খুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হলগুলো ছাত্রলীগের দখলে : রয়েছে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ


খুলনাতেও একাধিক হল বা ছাত্রাবাসে রাতের আঁধারে সাধারণ ছাত্রদের পিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দের অভিযোগ রয়েছে। শুধু হল নয়, অনেক ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের আধিপত্য এতটাই বেশি যে, অন্য কোন সংগঠনের ব্যানার বা ফেস্টুন চোখে মেলে না। এমনকি রাতের বেলায় হলগুলো থেকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অন্যান্য সংগঠনের ছাত্রদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মাদক সেবন, খাবারের মান ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় মারপিটের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এসব ছাত্রাবাসগুলো রয়েছে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা ছাত্রনেতাদের দখলে। নিয়মিত মিটিং-মিছিলে অংশ গ্রহণকারীদের স্থান হয় হলে, উপেক্ষিত মেধাবী ও দরিদ্র্যরা। 
সূত্রমতে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ফজলুল হক হল (প্রথম হল), খান জাহান আলী হল, ড. এম এ রশিদ হল, লালন শাহ হল, রোকেয়া হল (ছাত্রী), অমর একুশে হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সাতটি হলে প্রায় আড়াই হাজার সিট রয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব হলের সিট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতারা। মাদক সেবন, খাবারের মান ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা গণধোলাই দিয়ে পুলিশের দেবার অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাধিক সূত্র জানায়, ২০০৭ সাল থেকে ২০১৪ সালের অনন্ত ২৭ জন শিক্ষার্থীকে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ক্ষমতাসীনদের হাতে পিটুনির শিকার হয়েছেন। গত ২৪ মার্চ রাতে কুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও বিভিন্ন হল থেকে তিন ছাত্রকে আটক করে বেধড়ক মারপিটের পর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। ভুক্তভোগী মাহাদী হাসান, রেজাউল ও শাহীন আইইএম বিভাগের ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরদিন উদ্ধারের পর পুলিশ তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করে। কুয়েট ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ওই তিনজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। ওই তিন শিক্ষার্থীর দাবি, তারা কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়; ক্যাম্পাসে মাদক, জুনিয়রদের র‌্যাগিং ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করাতেই ওই ছাত্রনেতাদের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। সেই রাতের বেধড়ক মারপিটের ভয়ে শিউরে উঠে অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এ তিন মেধাবী শিক্ষার্থী। আবার, গত বছরের ২৯ জানুয়ারি কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হল থেকে মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন ওরফে আল-আমিন, মাহাদী হাসান, মোঃ পারভেজ ও নাজমুল কবীরকে আটক করে পুলিশ। নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে দু’টি মামলা হয় খানজাহান আলী থানায়। এছাড়া ২০১৭ সালের পহেলা মে রাতে কুয়েটের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হলে শিবির সন্দেহে ১৪ শিক্ষার্থীকে আটক করে বেধড়ক মারপিট করে ছাত্রলীগ। আটককৃতরা হলেন আবদুল্লাহ নাইম, রুম্মান বিন জাহিদ, শহিদুল ইসলাম, রেজাউল্লাহ, মনিউল আলিফিন, আব্দুল আলিম, আব্দুল্লাহ আরমান, নাসির উদ্দিন, মোজাহের উদ্দিন, আবদুল্লাহ আরাফাত, লুৎফর রহমান, মাহিদি হাসান, শাহিনুজ্জামান ও মইন ইসলাম। ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরদিন ২ মে সকালে কুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাফায়েত হোসেন নয়ন তাদের পুলিশে সোপর্দ করে। নাশকতার পরিকল্পনা করছিল এমন অভিযোগে করা একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন খানজাহান আলী থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফুল আলম। শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরামর্শে পরবর্তীতে ঝামেলায় না জড়াতে অনেক ঘটনায় চেপে যান ভুক্তভোগীরা। 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের এক নেতা এ প্রতিবেদককে জানান, ২০১৪ সালের পর থেকেই তারা ক্যাম্পাস ছাড়া। কোন মিছিল বা মিটিংও করতে দেওয়া হয় না। যদিও  কুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন হাসান বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া কোন সংগঠনেরই দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। ৭টি হলের নেতৃত্বে সিনিয়র ছাত্ররা রয়েছেন। ছাত্রলীগের কোন হল কমিটি নেই। তবে খুব দ্রুত কুয়েট ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে। 
