খুলনা | শুক্রবার | ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

উপকূলে সেনা মোতায়েন : এক লাখ ২ হাজার মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে

সাতক্ষীরায় পাউবোর দু’টি বিভাগের আওতায় ২৫০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ

রুহুল কুদ্দুস, সাতক্ষীরা | প্রকাশিত ১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:৪২:০০

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে সাতক্ষীরা উপকূলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও জানমালের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, নৌ বাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সাথে সেনাবাহিনীও উপকূলীয় এলাকায় কাজ করছে।  
এদিকে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গতকাল শনিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাতক্ষীরা উপকূলের এক লাখ ২ হাজার মানুষকে নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। 
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাতক্ষীরায় শনিবার দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়া বইয়ে যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কখনও মাঝারি ও আবার কখনো ভারি বৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড় আতঙ্কে জেলার সব স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদের ছুটি বাতিল করে স্ব-স্ব এলাকায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে। শনিবার সকালে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারির পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে গঠিত টিম উপকূলবর্তী মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারসহ নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক সার্বক্ষণিক খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও দুর্যোগ সতর্কতা সংকেত জারি ও মাইকিং করে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও প্রথমে সাধারণ মানুষ ততটা সাড়া দেয়নি।  
এদিকে, টানা বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকেই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার, শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম আতাউল হক দোলন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে নিয়ে উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা, পদ্মপুকুর, ও বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে সাইক্লোন সেল্টারে নেওয়ার তৎপরতা চালান। কোস্ট গার্ড সদস্যরাও তাদের বোটে করে দূরবর্তী এলাকার লোকদেরকে সাইক্লোন সেল্টারে নিয়ে যায়।
একই সাথে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ও পদ্মপুকুরের মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে আনার জন্য জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারটি বাসও দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় অনবরত চলছে মাইকিং। প্রতিটি এলাকায়ই তোলা হয়েছে সতর্কতামূলক ফ্লাগ।  
তেমনি শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কালিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী ও ইউএনও মোজাম্মেল হক রাসেল এবং শনিবার ভোর থেকে তালার ইউএনও ইকবাল হোসেন এলাকায় এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করেন। 
তবে, শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার গাবুরা, হরিশখালী, নাপিতখালী, জেলেখালী, বুড়িগোয়ালীনির দুর্গাবটি পোড়াকাটলা, ভামিয়া ও দুর্গাবাটি এবং আশাশুনি উপজেলার চাকলা, কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালি, বিছট, কাকবসিয়া, হিজলিয়া-কোলা, হাজরাখালি, দয়ারঘাট এলাকার পাউবো’র ভেড়ীবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া কৈখালীর বিভিন্ন অংশ এবং কাশিমাড়ী ও দাতিনাখালীসহ পদ্মপুকুরের কয়েকটি অংশের বাঁধের দুরাবস্থাও চরমে। এসব এলাকার বাঁধ ভেঙে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় রয়েছে এলবাবাসী। 
কোস্ট গার্ডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের মধ্যে এবং লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন একমাত্র গ্রাম গোলাখালী থেকে ৬৮৫ জন মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। 
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার দু’টি বিভাগের আওতায় ২৫০ কিলোমিটার ভেড়ীবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। বুলবুলের জলোচ্ছ্বাসের আঘাত যদি পানির উচ্চতা ৭ ফুট বৃদ্ধি পায় সেক্ষেত্রে এসব ভেড়ীবাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে জানা গেছে। 
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের উপ-পরিচালক জুলফিকার অলী জানান, দুপুর ১২ পর্যন্ত সাতক্ষীরায় ২৯ মিলি লিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। 
জেলার সাতটি উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শনসহ সাইক্লোন সেন্টারে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেন সাতক্ষীরার স্থানীয় সরকারে উপ-পরিচালক হুসাইন শওকত, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ বদিউজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এম এম মাহমুদুর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাইদ। 
এদিকে, জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির মাধ্যমে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা ও পদ্মপুকুরের মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে বহনের জন্য চারটি বাস ও অন্যান্য যানবাহন নিয়োজিত করা হয়। 
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দুর্যোগে সাতক্ষীরার সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও জানমালের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ডিডিএলজিসহ চারজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে সাধারণ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। এ পর্যন্ত (বিকেল ৫টা) এক লাখ ২ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনা হয়। এছাড়া সন্ধ্যার পর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সেনাবাহিনীর ১০০ সদস্যের একটি টিম উপকূলীয় এলাকায় নিয়োজিত করা হয়। 
তিনি আরো বলেন, দুর্যোগ কবলিতদের সহায়তায় ৩১০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৭ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট ও পর্যাপ্ত ওষুধপত্র মজুদ রাখা হয়েছে। একই সাথে দুর্যোগ পূর্ববর্তী, দুর্যোগ কালীন এবং দুর্যোগ পরবর্তী তিন স্তরের প্রশিক্ষিত ২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকসহ ৮৫টি মেডিকেল টিম নিয়োজিত রয়েছে। শিশুদের জন্য ১ লাখ টাকা ও গবাদি পশুর জন্য আরো ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 
উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন নদী ও খালে থাকা নৌযানগুলিকে উপকূলবর্তী নিরাপদ স্থলে আনা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