ইমেজ সংকটে ছাত্রলীগ-যুবলীগ


স্মরণকালের মধ্যে সব থেকে বড় ইমেজ সংকটে পড়েছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) চাঁদাবাজি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যার ঘটনায় আবারও দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছেন আ’লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শুদ্ধি অভিযানের শুরুতেই রাজধানীতে ক্যাসিনো এবং টেন্ডারবাজি ও সংগঠনের চেয়ারম্যানকে দেশত্যাগ না করার নির্দেশ দেওয়ায় বর্তমানে আলোচিত যুবলীগ। দু’টি সংগঠণের একত্রে এভাবে আলোচিত এবং সমালোচিত হওয়ার ঘটনা ইতোপূর্বে হয়নি। ফলে বর্তমানে মারাত্মক ইমেজ সংকটে পড়েছে সংগঠন দু’টি। 
আ’লীগের প্রাণ বলা হয় ছাত্রলীগকে, যেখানে নেতৃত্বের সূত্রপাত হয়। যারা পরবর্তীতে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মত অঙ্গ সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে আ’লীগের আসেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগের কমিটিতে থাকা কালীন অবস্থায় চাঁদাবাজি, হত্যার মত জঘণ্য কাজে তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। ফলে দেশব্যাপী সমালোচিত হচ্ছে এই সংগঠনটি। ছাত্রলীগের এমন কর্মকান্ডে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সাবেক ছাত্রনেতারাও। এমনকি ছাত্রলীগের কমিটি থেকে বহিস্কারের মাধ্যমে সমাধান না করে বরং এর প্রতিকার বা স্থায়ী সমাধানের দাবি সর্বজনের। অন্যদিকে দলের নাম ব্যবহার করে রাজধানীর অলিগলিতে ক্যাসিনো, জুয়া এবং টেন্ডারবাজির মত ঘটনার পিছনে যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের নাম পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশে প্রশাসন সম্প্রতি নগদ কোটি কোটি টাকা, মদ, বিয়ার, অস্ত্র, টর্চার মেশিন, পশুর চামড়াসহ একাধিক যুবলীগ নেতা আটক হয়েছে। অবশ্য যুবলীগ নেতাদেরকে আটক করার পরপরই দলীয় পদ থেকে বহিস্কারও করা হয়েছে। যেমনটি ইতোপূর্বে কোন অভিযোগের সত্যতা মিললেই ছাত্রলীগের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। এসব ঘটনায় পরপরই যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে দেশ ত্যাগ না করার নির্দেশ  ও তার ব্যংক হিসাব তলব করা হয়েছে। এমনকি ইমিগ্রেশনগুলোতে যুবলীগের চেয়ারম্যান এবং নেপালী নাগরিকদের আপাতত দেশ ত্যাগ না করতে দেওয়ার বিষয়ে লিখিতভাবে নির্দেশ জারি করা হয়েছে। 
ছাত্রলীগ আলোচিত হওয়ার কারণ : গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর নিকট অভিযোগ করেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ৪ থেকে ৬ শতাংশ চাঁদা দাবি করেন। 
এদিকে এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে আবাসিক হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আবরার বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শেরে বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। নির্মম এ হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া ১১ জনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ। সোমবার রাতে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টচার্য স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তথ্যের ভিত্তিতে উক্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হলো।’ এর আগে, সোমবার দিনের বেলা বাংলাদেশের ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বুয়েটের ঘটনার তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাতেই এই বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়।
এর আগে ২০১৮ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এহসান রফিককে একটি ক্যালকুলেটরকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের কর্মীরা চোখে আঘাত করেছিল। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনেই বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরনো ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন ঐ এলাকার একটি দর্জি দোকানের কর্মী বিশ্বজিৎ দাস। এ ঘটার থেকে রেহাই মেলে একাধিক ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর। একই বছরের ৮ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী জুবায়ের আহমেদ সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান। ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার ভাড়া বাসা থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল বলে আলোচনার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি এখনও তদন্তনাধীন। 
যুবলীগ আলোচিত হওয়ার কারণ : প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (বর্তমানে বহিস্কার) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট গ্রেফতারের পর গত ৬ অক্টোবর যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তিনি যাতে ভারতে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য সীমান্তে সর্তকতা জারি করা হয়েছে। এমনকি যুবলীগের চেয়ারম্যানের ব্যাংক হিসাবও তলব করা হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সকল ব্যাংকগুলোকে এক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ওমর ফারুক চৌধুরীর নামে থাকা সব ধরণের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, বিবরণীর তথ্য তিন কার্যদিবসের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে।  
এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফকিরাপুলে ইয়াং ম্যান্স ক্লাবে র‌্যাবের অভিযানে নগদ টাকা, মাদকসহ ১৪২জনকে আটক করা হয়। এ সময় ক্যাসিনো মালিক ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াও আটক হয়। এর দু’দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর যুবলীগের সমবায় সম্পাদক হিসেবে পরিচয়দানকারী এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি জি কে শামীমকে রাজধানীর নিকেতনের অফিস থেকে আটক করা হয়। এ সময় ৭ দেহরক্ষী, নগদ কোটি কোটি টাকা, এফডিআর চেক, মদ, অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তিনি প্রভাবশালী ঠিকাদার হওয়ায় রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকার সরকারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। গণপূর্ত ভবনের বেশির ভাগ ঠিকাদারি কাজ তার নিয়ন্ত্রণে। এমনকি র‌্যাব হেডকোয়াটারের অনেক বড় বড় কাজই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। তবে যুবলীগ ও নারায়ণগঞ্জ আ’লীগের পক্ষ থেকে জি কে শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করা হয়েছে। 
সর্বশেষ ৬ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগে সভাপতি (বর্তমানে বহিস্কৃত) ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আটক করে কাকরাইলের অফিসে অভিযান করা হয়। এ সময় তার অফিস থেকে টর্চার সেল, মাদক, অস্ত্র, বিদেশী মদ, ক্যাঙ্গারুর চামড়া উদ্ধার করা হয়। 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।