খুলনা | শুক্রবার | ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

শেখ মনির-উজ-জামান লাভলু | প্রকাশিত ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৪১:০০

আকাশের উদারতা এবং স্বর্গের শান্তি নিয়ে সময় সময় যে সকল মহাপুরুষ মর্ত্যরে দ্বারে আতিহ্য গ্রহণ করে জগতে স্মৃতি চিহ্ন রেখে যান মহাত্মা হযরত খানজাহান (রহঃ) তাঁদের অন্যতম। তিনি একজন প্রখ্যাত সুফিসাধক এবং বৃহত্তর যশোর-খুলনার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এলাকার শাসক ছিলেন। তাঁর অন্যান্য নামের মধ্যে উলুঘ খানজাহান খান-ই আজম সমধিক প্রসিদ্ধ। অনেকে তাঁকে ‘খাঞ্জিলী পীর’ নামে জানে। তিনি ছিলেন একজন শাসক দরবেশ। তিনি ছিলেন পারস্য মুসলমান। প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত থেকে জানা যায়, তিনি তুরস্কের খাওয়ারিজিমে আনুমানিক ১৩৭৯ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। যার বর্তমান নাম খিরা। খান জাহানের বাল্য নাম ছিল কেশর খান। তাঁর পিতার নাম আজর খান, মাতার নাম- আঙিনা বিবি।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের বেশ পরে চৌদ্দ শতকের শেষের দিকে বাল্যবস্থায় পিতা-মাতার সাথে খানজাহান গৌড়ে আগমন করেন। গৌড়ের নিকটবর্তী নবীপুরে তাঁদের বাড়ি ছিল। পিতা আজর খান সন্তানকে ধর্মীয় সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষে খানজাহানকে  প্রখ্যাত ওলী হযরত নূর কুতুবুল আলমের মাদ্রাসায় পাঠান। ইতোমধ্যে তাঁর বাবা ইন্তেকাল করেন। মাতা আঙিনা বিবি অতি কষ্টে শিশু সন্তানকে লালন পালন করেন। শৈশবকাল থেকেই খানজাহান সাহসী, সৎচরিত্রবান ও দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিলেন। ওস্তাদ নূর কুতুবুল আলম জৌনপুরের প্রতাপশালী শাসনকর্তা ইব্রাহিম শর্কির নিকট এক পত্রসহ তাঁর প্রিয় শিষ্য খান জাহানকে প্রেরণ করেন। পত্র পেয়ে শাসনকর্তা ইব্রাহিম গোর্কি তাঁকে সৈনিক পদে নিয়োজিত করেন।  চাকুরিতে সৈনিক খানজাহান অল্প দিনের মধ্যে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং প্রধান সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তখন গৌড়ের সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা মোটেই ভাল ছিল না। গৌড়ের শাসনকর্তা রাজা গনেশ। তিনি ছিলেন অত্যাচারী শাসক। তিনি ক্ষমতায় এসে মুসলমানদের উপর অমানবিক অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকেন। গনেশের অত্যাচারের মাত্রা যখন চরমে তখন  হযরত নূর কুতুবুল আলম জৌনপুরের শাসনকর্তা ইব্রাহিম শর্কির নিকট পত্র লিখে ইসলাম রক্ষার্থে গণেশকে দমন করার আহ্বান জানান। ওলীর পত্র পেয়ে ইব্রাহিম শর্কি তাঁর প্রধান সেনাপতি খান জাহানের নেতৃত্বে ষাট হাজার সৈন্য দিয়ে রাজা গণেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। খানজাহানের সুনিপুণ রণকৌশলে রাজা গণেশ যুদ্ধে পরাজিত হন । যুদ্ধ শেষে তিনি ওস্তাদ নূর কুতুবুল আলমের নিকট কিছুদিন থাকার জন্য ছুটির আবেদন করেন। সুলতান পুলকিত হয়ে তাঁর ছুটি মঞ্জুর করেন। খান জাহান তাঁর ওস্তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করেন। ওস্তাদ তাঁকে কামেলিয়াতি সম্পর্কে শিক্ষা দান করেন।  তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেন এবং জৌনপুরেই তাঁর মনের অবস্থার  আমূল পরিবর্তন হয়। 
