রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বহু বিয়ের তাৎপর্য


বিয়ে-শাদী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ এর মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আসে। এখানে শেষ নবীর বহু বিয়ের তাৎপর্য নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে। বিশ্বনন্দিত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিয়ে নিয়ে নানা জনের নানা কথা শোনা যায়। তবে সমস্ত বিতর্কের এক কথায় উত্তর। মহামানব মহানবী তাঁর জীবনে যা কিছুই করেছেন শুধু বিয়েই নয়, সব কিছুই মহান আল্লাহর নির্দেশে, কারণ আল্লাহ নির্দেশ ব্যতিত কাজ তো দূরের কথা, কোন কথা বলতেন  না। কুরআনের ভাষায়, “এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না (সূরা আন-নাজম, আয়াত নং-০৩)”। “তাই বলা চলে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন, মডেল, তাঁর জীবনের সব কিছুই করেছেন ইসলামের সেবায়। মানবতার জন্য, মানুষের উন্নতির জন্য। 
নবী (সাঃ) স্ত্রীর সংখ্যা ঃ উম্মাহাতুল মুমিনিনদের সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবীদগনের মধ্যে মতোবিরোধ রয়েছে। (ক) আর রাহীকুল মাখতুম কিতাবে বলা হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) এর স্ত্রীর সংখ্যা ছিল সর্বমোট ১১ জন’। (খ) বৈজ্ঞানিক মুহাম্মদ (সাঃ) গ্রন্থে লেখা আছে, ‘শেষ নবীর পত্মীর সংখ্যা ছিল ১৩ জন’। 
বহু বিয়ে ও ইসলাম ঃ বহু বিয়ের প্রথাটা ইসলাম পূর্ব যুগেও দুনিয়ার প্রায় সকল ধর্ম মতেই বৈধ বিবেচিত হতো। আরব, ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরাক, মিশর, বেবিলন, প্রভূতি সব দেশেই এই প্রথার প্রচলন ছিল। বহু বিয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বর্তমান যুগেও স্বীকৃত। ইউরোপের এক শ্রেণীর চিন্তাবিদ বহু বিয়ে রহিত করার জন্য চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলে, “আর যদি তোমরা ভয় করবে এতীম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চার টি পর্যন্ত (সূরা নিসা আয়াত নং ৩ অংশ বিশেষ)”। তবে শর্ত হল সকল স্ত্রীগণকে সমান চোখে দেখা লাগবে।
বিশ্বনবী ও বহু বিয়ে ঃ নবী (সাঃ) এর আগমনের উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর দ্বীনের বিধি বিধান উম্মতের নিকট পৌছে দেয়া এবং বিশ্ব মানবতার আত্মশুদ্ধির কাজ করা। নবী করিম (সাঃ) ইসলামের শিক্ষা, বিধি-বিধান, কথা ও কাজের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিস্তার করে গেছেন। মানব জীবনের এমন কোনো ধাপ নেই যেখানে নবীর শিক্ষা ও তার পথ প্রদর্শনের প্রয়োজন নেই। পানাহার, উঠা-বসা, নিদ্রা-জাগ্রত হওয়া, পাক-পবিত্রতা, ইবাদত-বন্দেগী, মুজাহাদা-সাধনা প্রভৃতি বিষয়ে সব যায়গাতে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আদর্শ বিদ্যমান।
বিশ্বনবী (সাঃ) বিয়ের অবস্থা ঃ পঁচিশ বছর বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত একমাত্র খাদিজা (রাঃ) তাঁর বিয়ের স্ত্রী ছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাওদা ও আয়েশা (রাঃ) এর সাথে বিয়ে হয়। হযরত সাওদা (রাঃ) হুজুরের ঘরে চলে আসেন। কিন্তু আয়েশা (রাঃ) কম বয়সী হওয়ার দরুন তাঁর পিতা আবু বকর (রাঃ) এর ঘরেই থেকে যান। অতঃপর কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর হিজরি দ্বিতীয় সনে তিনি হুজুর (সাঃ) এর ঘরে আসেন। তখন হুজুর (সাঃ) এর বয়স ছিল ৫৪ বছর। এই বয়সে উপনীত হওয়ার পর দুই স্ত্রী তার বিয়ের সূত্রে একত্র হলো। এখান থেকে একাধিক বিয়ের বিষয়টির সূচনা হয়। তাঁর এক বছর পর হযরত হাফসা (রাঃ) এর সঙ্গে বিয়ে হয়। তার পর কয়েক মাস যাওয়ার পর হযরত যায়নাব বিনতে খুজাইমা (রাঃ) এর সাথে বিয়ে হয়েছে। তিনি মাত্র আঠারো মাস বিয়ের বন্ধনে থেকে ইন্তেকাল করলেন। এক বর্ণনা মতে, তিনি হুজুর (সাঃ) এর বিয়ে বন্ধনে মাত্র তিন মাস জীবিত থাকেন। অতঃপর দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মে সালমা (রাঃ) এর সাথে এবং পঞ্চম হিজরিতে হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ (রাঃ) এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ৫৮ বছর। এই বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে চার জন স্ত্রী এক সাথে একত্র হয়েছিল অথচ সে সময় উম্মতের জন্য চারজন স্ত্রী গ্রহণ করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল তখনই তিনি চারটি বিয়ে করে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এরূপ করেননি। অতঃপর ষষ্ঠ হিজরীতে জুওয়াইরয়া (রাঃ) এর সাথে সপ্তম হিজরী উম্মে হাবীবার সঙ্গে এবং তারপর এই বছরই হযরত সুফিয়া ও হযরত মায়মুনা (রাঃ) এর সাথে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে (সূত্রঃ জামালাইন খ, ১ পৃষ্ঠা ৫৯৬-৯৮)।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর অধিক স্ত্রী হওয়ার নেপথ্যে রহস্য কি ঃ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর শ্রেষ্ঠতম আদর্শ। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় ও দৈনন্দিন অসংখ্যা মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় ইসলাম বিদ্বেষীদের একটি মহল বিশ্বনবীর সুনাম ও ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে রাসুল (সাঃ) এর বিরুদ্ধে নানা প্রকার প্রোপাগন্ডা ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। তন্মন্ধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বহু বিবাহের সমালোচনা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। (নাউজুবিল্লাহ্) এই সমোলোচনার জবাব হল, প্রথমত বলবো, আপনি রাসুল (সাঃ) এর জীবনকে ভালো করে জানুন। 
পরিশেষে বলতে চাই, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর চরিত্র নিয়ে সমলোচনা করছেন আর বলছেন তিনি ছিলেন কামাসক্ত, প্রবৃত্তি পূঁজারী, তাহলে তাদের বলবো, আদৌ তারা খতিয়ে দেখেন বিশ্ব নবী বহু বিয়ের আসল তাৎপর্য, আশা করি, উপরোক্ত, আলোচনার মাধ্যমে তাদের মনের তালা ও জট খুলবে।  
লেখক: মুফাসসিরে কোরআন ও প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা কলেজ, শরণখোলা।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।