খুলনা | শনিবার | ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

অনিশ্চয়তায় ভারত সফর ও জাতীয় লীগ

১১ দফা দাবিতে ক্রিকেটারদের  ধর্মঘট : সব খেলা বয়কট

ক্রীড়া প্রতিবেদক | প্রকাশিত ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:১১:০০

নানা ইস্যুতে চাপা ক্ষোভ ছিল দীর্ঘদিন ধরে। সেটারই বিস্ফোরণ ঘটলো এবার। ঘরোয়া ক্রিকেটে পারিশ্রমিক বাড়ানো, ক্রিকেটারদের প্রতি বোর্ডের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো সহ মোট ১১ দফা দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছেন দেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা। মিরপুর একাডেমি মাঠে গতকাল সোমবার দুপুরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই ঘোষণা দেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমসহ আরও অনেক ক্রিকেটার। ঘোষণার সময় উপস্থিত ছিলেন ৬০-এর বেশি ক্রিকেটার। তাদের প্রতিনিধি হয়ে নিজেদের দাবি-দাওয়ার কথা জানিয়েছেন ১০ জন। সব দাবি-দাওয়া জানানো শেষে ধর্মঘটের ঘোষণা দেন টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব, "আমরা জানি যে সব ক্রিকেটার আমাদের সঙ্গে আছেন। যতদিন পর্যন্ত আমাদের এই দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমরা ক্রিকেটের কোনো কার্যক্রমে জড়িত থাকতে চাচ্ছি না। জাতীয় দল, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারসহ সবাই এই ধর্মঘটের অন্তর্ভুক্ত এবং সেটা আজ থেকেই। জাতীয় লিগ থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট বলেন, জাতীয় দলের প্রস্তুতি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বলেন সবগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত।” সাকিবের এই ঘোষণার সময় তুমুল করতালি দিয়ে স্বাগত জানান উপস্থিত ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটারদের এই ঘোষণার পর আগামী ২৪ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া জাতীয় ক্রিকেট লীগের তৃতীয় রাউন্ড এবং ২৫ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া জাতীয় দলের ক্যাম্প কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
ক্রিকেটারদের ১১ দফা দাবি : সবমিলিয়ে ১১টি দাবি উত্থাপন করেছেন ক্রিকেটাররা। বিসিবিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন-এসব দাবি পূরণের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত জাতীয় দল এবং প্রথম শ্রেণীর সব ক্রিকেটাররা কোন ধরনের ক্রিকেটে অংশ নেবেন না। বিসিবি কার্যালয়ে ক্রিকেটাররা সবাই সারিবদ্ধভাবে একে একে এই ১১ দফা দাবি উত্থাপন করেন। 
১. সবার আগে ক্রিকেটারদের এক নম্বর দাবিটি উত্থাপন করেন নাঈম ইসলাম। তিনি জানান, ‘আমরা খেলোয়াড়রা ঠিক করবো যে আমাদের ক্রিকেট এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) এর সভাপতি কে হবে, সাধারণ সম্পাদক কে হবে। ক্রিকেটাররা নির্বাচনের মাধ্যমেই এটা ঠিক করবে।’
২. দাবি নিয়ে হাজির হওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বলেন-‘সবাই আমরা জানি যে ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগের পরিস্থিতি কি? প্রিমিয়ার লীগ যেভাবে হচ্ছে তাতে কমবেশি প্রায় সব ক্রিকেটাররাই অসন্তোষ প্রকাশ করছে। এই লীগে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিকের একটা মানদণ্ড বেঁধে দেয়া হচ্ছে। ক্রিকেটারদের অনেক অধিকার সীমিত করে দেয়া হচ্ছে। প্রিমিয়ার লীগে কোন ক্রিকেটার কোন দলে খেলবে। তাদের পারিশ্রমিক কেমন হবে-এসব বিষয় ক্রিকেটারদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।’
৩. মুশফিকুর রহিম তার বক্তব্যে জানান, ‘আমরা জানি যে এই বছরের বিপিএল আমাদের অন্য নিয়মে হচ্ছে। সেটা অবশ্যই আমরা সম্মানের সঙ্গেই মেনে নিয়েছি। তবে আমাদের দাবি হলে এই বছর বাদে সামনের বছর থেকে যেন যে পুরনো নিয়মে বিপিএল হচ্ছিল সেই নিয়মে যেন ফিরে যাওয়া যায়। স্থানীয় খেলোয়াড়দের স্থিতি মূল্য যেন বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে থাকে সেই দাবি করছি আমরা। আমরা দেখে আমি বিপিএলে বিদেশি খেলোয়াড়দের যেভাবে উদারহস্তভাবে পারিশ্রামিক দেয়া হয়, স্থানীয় খেলোয়াড়দের তেমনভাবে পারিশ্রমিক দেয়া হয় না! এই অবস্থা দূর করতে হবে। 
