কৃষি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি!


খুলনা অঞ্চলে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতে সবুজের সমারোহ সংকুচিত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ, অনুমোদনহীন আবাসন ব্যবসা, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও চাষাবাদে অনিহায় কৃষি জমি কমে যাওয়ার মূলকারণ বলছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হারে আবাদী জমি কমছে খুলনা ও বাগেরহাটে। পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে কৃষি জমির পরিমাণ আরও কমবে। এভাবে কৃষি জমি অকৃষিখাতে যেতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে তেঁতুলতলায় ৫৯৪ একর এবং তেরখাদা উপজেলার কোলাপাটগাতি মৌজায় ৫১৭ একর জমি নিয়ে দু’টি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে, তেরখাদার কোলাপাটগাতি মৌজায় প্রস্তাবিত ৫১৭ একর জমির মধ্যে সরকারি জমি রয়েছে ২৫৬ একর এবং বটিয়াঘাটার তেঁতুলতলা মৌজায় ৫৯৪ একর জমিতে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোনে সরকারি খাসজমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক। এছাড়া কেডিএ’র অধিকাংশ প্রকল্প কৃষি জমিতে। নগরীর বাইপাস সড়কের পাশে ৩০ একর কৃষি জমির উপরে নির্মাণ হচ্ছে জেলা কারাগার। কৃষি ইনস্টিটিউটের ৫০ একর জমিসহ ৬২ একর জায়গার উপর গড়ে উঠছে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এদিকে খুলনাতে অন্তত ২৬টি অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পে ভূমি ব্যবসায়ীরা রাতারাতি কৃষি জমি ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রি করছে। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানায় প্রতিনিয়তই কৃষি জমি ভরাট করা হচ্ছে।
কোন অবস্থাতেই কৃষিজমি ব্যবহার করে কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খুলনা জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, ‘কৃষি জমিতে কোন কারণে যদি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন পড়ে সেক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদের অনুমতি সাপেক্ষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জমির খাত পরিবর্তন করতে হবে। আগামী চার মাসের মধ্যে জেলার সকল উপজেলার ভূমি ব্যবহারের মাস্টারপ্লান প্রস্তুতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।’
কৃষি জমির অপব্যবহারে আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় শাস্তির বিধান উল্লেখ সম্প্রতি প্রেসক্লাবে এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, “খুলনাতে ২৬টি আবাসন প্রকল্পের প্লট ব্যবসায়ী অনুমোদনবিহীন ভূমি ব্যবসা করছে। এর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। অভিযান চালানো হবে। এই ভূমি ব্যবসায়ীরা রাতারাতি কৃষি জমি ভরাট করছে। যেটা সম্পূর্ণ বেআইনী।”
এদিকে, দেশের দ্বিতীয় সমুন্দ্র বন্দর মংলা ও বন্দর সংলগ্ন মংলা ইপিজেড’র পাশেই ২০৫ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। রামপাল উপজেলার ফয়লায় খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণে প্রথমে ৯৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর ২০১৬ সালে উপজেলার গোবিন্দপুর, হোগলডাঙ্গা, ধলদাহ, ঝালবাড়ি, চাচুরি, বড় নবাবপুর, বামনডহর, কদমদি ও দেবীপুর গ্রামের ৫৩৬ একর জমির মধ্যে ৬৭ দশমিক ৪৫ একর খাস জমি এবং পরের বছর ২০১৭ সালে নতুন করে ১৫০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর করতে নতুন করে ৭০০ একর জমি অধিগ্রহন করতে হবে। স্থানীয়দের দাবি, ‘আগে যে এলাকায় জমি অধিগ্রহণ করে মাটি ভরাট করা হয়েছে, তার উত্তর দিক বাগেরহাট সদর উপজেলার কিছু অংশ জমি অধিগ্রহণ করলে এলাকাবাসীর ক্ষতি কম হবে। বেঁচে যাবে অনেক কৃষক।’ আবার, মোংলা বন্দর থেকে রেলপথ ৬৪ কিলোমিটার দূরে খুলনার ফুলতলায় গিয়ে যুক্ত হবে। এ প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা হয়েছে অন্তত ৭৫০ একর জমি। এর মধ্যে খুলনার ৪০১ দশমিক ২৭৯০২ একর, বাগেরহাটের ২৭৫ দশমিক ০২৫৭ একর ও মংলা কর্তৃপক্ষের ৭৩ দশমিক ৩৫৭ একর জমি রয়েছে। এরমধ্যে সরকারের খাস জমি ২২ দশমিক ৫০ একর। এভাবে প্রতি বছরেই খুলনা অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি অকৃষিখাতে চলে যাচ্ছে। পদ্মাসেতু নির্মাণের পর কৃষি জমির সুরক্ষা আরও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরীপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে প্রতি বছর দুই হাজার ৮৩১ হেক্টর জমি কমছে। যার হার দশমিক ২১ শতাংশ। আর ঢাকায় এ হার দশমিক ১৯ শতাংশ। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে কৃষি জমি কমার হার ছিল দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। এসব জমিতে বসতবাড়ি, উন্নয়নমূলক অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক ভবন ও মিল কলকারখানা গড়ে ওঠায় কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন।
খুলনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ জালাল উদ্দিন বলেন, কৃষি জমি প্রতি বছর প্রায় দশমিক চার শতাংশ হারে কমছে। অতিসম্প্রতি এ হার আরও বেশি হতে পারে। কৃষি জমি অকৃষিখাতে চলে যাবার মূল কারণ-বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প কৃষি জমিতেই গ্রহণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট হচ্ছে, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, শহর ও শহরতলীতে হচ্ছে কল-কারখানা।
খুলনা বিভাগীয় পরিসংখ্যান অফিসের যুগ্ম-পরিচালক মোঃ গোলাম মোস্তফা বলেন, আগামী ২৭ অক্টোবর মন্ত্রণালয় থেকে এ বছরের কৃষি জরীপের ফলাফল কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশ করা হবে।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক পংকজ কান্তি মজুমদার বললেন, ‘কৃষি জমি অকৃষিখাতে চলে যাওয়াটাই আমরা মনে করি একটা সতর্কবার্তা। একই জমিতে কয়েকবার ফসল হচ্ছে, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার বেড়েছে। আবার জনসংখ্যাও বাড়ছে, কৃষি জমিও কমছে। খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হলে কৃষি জমি ঠিক রাখা দরকার। সেই হিসেবে এ বিষয়ে সরকারের একটা নীতিমালা থাকা উচিত। ঢাকাতে এসব বিষয়ে কাজ চলছে।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রমতে, খুলনায় গত ২০ বছরে কৃষি জমি কমেছে ১০ হাজার হেক্টর। বাগেরহাটের অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। তবে খুলনা বিভাগের অন্যান্য জেলায় কৃষি জমি অকৃষিখাতে যাওয়ার মাত্রা সহনশীল, বলছে কৃষি বিভাগ।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ খুলনার সাধারণ সম্পাদক কাজী জাবেদ খালিদ জয় জানান, দ্রুত শিল্পায়ন ও শহরায়নের বিস্তারে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে সবুজ শ্যামল জমি ছিল এখন সেখানে কোন শিল্প-কলকারখানার সাইনবোর্ড টানানো। কয়েকদিন পরেই হয়তো কোন শিল্প গড়ে উঠবে। গ্রামের কৃষি জমি দ্রুত অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। কৃষি জমি কমতে থাকলে এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে। তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সাথে যুক্ত। সর্বশেষ জরীপ অনুযায়ী খুলনা বিভাগের মোট জনগোষ্ঠীর ৩২ দশমিক ১ শতাংশ দরিদ্র্য। এই মানুষগুলির জীবন-জীবিকা চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষি বিপণন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থেকে। ভূমির উপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষ বিশেষত কৃষক-ভূমিহীন কৃষক, জেলে, মজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কৃষি জমি কমে যাওয়ায় সরাসরি ভুক্তভোগী। তাদের উদ্বৃত্ত্ব ফসল জাতীয় খাদ্য চাহিদায় যোগ হতো। তারাই ভূমি হারালে খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত আসবে।
জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক এড. কুদরত-ই খুদা বলেন, “অবশ্যই আমরা উন্নয়ন চাই, তবে পরিকল্পিতভাবে; কৃষি জমি অকৃষিখাতে ব্যবহার করে নয়। একটু পরিকল্পনা করলেই কৃষি জমি নষ্ট না করে পতিত জমিটি প্রয়োজনে লাগাতে পারি। যেভাবে কৃষি জমি কমছে; নিকট ভবিষ্যতে মানুষের হাতে টাকা থাকবে কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা থাকবে না।”
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।