খুলনা | সোমবার | ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

সুপার সাইক্লোন সিডরের এক যুগপূর্তি আজ 

সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ : এখনও থামেনি বুক ফাটা আর্তনাদ

মামুন আহমেদ ও মনিরুজ্জামান আকন  | প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:৪০:০০

বলেশ্বর নদের পাড়ে বগী রিং বাঁধের পাশেই পরিবার নিয়ে বসবাস করেন বাবুল হাওলাদার (৪৫)। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গেই তাকে যুদ্ধ করতে হয় প্রতিনিয়ত। এইতো ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের দিনেও স্ত্রী-সন্তানদের আশ্রয় কেন্দ্রে রেখে একাই ছিলেন ঘরে। বাঁধ উপচে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় ঘর। এ সময় তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে একটি গাছ ধরে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুই বিঘা জমি সবই বলেশ্বরের ভাঙনে চলে গেছে। শুধু ঘর টুকু বাকি আছে। তার ঘর বাইরে রেখেই নতুন বাঁধের জায়গা নির্ধারণ করায় হতাশায় পড়েছেন তিনি। ওই একই এলাকায় ফুলমিয়াসহ আরো দুই-তিনটি পরিবার রয়েছে।
বগী গ্রামের ভেড়ীবাঁধের বাইরে একটি ঝুপড়ি ঘরে দুই ছেলের সঙ্গে থাকেন আলেতননেছা (৯০)। স্বামী সেকান্দার পঞ্চায়েত সিডরে আহত হয়ে মাসখানেক পরই মারা যান। তিনি জানান, অনেক জমিজমা ছিল সবই বলেশ্বরে গিলেছে। সিডরে তার ছেলের বউ, দুই নাতি, বেদর-ভাসুরসহ বংশের ১৭ জন মারা যায়। বাইরে আর কোনো জমিজমা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওখানেই থাকতে হচ্ছে তাদের। প্রলয়ঙ্কারী সিডরের কথা স্মরণ হলে প্রায় শতবর্ষী এ বৃদ্ধা এখনও আঁৎকে ওঠেন আর সব হারানোর বেদনায় নীরবে চোখের পানি ফেলেন। 
আজ সেই ভয়াল ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে স্মরণকালের ভয়াবহ ঝড় “সিডর” আঘাত হানে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে। সুপার সাইক্লোন সিডরের ভয়াবহতার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। সেদিনে সিডরের ভয়াল ছোবলে শরণখোলা উপজেলা পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। প্রিয়জনকে হারানো ওই দিনের কথা মনে করে এখনও বুকফাটা আর্তনাদ করে শরণখোলাবাসী। সে সময় সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে সরকারি হিসাবে মারা যায় ৯০৮ জন। এর মধ্যে শরণখোলার উপজেলায় মারা যায় ৮শ তাধিক মানুষ। যার অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু। লন্ড-ভন্ড হয়ে যায়, ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ক্ষেত। তবে বেসরকারি হিসাবে এ মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় বাগেরহাটের ৫টি উপজেলার প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার এলাকা। সে সময়ে ওই এলাকার বাসিন্দারা বলেশ^র ও ভোলা নদের উপর টেকসই ভেড়ীবাঁধ নির্মাণের দাবি তোলে। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে বিশ^ব্যাংকের অর্থায়নে সরকার বিগত ২০১৫ সালে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রায় সাতশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বাঁধ নির্মাণ কাজের ঠিকাদারি কাজ পায় বিদেশী একটি প্রতিষ্ঠান। বাঁধের জমি গ্রহণের পর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তারা শুরু করে বাঁধের নির্মাণ কাজ। এই বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের জানুয়ারিতে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় ছয় মাস পার হলেও বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এ উপজেলার দেড় লক্ষাধিক জনগোষ্ঠী জানেন না তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য নির্মাণাধীন এই বাঁধের নির্মাণ কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে। দুর্যোগের ঘনঘটা হলেই শরণখোলার বাসীর দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। তাই তারা অবিলম্বে তাদের এই বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানিয়েছেন। 
ছয় নম্বর বগী ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য মোঃ রিয়াদুল পঞ্চায়েত ও দক্ষিণ সাউথখালী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ জাকির হাওলাদার জানান,  শরণখোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের ৬৩ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে বগী ও দক্ষিণ সাউথখালী এলাকা। এই ভাঙন প্রবন এলাকা দু’টিতে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসবাস। শরণখোলার মধ্যে তাদের এলাকা দুটিই যে কোনো দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বছরে দুই-তিনবার ঝড়-বন্যার মোকাবেলা করতে হয় তাদের। প্রতিবছর নদীভাঙনে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকাতে টেকসই বাঁধ নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ সিডরের পরে এলাকাবাসীর প্রধান দাবি ছিল ‘ত্রাণ চাই না মোরা টেকসই ভেড়ীবাঁধ চাই’। কিন্তু এক যুগ হয়ে গেলেও বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়নি। 
গাবতলা আশার আলো মসজিদ কাম সাইক্লোন শেল্টারের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আঃ বারেক হাওলাদার (৭০) জানান, নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন প্রায় মসজিদের কাছে এসে গেছে। এখনই টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে নদী পাড়ের  মানুষের দুর্যোগের এই আশ্রয়স্থলও বিলীন হয়ে যাবে।
সাউথখালী ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মোজাম্মেল হোসেন বলেন, তার ইউনিয়নের ১৫ কিলোমিটার বাঁধই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে বগী ও দক্ষিণ সাউথখালী অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে চায়না কোম্পানি তার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বাদ রেখে অন্য এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধের কাজ করছে। ভাঙনে বার বার বাঁধের স্থান পরিবর্তন করায় এলাকার ফসলী জমি, বাড়িঘর হারাচ্ছে মানুষ। নদী শাসন করে বাঁধ নির্মাণ হলে বাঁধ টেকসই হবে। অন্যথায় তা কোনো কাজে আসবে না। নদী শাসনের দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড, সিইআইপি প্রকল্প এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বহুবার আবেদন করেও কাজ হচ্ছে না। এছাড়া কাজের মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দুই দফা সময় বাড়িয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ সাউথখালী এলাকার বাঁধ এখনো করা হয়নি। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন।
উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, ইতিমধ্যে আমরা এই বাঁধের ৭০ ভাগ কাজ শেষ করেছি। আগামী ২০২০ সালের জুন মাস নাগাদ এই বাঁধের কাজ শেষ করতে পারবে বলে আশা করছেন তারা। এটি নির্মাণ হলে ওই এলাকার মানুষ ঝড় জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশিদ বলেন, সিডরের পর ক্ষতিগ্রস্ত শরণখোলা উপজেলায় নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। যার ফলে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ, রাস্তা ঘাট, কালভার্ট নির্মাণসহ অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বর্তমানে চলামান ভেড়ীবাঁধ নির্মাণ কাজের মনিটনিং করা হচ্ছে, এছাড়াও সরকার আরও অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছে এই দুর্গত মানুষের জন্য। আশা করছি দ্রুত ভেড়ীবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করা যাবে।  
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





কপিলমুনি মুক্ত দিবস আজ

কপিলমুনি মুক্ত দিবস আজ

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৫০

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৪৮








ব্রেকিং নিউজ





কপিলমুনি মুক্ত দিবস আজ

কপিলমুনি মুক্ত দিবস আজ

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৫০

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:৪৮