৪ ও ৫. অধিনায়ক সাকিব আল হাসান দাবি জানান,-‘আমাদের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি একলাখ টাকা হওয়া উচিত। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারদের বেতনও অনেক কম। সেটা অন্ততপক্ষে ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। খেলোয়াড়দের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। জিম-ইনডোর মাঠ সবকিছুর সুবিধা বাড়াতে হবে। পুরো বছরব্যাপী কোচ-ফিজিও ট্রেনারকে নিয়োগ দিতে হবে। এই কোচ ফিজিও এবং ট্রেনাররাই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারদেরকে একটা প্রক্রিয়া বা কাঠামোর মধ্যেই নিয়ে আসবেন। যেখান থেকে তারা পরিকল্পনাগুলো দিয়ে দেবেন এবং প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটাররা সেভাবেই যেন কাজ করতে পারে। এসব সুযোগ সুবিধা প্রতিটা বিভাগেই নিশ্চিত করতে হবে। মানসম্মত ক্রিকেট বলে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট পরিচালনা করতে হবে। প্রতিদিনের খরচ মাত্র পনেরশ টাকা দেয়া হচ্ছে, এটা অপ্রতুল। বিসিবি ক্রিকেটারদের কাছ থেকে যে ফিটনেস দাবি করছে, সেটা পুরো করতে হলে দিনে মাত্র পনেরশ’ টাকা খাওয়া-খরচ সম্ভব না।
স্বাভাবিকভাবে ক্রিকেটারদের ভাল খাবার খেতে হবে। ভাল একটা হোটেলেও থাকতে হবে ভ্রমণের যে খরচ দেয়া হচ্ছে সেটাও অবশ্যই বাড়াতে হবে। এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে ভ্রমণের জন্য বিমান টিকিট নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল থেকে মাঠে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটাররা যে বাসে যান-তা খুবই নিম্নমানের। খেলোয়াড়দের জন্য এসি বাসের ব্যবস্থা করতে হবে।’
৬. সিনিয়র ক্রিকেটার স্পিনার এনামুল হক বলেন-‘জাতীয় দলে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এই সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ জন করতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের বেতনও বাড়াতে হবে। চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের বেতন পেছনের তিন বছর ধরে বাড়ানো হচ্ছে না।
৭. তামিম ইকবাল দাবি তোলেন-‘ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা বাড়াতে হবে। একজন গ্রাউন্ডসম্যান বিসিবিতে চাকুরি করে কি ধরনের বেতন পাচ্ছেন-সেটা আমাদের সবার জানা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেও তারা যা পাচ্ছে সেটা যৎসামান্য। বাংলাদেশি কোচদের আমরাই তো প্রমোট করতে চাই না। বাংলাদেশি কোচদেরও যথাযথ সম্মান দিতে হবে। দেশের ফিজিও-ট্রেনাররা এমন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই বৈষম্য দূর করতে হবে। আম্পায়ারদের বেতনও বৃদ্ধি করতে হবে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবাই যেন তাদের জীবন জীবিকা ঠিক মতো নিশ্চিত করতে পারে বিসিবিকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
৮. এনামুল হক বিজয় জানান-‘প্রিমিয়ার লীগে আমরা মাত্র একটি ওয়ানডে লিগ খেলি। ঘরোয়া ক্রিকেটে ওয়ানডে লিগের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। বিপিএলের আগেভাগে আরেকটি টি-টোয়েন্টি লিগ হওয়া জরুরি।’
৯. নূরুল হাসান সোহান দাবি তোলেন-‘ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য একটা স্থায়ী ক্যালেন্ডার ঠিক করতে হবে। তাহলে ক্রিকেটারদের প্রস্তুতিটা ভাল হবে।’
১০. জুনায়েদ সিদ্দিকী বলেন-‘বিপিএল এবং প্রিমিয়ার ক্রিকেটে ক্লাবগুলো যেন ক্রিকেটারদের বকেয়া টাকা ঠিক মতো পরিশোধ করে সেই উদ্যোগ নিতে হবে।’
১১. সর্বশেষ বক্তা হিসেবে ফরহাদ রেজা বলেন-‘দু’টোর বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ক্রিকেটাররা খেলতে পারবেন না বলে বিসিবি একটা নিয়ম চালু করেছে। তবে জাতীয় দলের দায়িত্ব যখন থাকে না তখন ক্রিকেটারদের ফ্রি করে দিলে আরো বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ক্রিকেটাররা খেলতে পারবে এবং তাদের অভিজ্ঞতাও বাড়বে।’
সবশেষে আবার বক্তা হিসেবে আসেন সাকিব আল হাসান।  বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার মাধম্যেই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা সাকিবের। তবে দাবি মানতে হবেই, সেটিও জানিয়ে রাখলেন। “আলোচনা সাপেক্ষে অবশ্যই সবকিছুর সমাধান হবে। দাবিগুলো যখন মানা হবে তখন আমরা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যাব।”


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