পীর নূর কুতুবুল আলম তাঁর সুযোগ্য শিষ্য খান জাহানের আচার-আচরণে মুগ্ধ হন এবং স্বীয় কন্যাকে খানজাহানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। তাঁর নাম ছিল সোনা বিবি। তিনি কিছুকাল দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেন। সে সময় চারদিকে ইসলামের দুঃসময়। তাছাড়া যাঁর জন্ম হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি কি ঘরে বসে থাকতে পারেন? স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ে রেখে তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য বেরিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল বেগনী বিবি ওরফে বিবি বেগনী। বিবি বেগনী ধর্মান্তরিত মুসলমান ছিলেন। হযরত খান জাহান দুই স্ত্রীর নামে সোনা মসজিদ ও বিবি বেগনী মসজিদ নির্মাণ করেন। খান জাহান নিঃসন্তান ছিলেন। 
ধর্ম প্রচার ও রাজ্য শাসনঃ হজরত খানজাহান দক্ষিণ বাংলার যশোর ও খুলনার শক্তিশালী, ন্যায়পরায়ণ এবং ধর্মভীরু শাসক ছিলেন। এ সকল আমলে তাঁর নির্মিত স্থাপত্য ও কীর্তি দেখে এ সত্যতার স্বাক্ষর মেলে। প্রাপ্ত তথ্য মতে রাজদরবার বা  ওস্তাদের আস্তানা ছেড়ে তিনি প্রথমে আস্তানা গড়েন যশোরের বারো বাজার নামক স্থানে। তিনি সম্ভবত গঙ্গা পার হয়ে নদীয়ার মধ্য দিয়ে ভৈরব নদের কুল ধরে এ বারো বাজারে (ঝিনাইদহ ও যশোরের সীমান্তে) উপনীত হন। কথিত আছে যে, তিনি ১২ জন সহচর (আওলিয়া) নিয়ে এখানে অবস্থান করেন তাই এর নাম বারো বাজার। মূলতঃ এখান থেকে তাঁর ইসলাম প্রচারের শুভ সূচনা ঘটে। তাঁর কর্ম আচার-আচরণ ও ভালবাসায় বিমুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি এখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন এবং অনেক দিঘী খনন করেন এবং রাস্তাঘাট ও মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে তিনি আরো দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে আস্তানা গড়েন যশোরের মুড়লী নামক স্থানে। তিনি এ স্থানের নাম মুড়লী কসবা রাখেন। এখানেও তিনি স্বল্প দিন অবস্থান করেন। এখান থেকে খানজাহানের বাহিনী তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাঁর নিজের নেতৃত্বে একটা দল ভৈরবের তীর ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। দ্বিতীয় দল কপোতাক্ষের গতিপথ ধরে সোজা দক্ষিণে সুন্দরবনের দিকে চলে যায়। আর তৃতীয় দল মুড়লীতে থেকে যায়। মুড়লীতে থেকে যাওয়া বাহিনীর নেতৃত্বে থাকেন বাহ্রাম শাহ ও গরীব শাহ। এখানে  অর্থাৎ বর্তমানে যশোর কালেক্টর ভবনের উত্তর পাশের্^ তাঁদের মাজার রয়েছে। কপোতাক্ষের তীর ধরে যে দল অগ্রসর হয় সে দলের নেতৃত্বে ছিলেন বুড়ো খাঁ ও তাঁর ছেলে ফতে খাঁ। এ দল দক্ষিণে বেদকাশী পর্যন্ত অগ্রসর হয়। এ অঞ্চলে তখন সুন্দরবনের অংশ ও জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। তাঁদের হাতে এ অঞ্চলে আবাদ হয় ও জনপদের শুভ সূচনা ঘটে। মনুষ্য সভ্যতার বিকাশের লক্ষে ও জনকল্যাণে তাঁরা এ অঞ্চলে  পুকুর খনন, রাস্তাঘাট তৈরী ও মসজিদ নির্মাণ করেন। বিদ্যানন্দকাটিতে (বর্তমানে কেশবপুর উপজেলায়  অবস্থিত) তাঁদের খননকৃত একটি বড় দীঘি রয়েছে। ভৈরবের তীর ধরে অগ্রসরমান প্রধান বাহিনীর নেতৃত্ব দেন স্বয়ং খানজাহান। তাঁর দল আরো দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পয়োগ্রাম কসবা নামক  স্থানে পৌঁছায়। তিনি সেখানে আস্তানা গড়েন তার নাম খাঞ্জেপুর। তাঁর আগমনে এলাকাটি জমজমাট হয়ে ওঠে। অতি দ্রুত এ এলাকায় মসজিদ, অট্টালিকা গড়ে ওঠে। তাঁর প্রিয় শিষ্য তাহেরের হাতে এ অঞ্চলের শাসনভার অর্পণ করে তিনি আবার বেরিয়ে পড়েন। তিনি ভৈরব অতিক্রম করে উত্তর দিকে অগ্রসর হন। যেখানে তিনি নদী অতিক্রম করেন তা’ আজও পারঘাট নামে পরিচিত। কিছুদূর এগিয়ে তিনি আবার প্রত্যাবর্তন করেন এবং নদীর উত্তর পাড় ধরে অগ্রসর হন। সিদ্ধিপাশা, দিঘলিয়া, সেনহাটি ও চন্দনীমহল হয়ে খুলনার সেনের বাজারের নিকট উপনীত হন। রাস্তা  ও জলাশয় খনন করতে করতে তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন। সেনের  বাজারের নিকটে এসে বীর সেনাপতি খানজাহান তাঁর বাহিনী নিয়ে ভৈরব নদ অতিক্রম করে দক্ষিণ তীরের বর্তমান খুলনার তালিমপুর, শ্রীরামপুর, নৈহাটি, সামন্তসেনা, বাগেরহাটের বাহিরদিয়া, আট্টাকা, লালচন্দ্রপুর, সাতশৈয়ার মধ্য দিয়া ব্রাহ্মণরাংদিয়ায় উপনীত হন। এরপর তিনি মধুদিয়া ও বাদোখালী বিলের পাশ দিয়ে অগ্রসর হয়ে বাগেরহাট শহরের অনতিদূরে সুন্দরঘোনা (মর্গা বাজারের সন্নিকটে) নামক স্থাানে  আস্তানা গড়েন এবং এখানে বাকী জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটাই ছিল তাঁর বসতবাড়ি। মূলত খানজাহানের অনুসারীগণ অর্থাৎ মুসলমানগণ সুন্দরবন আবাদ করে সেখানে মানব সভ্যতার শুভ সূচণা করেন। খানজাহানের সবচেয়ে বৃহত্তম কীর্তি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। এটি এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রাচীণ মসজিদ। আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এ মসজিদ নির্মাণ করেন। কথিত আছে যে, তিনি অলৌকিক শক্তির প্রভাবে বহু অসাধ্য কার্য সাধন করেন। জনশ্র“তি আছে যে, ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণে অনেক পাথর ব্যবহৃত হয়েছে যা’ রাজমহল, গৌড় এবং চট্রগ্রাম পাহাড়ী এলাকা থেকে নদী পথে ভাসিয়ে নিয়ে আসেন। জাতিসংঘের ইউনেস্কো কতৃক এ মসজিদ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। তিনি যশোর খুলনা অঞ্চলে ৩৬০টি দীঘি ও ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ করেন মর্মে জনশ্র“তি আছে। ইতিহাসের স্বাক্ষীস্বরূপ এখনো অনেক মসজিদ ও দীঘির নিদর্শন  বিদ্যমান রয়েছে। সবচেয়ে বড় দীঘি হচ্ছে খাঞ্জিলী দীঘি বা ঠাকুর দীঘি। এটি খানজাহানের সমাধি বা দরগার দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এর গা ঘেষে রয়েছে একটি সুরম্য এক গম্বুজ মসজিদ। খাঞ্জিলী দীঘিতে কুমির রয়েছে। এক সময় ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে দু’টি কুমীর ছিল। দর্শনার্থী/ ভক্তরা মোরগ/ মুরগী এনে দরগার ফকিরদের হাতে তুলে দিত এবং ফকিররা ‘কালা পাহাড়’, ‘ধলা পাহাড়’ নামে ডাক দিলে কুমীরগুলো কুলে আসতো এবং ফকিররা মোরগ/মুরগী পানিতে ছুড়ে মারতো। কুমীর ছো মেরে ওগুলো নিয়ে দীঘির মধ্যিখানে চলে যেতো। ভক্তরা এভাবে মানত পুরণ করতো। কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়  এখন আর নেই। তবে তাদের বংশধর রয়েছে। এখনো অনেকে প্রথাগতভাবে মোরগ/মুরগী মানত করে দরগায় নিয়ে আসে। খানজাহানের খননকৃত আরেকটি বৃহৎ দীঘি হচ্ছে ঘোড়া দীঘি। এটি ষাট গম্বুজ মসজিদের একেবারে পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত। কথিত আছে যে, তিনি জীন সম্প্রদায়ের আশ্রয় নিয়ে রাতারাত দীঘিটি খনন করেন। বাগেরহাট শহরের দশানী ট্রাফিক মোড় থেকে কাড়াপাড়া গিলাতলা সড়কে যেতে ডান পাশে পচা দীঘি