খুলনা | শুক্রবার | ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে লন্ডভন্ড মরিয়মের মুরগী খামার

ঋণের কিস্তি পরিশোধে এনজিও’র চাপ   

রুহুল কুদ্দস, সাতক্ষীরা   | প্রকাশিত ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:৫০:০০

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে আশাশুনি উপজেলা সদরের মুরগি খামারি মরিয়মের বেঁচে থাকার অবলম্বনটাও ধ্বংস হয়ে গেছে। ঝড়ের তান্ডবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে তার মুরগির খামার। এই অবস্থায় এনজিওরা ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধে চাপ দিচ্ছে। ফলে সব কিছু হারিয়ে এ করকম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মরিয়ম খাতুন। এরকমই নিষ্ঠুরতা আর অমানবিক ঘটনা ঘটে চলেছে দেশের উপক‚লীয় জেলা আশাশুনিতে।
জানা গেছে, এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়ে আশাশুনি উপজেলার সব’চে সফল ও বৃহৎ খামার গড়ে তোলেন সদরের আবু বাক্কারের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন। সফলও হন তিনি। ভাল লাভের মুখও দেখছিল দারিদ্রতা  থেকে উঠে আসা সাধারণ শিক্ষার আলোহীন মরিয়ম। কিন্তু বুলবুলের দমকা হাওয়াতে তার সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে স্বপ্ন।
মরিয়ম বলেন, ‘সকালে উঠে দেখছি প্রচন্ড ঝড় হচ্ছে। দুর্বল ঘরবাড়িগুলো পড়ে যেতে দেখেছি। ভেবেছিলাম শক্তপোক্ত ভাবে বানানো ফার্মের হয়তো কিছু হবে না। তারপরও আমাদের কারো মন মানলো না। এদিকে চলছে বুলবুলের বেপরোয়া তান্ডব অন্যদিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেবো বলে কেবল মুরগিগুলো এক জায়গায় করছি। আর এক মাস হলেই সোনালী মুরগি বিক্রি করলে দামও ভাল পাওয়া যাবে। ঋণ শোধ করে লাভের মুখও দেখা যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ে ফার্মের চাল ভেঙে আমাদের ঘাড়ের উপর পড়লো। চোখের সামনে সহস্রাধিক মুরগি মরলো আর আমাদেরও মেরে গেল। ওই সময় আমরা সবাই মরে গেলে হয়তো এ যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে যখন আমাদের উদ্ধার করলো তখন আমরা সবাই জ্ঞান হারা। জ্ঞান ফিরে হাসপাতাল থেকে ছুটে এসেছি আমার মুরগিরা কেমন আছে দেখতে। কিন্তু এসে দেখি ফার্ম শ্মশান হয়ে গেছে। মরে গেছে সব মুরগি। মরিয়ম এসব কথা বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় সেখানে উপস্থিত প্রতিবেশীরাও কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি।
মরিয়মের ছোট মেয়ে নাজমা খাতুন বলেন, তার মা প্রথমে নিজের অসুস্থতার জন্য ঋণ নেয়। চিকিৎসা করে সুস্থও হয়। এরপর সেই ঋণ শোধ করতে বাবা-মা আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নেয়। উদ্যোগ নেয় সোনালী মুরগির ফার্ম করবে। বাড়ির পাশে ২ বিঘা জমি হারি নিয়ে শুরু করে ফার্ম। সেখানে জমির মালিকও এক লাখ টাকা সুদের ঋণ দেয়। এভাবে ফার্মের পিছনে প্রায় সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আমার মা। একটি পুকুরও লিজ নেয় মাছের চাষের জন্য। আশা ছিল ছেলেকে লেখাপড়া করে বড় করবে। ২ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সুখের মুখ দেখাবে। কিন্তু বুলবুলের ঝড়ের সকালে প্রথমে ভেসে গেল পুকুর। এরপর হঠাৎ ভেঙে পড়ল উপজেলার সবথেকে বড় মুরগির খামার। খামারের মধ্যে থাকা মা মরিয়মও বাবা বক্কারসহ আমাদের পরিবারের সদস্যদের কোনরকমে বাঁচিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেন প্রতিবেশীরা। মা-বাবা জ্ঞান ফিরে দেখেন ফার্মের মুরগি সব মরে শেষ। এখন তাদের বেঁচে থাকারও সব আশা শেষ। এ অবস্থায় ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধে চাপ দিচ্ছে এনজিওরা। তারা যাতে আত্মহত্যাও করতে না পারে তার জন্য খোঁজ খবরও রাখছেন পাওনাদার ও এনজিওরা।
মরিয়মের অসহায় স্বামী আবু বক্কার গাজী বলেন, ফার্মের লিজদাতা এখন পাহারা দিচ্ছে যেন টাকা পরিশোধ না করে আমরা কেউ আত্মহত্যা করতে না পারি। সাস, ব্র্যাক, বিআরডিবি, পল­ী দারিদ্র্য, ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন সবাই কিস্তির টাকা পরিশোধের জন্য অমানবিক চাপ দিচ্ছে। এখন কেউ নেই আমাদের এই দুঃখ দুর্দশার কথা বুঝবে।
এ মুহূর্তে যদি সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ না থাকে তবে নিঃশেষ হয়ে যাবে মরিয়মের পরিবার। একথা জানালেন ওই এলাকার প্রতিটি মানুষ। এখন সাধারণ মানুষ দু’টো খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে তাদের খাওয়া হয় নইলে নয়। মরিয়ম-বক্কার’রা এখন তাকিয়ে আছে সরকারের সহানুভুতির ওপরে। তা নাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলেও মনে করে আরেক প্রতিবেশী মর্জিনা খাতুন।
স্থানীয় আশাশুনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স ম সেলিম রেজা মিলন বলেন, এ মুহূর্তে সরকার মরিয়মদের মুখের দিকে না তাকালে ঝড়ে শেষ হয়ে যাওয়া মুরগিগুলোর মতো মরিয়মের পরিবারটাও শেষ হয়ে যাবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে চেষ্টা করছি তাদের জন্য কিছু করার। তারা যাতে আবার তাদের মুরগীর ফার্মটি চালু করতে পারে। 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, আশাশুনির ক্ষয়ক্ষতির চিত্র অনেক। গণমাধ্যমে তা ঠিকমতো উঠে আসছে না। মরিয়মের যে ক্ষতি হয়েছে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। ক্ষয়ক্ষতির পুরো তথ্য উঠে আসার পরে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান তিনি।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


বিজয়ের মাস ডিসেম্বর 

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর 

০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৫২

নিরালায় কেডিএ’র উচ্ছেদ অভিযান

নিরালায় কেডিএ’র উচ্ছেদ অভিযান

০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:১৫











ব্রেকিং নিউজ


বিজয়ের মাস ডিসেম্বর 

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর 

০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৫২

নিরালায় কেডিএ’র উচ্ছেদ অভিযান

নিরালায় কেডিএ’র উচ্ছেদ অভিযান

০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:১৫