যেখানে অভাবে, অনাদারে, অযতেœ কেটেছে  বেশ কিছু দিন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি ছিল একটু আনন্দের। গুরুদাসীর পাশে থাকার চেষ্টাও ছিল তাদের।
আজ গুরুদাসী নেই। ২০০৮ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতের পর গুরুদাসী শুধুই স্মৃতি। তার স্মৃতি রক্ষায় ২০০৮ সালেই শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে গুরুদাসী স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ গড়ে তোলা হয়েছে। সেদিনই তার বাড়িটিতে গুরুদাসী মন্ডল স্মৃতি যাদুঘর ও পাঠাগার হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা হয়েছিল। এর মধ্যে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধারা শোষিত-বঞ্চিত, অপমানিতও। কিন্তু ১১ বছরেও গুরুদাসীর শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে দেয়া প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়িত হয়নি। আক্ষেপ করে সাংবাদিকদের এমনটি জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা স ম বাবর আলী। সরেজমিন গুরুদাসীর বসত ঘরটি দেখতে গেলে সেখানে গুরুদাসী মন্ডল স্মৃতি রক্ষা সাইন বোর্ডের অস্তিত্ব মেলেনি। ভূতুড়ে বাড়িটির ভেতরে ময়লার স্তূপ। স্থানীয়দের অভিযোগ বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর বসতভিটা এখন নেশাসক্তদের আড্ডাস্থল। গুরুদাসী মন্ডল বীর সন্তানের মা। মুক্তিযোদ্ধা সম্মানের গেজেটে তালিকায় তার না থাকলেও বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ড জন্মের প্রসব বেদনার নীরব সাক্ষী গুরুদাসী। তাইতো সৃষ্টিকর্তা শেষ বিদায়ের ডাকটিও দিয়েছিনে এই বিজয়ের মাসেই। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার এটাই তার বিরল সম্মান। জাতির জনকের জন্ম শতবার্ষিকী উদ্যাপনের পূর্বে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘‘মা’’ গুরুদাসীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি আজ সময়ের দাবি। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

শহিদ জিয়ার ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

শহিদ জিয়ার ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:০২













ব্রেকিং নিউজ

শহিদ জিয়ার ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

শহিদ জিয়ার ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯ জানুয়ারী, ২০২০ ০১:০২