নামে একটি লম্বাটে সুবিশাল  দীঘি রয়েছে। দীঘিটি খাঞ্জিলী দীঘি বটে। এ রকম তাঁর কর্তিত অসংখ্য দিঘী রয়েছে। খানজাহান (রহঃ) শুধুমাত্র একজন শাসক বা সেনাপতি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত স্থপতি ও নগরবিদ। তিনি বৃহত্তর যশোর-খুলনায় চারটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমটি বারো বাজার, দ্বিতীয়টি মুরলী কসবা, তৃতীয়টি পায়গ্রাম কসবা এবং চতুর্থটি হলো হাবেলী কসবা শহর গুলোর পত্তন ঘটান। তিনি জঙ্গল পরিষ্কার করে  অনেক রাস্তা  নির্মাণ করেন। তিনি বাগেরহাট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি মহাসড়ক, রূপসার সামন্ত সেনা থেকে বাগেরহাটের বাঁদোখালি পর্যন্ত বিশ মাইল দীর্ঘ সড়কসহ অনেক সড়ক নির্মাণ করেন। এর উভয় পাশ দিয়ে অনেক বসতি গড়ে ওঠে। প্রকৃত অর্থে তাঁর হাতেই সুন্দরবন অঞ্চলে আবাদ হয় এবং জনবসতি গড়ে ওঠে। তিনি নির্মাণ করেন রণবিজয়পুর মসজিদ (রণবিজয়পুর অবস্থিত), সিঙ্গাইর মসজিদ (বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের পাশেই সিংগাইড় গ্রামে অবস্থিত), নয় গম্বুজ মসজিদ (খাঞ্জিলী দিঘীর পশ্চিম পাশের্^ অবস্থিত), বিবি বেগনী মসজিদ (কাড়াপাড়া ইউনিয়নে মগরা গ্রামে অবস্থিত), চুনাখোলা মসজিদ (ষাটগম্বুজ ইউনিয়নে চুনাখোলা গ্রামে অবস্থিত), রেজাই খাঁ মসজিদ (ষাটগম্বুজ ইউনিয়নে সুন্দরঘোনা গ্রামে অবস্থিত), মিঠাপুকুর পাড় মসজিদ (বাগেরহাট শহরের মিঠাপুকুরের পশ্চিম পাশে সরুইতে অবস্থিত), হোসেনশাহী মসজিদ (বাগেরহাট সদর উপজেলা হেড কোয়াটার্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত), সাবেক ডাঙ্গা মসজিদ (কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেক ডাঙ্গা গ্রামে ষাটগম্বুজ রেল স্টেশনের সন্নিকটে অবস্থিত) লালচনদ্রপুর খাঞ্জিলী মসজিদ (ফকিরহাটের বাহিরদিয়া-মানসা ইউনিয়নের লালচন্দ্রপুর গ্রামে অবস্থিত), মকর উল্লাহ মসজিদ (ফকিরহাটের পিলজঙ্গ ইউনিয়নের পিলজঙ্গ গ্রামে পিলজঙ্গ হাই স্কুলের সন্নিকটে অবস্থিত), শুভদিয়া খাঞ্জিলী মসজিদ (ফকিরহাটের শুভদিয়া ইউনিয়নে তাকিয়াবাটিতে অবস্থিত), চাকশ্রী মসজিদ (রামপালের চাকশ্রী বাজারের সন্নিকটে অবস্থিত),  সোনাকান্দর মসজিদ (কচুয়া উপজেলাধীন সোনাকান্দর গ্রামে অবস্থিত )।
তিনি নিজেকে একজন খলিফা অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে পরিচয় দিতেন। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের মুকুটহীন সম্্রাট তাতে কোনো সন্দেহের কারণ নেই। আরো উল্লেখ্য যে, খানজাহানের মৃত্যুর পরেও খলিফাতাবাদে সভ্যতা বিকাশের ধারা অব্যাহত থাকে। স্বাধীন সুলতানের আমলে নশরৎ শাহ  খলিফাতাবাদে (বাগেরহাট) আসেন, এখানে রাজ্য শাসন করেন এবং ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক টাকশাল প্রতিষ্ঠা করে (বাগেরহাট শহরের মিঠা পুকুরের পূর্ব পাড়ে) নিজ নামে অঙ্কিত মুদ্রার প্রচলণ করেন। স্বাধীন সুলতানের আমলে এরূপ ২১টি টাকশাল ছিল। খলিফাতাবাদে তিন প্রকার মুদ্রা পাওয়া গেছে। কলকাতার জাদুঘরে এই তিন প্রকার মুদ্রা রক্ষিত আছে। 
