খুলনা | শুক্রবার | ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

মোংলা ও পায়রায় ৭, চট্টগ্রামে ৬, কক্সবাজারে ৪ নম্বর সর্তক সংকেত : উপকূলীয় এলাকায় সাত ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা

ধেয়ে আসছে ‘বুলবুল’ 

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত ০৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:২৬:০০

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা অভিমুখে ধেয়ে আসছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঘণ্টায় ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি গতিমুখ ছিল সুন্দরবনের দিকেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা গেছে, আজ শনিবার বিকেলের পর উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ের প্রভাব অনুভূত হতে পারে। ঝড়ের প্রভাব বেশি পড়তে পারে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালীর উপকূল এলাকায়। মধ্যরাতে খুলনা অঞ্চল দিয়ে বুলবুল উপকূল অতিক্রম করতে পারে। সে কারণে  মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর, চট্টগ্রামে ৬ ও কক্সবাজারে ৪ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে। উপকূলীয় এলাকায় সাত ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে সব মাছ ধরা ট্রলার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয় থাকতে বলা হয়েছে। 
প্রস্তুত রাখা হয়েছে উপকূলের আশ্রয় কেন্দ্র। নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে উপকূলবাসীদেরকে। সারাদেশে সব ধরণের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষনা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। সরকারি সংশ্লিষ্ট সকল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মোংলা ও পায়রা বন্দরের বহির্নোঙ্গর ও জেটিতে সবধরনের পণ্য খালাস ও বোঝাই বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জাহাজ বন্ধ, ফলে সেন্টমার্টিনে আটকা পড়েছে দেড় হাজার পর্যটক। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ‘রাস মেলা’ বন্ধ ঘোষণা করে নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞাজারী করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আবহাওয়া অধিদফতরে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সংস্থাটির উপ-পরিচালক আয়েশা খাতুন সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ বাংলাদেশের খুলনা তথা সুন্দরবন উপকূলে ‘বুলবুল’ আঘাত হানতে পারে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪০ কিলোমিটার। যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত করলে ৫ থেকে ৭ উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। আয়েশা খাতুন বলেন, ‘আমরা ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকা উপকূলের কাছাকাছি থাকতে নির্দেশনা দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে আটটি জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, চাঁদপুর ও ভোলা।
আবহাওয়া অধিদফতর আরও জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আন্দামান সাগরে উৎপত্তি হয়েছে। পরে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।
এর আগে গতকাল শুক্রবার সচিবালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ এনামুর রহমান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আগামীকাল শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের মধ্যে কোন সময়ে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। এ সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ৫ থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় এ ঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। এদিকে, শক্তি সঞ্চার করে ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। শুরুর দিকে ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ৮০-৯০ কিলোমিটার ছিল।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান বলেন, পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এই ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চল। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় রয়েছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর অঞ্চল। তবে কক্সবাজার থাকবে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেতের আওতার মধ্যে।
এদিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার গতিবেগে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অভিমুখে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড়টি। এ গতিবেগে আঘাত হানলে ভালোই ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। অথচ শুরুর দিকে এর গতিবেগ ছিল মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার। কিনারে আসতে আসতে আরও গতিবেগ বাড়তে পারে। শুক্রবার ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অরগানাইজেশনের ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এটিকে খুব মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় বলে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।
সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট উষ্ণমন্ডলীয় ঝড় মাতমো গত অক্টোবরের শেষে ভিয়েতনাম হয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। সেই ঘূর্ণিবায়ুর অবশিষ্টাংশই ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে আবার নিম্নচাপের রূপ নেয়। বার বার দিক বদলে নিম্নচাপটি আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে বুধবার রাতে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তখন এর নাম দেয়া হয় বুলবুল। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তরের নির্ধারিত তালিকা থেকে ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলের ঝড়ের নাম দেয়া হয়। বুলবুল নামটি নেয়া হচ্ছে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকে। 
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বুলবুলের প্রভাবে বৃষ্টি ঝরবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং ভারতের ওড়িষা ও পশ্চিমবঙ্গ। তবে উপকূলে আঘাত হানার আগে কিছুটা কমে আসতে পারে এ ঝড়ের শক্তি।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা শুক্রবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে জরুরি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় ইতোমধ্যে ৩৪৯টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলো আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিদের কাছে দুর্যোগকালীন করণীয় সম্পর্কে ইতোমধ্যে বার্তা পৌঁছানো হয়েছে এবং খুলনায় একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খোলা হয়েছে (যার নম্বর ০৪১-২৮৩০০৫১)।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ইতোমধ্যে রাসমেলামুখী সকল নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রেডক্রিসেন্টসহ উদ্ধারকর্মীরা প্রস্তুত আছে। পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, অর্থ, ওষুধ এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুদ রাখা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, কৃষি বিভাগসহ সকল বিভাগ তাদের অধিক্ষেত্রে সম্পদ রক্ষার সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের  ছুটি বাতিল করেছে। খুলনা জেলার কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় আক্রান্ত প্রবণ এলাকা। এই সকল এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা জারি ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।  ইতোমধ্যে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অন্যদিকে একই স্থানে খুলনার ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার সুবাস চন্দ্র সাহার সভাপতিত্বে খুলনা বিভাগীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি খোলা হয়েছে (তার নম্বর-০৪১-৮১৩৯৪০ এবং ০৪১-৮১৩৯৮১)। সভায় জানানো হয়, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই খুলনাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকায় মেঘলা আবহাওয়া, কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ির বৃষ্টিও হয়।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মর্কতা আজিজুল হক জোর্য়াদ্দার বলনে, ‘বুলবুল’র প্রভাব মোকাবেলা ও সকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভায় প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি ৩৩৮টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত করা হয়েছে। উপকূলীয় দাকোপ ও কয়রা উপজলোয় ২৪ হাজার ৬০ সিপিপি স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সেন্টমার্টিনে আটকা দেড় হাজার পর্যটক : বেড়াতে এসে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে আটকে পড়েছেন দেড় হাজারের মতো পর্যটক। ঘূর্ণিঝড়ে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে জাহাজসহ সবধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় তারা সেখানে আটকা পড়েন। যারা শুক্রবার সেন্টমার্টিন যেতে চেয়েছিলেন, তারাও বিপাকে পড়েছেন। এক হাজারের বেশি পর্যটক টেকনাফ ঘাট থেকে ফিরে গেছেন।
দুর্ঘটনা এড়াতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) টেকনাফ অঞ্চলের সমন্বয় কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন,  বৈরী আবহাওয়া কারণে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এই রুটে সাতটি জাহাজ চলাচল করছিল। দ্বীপে বেড়াতে এসে আটকা পড়া পর্যটকেরা নিরাপদে রয়েছেন। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সবধরনের নৌযানকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