কুয়েট ভিসি প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন সময়ের খবরকে বলেন, ‘পূজার ছুটি শেষে রবিবার ইউনিভার্সিটি খুলবে। অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে হলগুলোর পরিবেশ এখন অনেক ভালো।’ এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক প্রফেসর ড. শিবেন্দ্র শেখর শিকদারের মোবাইলে গতকাল সন্ধ্যায় একাধিকবার কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্যাম্পাসে এ ধরনের ঘটনার খবর জানা যায়নি। ক্যাম্পাসটি অরাজনৈতিক হিসেবে খ্যাত।
সরকারি বিএল কলেজের ৫টি হলেই ছাত্রলীগের আধিপত্য। সুবোধ চন্দ্র হল, নজরুল হল, ড. জোহা হল, মহসিন হল এবং শহীদ তিতুমীর হল। এগুলোর মধ্যে মহসিন হল ছাড়া অন্য হলে গত বছরও ছাত্রদলের কর্মীরা ছিলেন। ২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্রদলের কর্মীদের মেরে হলগুলো থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েতুল্লাহ দিপুর। তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসগুলোত সন্ধ্যার পর মাদকের আড্ডা হয়। স্বাধীনভাবে কোন ছাত্র সংগঠনই রাজনীতি করতে পারে না। 
বিএল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রিয়াজ শাহেদ বলেন, ‘ছাত্রাবাসে সিট তো দূরের কথা কলেজে ছাত্রলীগ ব্যতীত অন্য কোন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের মিছিল-মিটিং এমনকি কথা বলার অধিকার নেই।’ 
এ বিষয়ে কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিশাত ফেরদৌস অনি বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা জোর করে হলে এসে মাদক সেবন করেন। এই বিষয়গুলো প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ছাত্রদলের বিষয়ে তিনি বলেন, গত নির্বাচনের পর থেকে ছাত্রদলের নেতারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এরপর আর ফিরে আসেনি। তবে ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রদের জন্য হলে সিট রয়েছে। 
খুলনা মেডিকেল কলেজে (খুমেক) ২০১২ সালে এক ছাত্রকে হলের ভিতর উইকেট দিয়ে প্রহার করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই ডাক্তার বিদেশে রয়েছে। খুমেক’র ছাত্রহলগুলো হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং শহিদ মুর্তজা (ইচিপের জন্য) হল। এসবগুলোই ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে। হলগুলো একটি আরেকটির খুব কাছাকাছি হওয়ায় কোন হল কমিটি করা হয়নি। 
এ বিষয়ে খুমেক ছাত্রলীগের সভাপতি ডাঃ আসানুর ইসলাম স্বীকার করে বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে অন্য কোন সংগঠনের কোন কার্যক্রম নেই। ছাত্রলীগ এবং ইচিপ (ইন্টার্নী চিকিৎসক পরিষদ) ক্যাম্পাসে আছে। সব হলগুলোতে আমাদের আদর্শের ছাত্ররা থাকেন। 
আবার, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য শিক্ষার একক উচ্চবিদ্যাপীঠ খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে ছাত্রদের জন্য ৯৮ আসনের মাত্র একটি ছাত্রাবাস রয়েছে। যারা নিয়মিত মিটিং-মিছিলে অংশ নেয় তাদেরকেই আসন দেয়া হয় এ ছাত্রাবাসটিতে। তাছাড়া, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের তিনটি আবাসিক ছাত্রীনিবাসে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটলেও মারপিটের ঘটনা ঘটেনি বলে একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, খালিশপুরের সরকারি মুহসিন কলেজ চত্বরে গত বছরের ১ নভেম্বর দুপুরে অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মোঃ আলমগীর হোসেনকে বেধড়ক মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। ছাত্রলীগ নেতা রওশন আনিজি অন্তু ও সাজ্জাদের দাবি, আলমগীর শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত।
জনউদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক ও সুজন’র জেলা সম্পাদক এড. কুদরত-ই-খুদা বলেন, “দেশে পরমতসহিষ্ণুতার চরম সংকট চলছে। পরমতসহিষ্ণুতা নেতার মধ্যে নেই, তা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে থাকবে কিভাবে? বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার মূলকারণ পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম; আমাদের সময় তো সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান ছিল। আর এখন? আর কোন পিতার কাঁধে আবরার ফাহাদের মতো সন্তানের মরদেহে যেন না উঠে, এ ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।”
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।