খুলনায় সন্ত্রাসীদের হাতেও বৈধ অস্ত্র!


২০০৯ সালে খুলনায় অনুমোদিত বৈধ অস্ত্র ছিল এক হাজার ৮৪১টি। চলছে ২০১৯; এ দশ বছর পর গতকাল সোমবার পর্যন্ত এ তালিকা বর্ধিত হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫৬১ তে। অস্ত্রের লাইসেন্স তালিকায় দেখা গেছে-সরকারি কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আধিক্য। এছাড়াও বৈধ অস্ত্র রয়েছে হত্যা ও ছিনতাই মামলার আসামিসহ তালিকাভুক্ত দাগী সন্ত্রাসীদের হাতে! বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের তথ্য সমন্বিত করতে সরকারের শুদ্ধি অভিযানের ধারাবাহিকতায় খুলনার বৈধ অস্ত্রের তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে। এদিকে, আগামী ২০ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রিন্টকৃত ই-লাইসেন্স সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করবে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের সূত্রমতে, গেল মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকের কাছে খুলনায় বৈধ অস্ত্রের তালিকাসহ যাবতীয় তথ্য চেয়ে পত্র দিয়েছিল। চলতি সপ্তাহে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্য পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে সকল অবৈধ অস্ত্র এবং বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছে জেলা প্রশাসন।
সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত খুলনায় এক হাজার ৮৪১টি বৈধ অস্ত্র ছিল, ২০১০ সালে আরও ৮৭ জনকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ায় বছর না ঘুরতেই দুই হাজারের ঘরে যায় বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত খুলনায় অস্ত্রের লাইসেন্স নেন আরও ৪০২জন। আর ২০১৫ থেকে চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ২৩১ জনকে লাইসেন্স দেয়ায় সর্বমোট বৈধ  অস্ত্রের সংখ্যা পৌঁছেছে দুই হাজার ৫৬১ তে। এ তালিকায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও জেলা পুলিশ প্রণীত তালিকাভুক্ত দাগী সন্ত্রাসীদের নামও দেখা গেছে। হত্যা, অবৈধ অস্ত্র ও ছিনতাইসহ ডজন ডজন মামলার আসামিদের নামে রয়েছে বৈধ অস্ত্রের অনুমোদন! তাদের হাতে অস্ত্র থাকায় আতঙ্কিত ওইসব এলাকার মানুষ। রাজনৈতিক বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি। ক্ষমতাসীন দলের উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। সংসদ সদস্য ও তাদের আত্মীয়, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর এবং ইউপি চেয়ারম্যানরা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। এসব অস্ত্র কী কাজে ব্যবহার হয় তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে জনমনে। অনুমোদিত অস্ত্র নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় কিছু অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ কাজে; এমন অভিযোগ রয়েছে। আর বিতর্কিত ব্যক্তিদের কাছে অস্ত্র থাকায় সাধারণ মানুষ রয়েছেন আতঙ্কে। সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযানে সারাদেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহাররোধে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে জন্যই সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের কাছে তালিকা চেয়ে পাঠায় মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। তালিকা আপডেট করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে খুলনার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের তালিকা।
জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক এড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, আগে জান-মাল রক্ষার্থে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হতো, এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেয়ায় অনেক সময় বৈধ অস্ত্র দুর্বৃত্তদের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। প্রশাসনের উদ্যোগে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অস্ত্রগুলো অবৈধ কাজেও ব্যবহার হতে পারে।
গত ২৫ জুলাই আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স সহজ ও নিরাপদ করতে খুলনায় চালু হয় ই-লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম। আগ্নেয়াস্ত্রের ই-লাইসেন্স টেকসই ও সহজে বহনযোগ্য। এছাড়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিশ থাকার ফলে এটি আরও নিরাপদ। এটি বাস্তবায়িত হলে আগ্নেয়াস্ত্রের নকল লাইসেন্স তৈরি প্রায় অসম্ভব হবে। আগ্নেয়াস্ত্রের ই-লাইসেন্স পদ্ধতি চালু সময়োপযোগী পদক্ষেপ তবে সময় সাপেক্ষ ব্যাপার বললেন ই-লাইসেন্স কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ইউসুপ আলী।
তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈধ অস্ত্র সংক্রান্ত আপডেট তথ্য পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় তিনশ’ জন ই-লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছেন। প্রথমে যারা আবেদন করেছিলেন আগামী ২০ অক্টোবর থেকে তাদের ই-লাইসেন্স দেয়া শুরু করতে পারবো। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ই-লাইসেন্স আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে প্রিন্ট করা হবে। ইতোমধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সকলকে ই-লাইসেন্স করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ শতাংশ অস্ত্র ই-লাইসেন্সের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।” খুলনাতেই প্রথম ই-লাইসেন্স কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আর জানান, ই-লাইসেন্স বাস্তবায়ন হলে নকল কাগজপত্র রোধ হবে।
জেলা প্রশাসনের জুডিশিয়াল মুন্সিখানা (জেএম) শাখা থেকে অস্ত্রের লাইসেন্সের আবেদন-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ শাখার সূত্রমতে, লাইসেন্সের জন্য প্রথমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর আবেদন করতে হয়। এরপর অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শুনানী হয়। শুনানী ও যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একনলা বন্দুক ও শটগানের লাইসেন্স দিতে পারেন। অন্যান্য অস্ত্রের লাইসেন্স স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া হয়।
সূত্রটি বলছেন, লাইসেন্স মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা আছে। প্রতি বছর ডিসেম্বরে নবায়নের সময় অস্ত্র নিয়ে আসতে হয়। তখন পুলিশ রিপোর্ট দেয়, সবকিছু ঠিক থাকলে নবায়নের পর তাদের আবার অস্ত্র ফেরত দেয়া হয়। পুলিশ রিপোর্ট খারাপ থাকলে লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না।

 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।