খানজাহানের সমাধিসৌধ থেকে কয়েক মিটার পূর্ব দিকে একটি ভবন ছিল। বর্তমানে এটি মাটির সাথে মিশে গেছে। এই ক্ষুদে পাকা ঘরটির ভেতরের দিকের পূর্ব দেয়ালে বেশ কিছু তাক ছিল। ধারণা করা হয়, এটি রান্না ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হতো। স্থানীয় জনশ্র“তি থেকে জানা যায়, খানজাহান তাঁর জীবনের শেষ কিছু সময় এর পার্শ্বে যেখানে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে সেখানে থাকতেন। হযরত খান জাহান (রহঃ) এর মাজার গাত্রের শিলালিপিতে লিখিত তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি ৮৬৩ হিজরি ২৬ শে জিলহজ্জ মোতাবেক ১৪৫৯ খ্রিঃ ২৩ অক্টোবর (দিনপঞ্জি হিসাবে গরমিল রয়েছে) বুধবার রাতে ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাযরত অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। বৃহস্পতিবার আছর নামাজের পরে এই ধর্মীয় সাধককে নিজের তৈরি সৌধে (খাঞ্জিলী দরগা শরীফ) সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে খলিফাতাবাদ শহরে এক শোকের ছায়া নেমে আসে। 
প্রতি বছর চৈত্র মাসে শুক্ল পক্ষে তাঁর দরগা প্রাঙ্গণে বার্ষিক ওরস ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জোছনাময় রাতগুলো উদ্ভাসিত হয় নানা বর্ণিল আলোকচ্ছটায়। হাজার হাজার ভক্তরা এ মেলায় এসে পূণ্যস্নাত হন।
পূর্বেই বলা হয়েছে, খানজাহান (রহঃ) ছিলেন এ তল্লাটের মুকুটহীন সম্রাট। তিনি ছিলেন সকলের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও বিশ^াসের পাত্র। জনশ্র“তি আছে যে, কেউ ভয় পেলে বা কারো জ্বর হলেও ছুটে যেতেন হুজুরের কাছে। হুজুর মাথায় ফু দিয়ে দিতেন সে আরোগ্য লাভ করতো। এখনো ভক্তরা বিশ^াস করেন যে, হুজুরের দিঘীর অর্থাৎ খাঞ্জেলী দিঘীর পানি পবিত্র। এ পানি পান করলে অনেক বিমার থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। অনেকে এ দিঘীতে গোসল করে পূণ্যস্নাত হন। তাঁকে শ্রদ্ধার আসনে রাখতে বা তাঁর নামে প্রতিষ্ঠান করলে মঙ্গল হবে ভেবে এবং তাঁকে ঐতিহাসিকভাবে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে খানজাহানপুর রেল স্টেশন, বাগেরহাট খানজাহান আলী কলেজ, খান জাহান আলী সড়ক, বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে খানজাহান আলী হল, খানজাহান আলী সেতু, খানজাহান আলী মসজিদ, খানজাহান আলী স্কুল-মাদ্রাসা। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর নামে এ রকম অনেক অনেক প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের উদ্যোগে খুলনা-মোংলা রোডে রামপালের ফয়লায় খানজাহান আলী বিমান বন্দর নামে একটি বিমান বন্দরের কাজ চলমান। এ মাটির বুকে কান রাখলেই শোনা যাবে বানরের কিচিরমিচির, হরিণের মৃদুমন্দ বিচরণ আর বাঘের গর্জনের সাথে সাথে  খানজাহানের পূণ্যতীর্থ প্রাণের প্রতিধ্বনি। 
(সূত্র: বাংলাপিডিয়া, যশোর-খুলনার ইতিহাস-সতীশ মিত্র, হজরত খান জাহান আলী- এ.এফ.এম. আব্দুল জলিল, বিবর্তিত বাগেরহাট- মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক, খুলনা বিভাগের ইতিহাস- মোঃ ইউনুছুর রহমান ও এস.এম রইজ উদ্দিন আহম্মদ, হযরত খান জাহান আলীঃ জীবন ও কর্ম- মোঃ মাসুম আলী, পীর হজরত খানজাহান আলী’র জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনা- আলহাজ¦ মাওলানা এ.এম. ইউনুছ আলী, খানে আজম হজরত খান জাহান আলী (রঃ)- সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন, ফকিরহাটের ইতিহাস- ম.ব. আলাউদ্দিন ইত্যাদি)
(লেখক ও গবেষক)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪৩



ভারত ভ্রমণে নয় দিন

ভারত ভ্রমণে নয় দিন

০৮ মে, ২০১৯ ০০:৫৯

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:১৬



ব্রেকিং নিউজ