খুলনা | মঙ্গলবার | ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৬ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে উপাচার্য : ৮ দফা দাবি

ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল বুয়েট 

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ০৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:২০:০০

শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বুয়েটের ভিসিকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে এ দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। এর আগে ফাহাদ হত্যার ৩৬ ঘণ্টা পর বুয়েটে এসে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম।
এদিকে বুয়েটে সকল শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের পাশাপাশি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হত্যার বিচারের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে মামলার সুষ্ঠু বিচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চান বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। 
শিক্ষার্থীদের ৮ দফা দাবি : সহপাঠী হত্যার বিচারে ৮ দফা দাবি জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকরা, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার, হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের অধীনে স্বল্পতম সময়ে নিষ্পত্তি, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনকে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে, আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল নিশ্চিত করতে হবে, শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করতে হবে,  মামলা চলাকালীন সকল খরচ এবং আবরারের পরিবারের সকল ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে।
উপাচার্যকে ঘেরাও : শিক্ষার্থী আবরার হত্যার দুইদিন পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সামনে এলেন উপাচার্য অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তিনি ঘোষণা দেন, তোমরা অধৈর্য হয়ো না, আমি তোমাদের পাশেই আছি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় বুয়েটের প্রশাসনিক ভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন উপাচার্য। এ সময় উপাচার্য হ্যান্ডমাইকে বলেন, আমরা নীতিগতভাবে তোমাদের সবগুলো দাবি প্রায় মেনে নিচ্ছি। এখানে কোন অসুবিধা থাকলে সেটা দূর করতে হবে। দাবির সবকিছু আমার হাতে নেই।
কোন দাবি উপাচার্যের হাতে আছে শিক্ষার্থীরা তা জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, এটাও আলোচনা করতে হবে। আলোচনা না করলে হবে না। নীতি গতভাবে তোমাদের পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি আমি। আলোচনা করে কীভাবে কী করব সেটি আমরা ব্যবস্থা করব।
‘গতকাল থেকে আপনি কোথায় ছিলেন?’ শিক্ষার্থীরা জানতে চাইলে অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম বলেন, আমি এখানে ছিলাম। আমি যদি না করতাম তাহলে তোমাদের এগুলা কে করত ? তোমাদের নিয়ে সারাদিন কাজ করতে হয়েছে। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগটা করবে কে ? আমি সারাদিন মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে একটু আগেও কথা বলেছি। আমি বলেছি, শিক্ষার্থীদের দাবি পেয়েছি, সেই দাবি অনুযায়ী আমি কাজ করব।
উপাচার্য আরও বলেন, তোমরা অধৈর্য হয়ো না, প্লিজ অপেক্ষা কর। আমি তোমাদের জন্যই আছি। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত বুয়েট প্রশাসন। দাবি বাস্তবায়নের উপায় খোঁজা হচ্ছে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দাবি বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রয়োজন। 
এ সময় এক শিক্ষার্থী জানতে চান, ‘স্যার, আপনি কী কাজ করছেন?’ তখন তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই ব্যাপারটি নিয়ে কাজ করছি। আমি রাত একটা পর্যন্ত কাজ করেছি।’
তবে উপাচার্যের কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিকাল ৫টার মধ্যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে আসার আলটিমেটাম দেন।
ভিসি ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের বৈঠক : আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ক্যাম্পাসে এসেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটায় তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। শিক্ষার্থীদের নজর এড়াতে বুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের গেট দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। ভিসির একান্ত সচিব (পিএস)কামরুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
কামরুল হাসান জানান, ভিসি স্যার অফিসে আছেন। ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বিকেল সাড়ে চারটায় বৈঠক শুরু হয়েছে।
এরআগে শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে দুই নম্বর দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হবার পরও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়নি তা তাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে। একই সঙ্গে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অর্থাৎ ডিএসডব্লিউ স্যার কেন ঘটনাস্থল থেকে পলায়ন করেছেন তা উনাকে বিকেল ৫টার মধ্যে সকলের সামনে জবাবদিহি করতে হবে।
আলোচনা করতে পাঁচজনের নাম চেয়ে প্রস্তাব :  আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে পাঁচজনের নাম চেয়ে প্রস্তাব জানানো হয়। ভিসির পক্ষে এ প্রস্তাব দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনা করার জন্য উপাচার্য পাঁচজনের প্রতিনিধিদলের নাম চেয়েছেন। ভিসির পিএস মোবাইলে আমাকে বিষয়টি অবহিত করেছেন।
তার এই বক্তব্যের জবাবে সবাই প্রতিবাদ জানান। শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা কোনো প্রতিনিধিদল আলাদাভাবে আলোচনায় যাবো না। তবে সবার সামনে ওপেন ডিসকাশন হতে পারে। যেখানে সবাই আলোচনা করবেন।
প্রধান ফটকে তালা : শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বুয়েটের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এরপর তাঁরা উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা যখন উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিচ্ছিলেন তখন এক ছাত্রী সেখানে এসে বলেন, উপাচার্য ওই কার্যালয়ের ভেতরে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। শিক্ষার্থীদের সামনে না আসায় তখন উপাচার্যের কার্যালয়ের ফটকেও তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা সেখানে ‘হই হই রই রই ভিসি স্যার গেল কই’ বলে স্লোগান দেন। 
মোমবাতি মিছিল : শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মোমবাতি হাতে মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মিছিলটি বুয়েট শহীদ মিনার থেকে শুরু করে সবগুলো আবাসিক হল প্রদক্ষিণ করে আবার শহীদ মিনারের সামনে এসে শেষ হয়।
মিছিল থেকে আন্দোলনকারীরা জানান, আবরার হত্যার চার্জশিট গঠন করা না পর্যন্ত ক্যাম্পাসের সকল কার্যক্রম স্থগিত থাকবে এবং তাদের আন্দোলন চলবে।
উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ : শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম অনুসারে বিকেল ৫টার মধ্যে উপাচার্য উপস্থিত না হওয়ায় বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘিরে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে কার্যালয়ের গেটের ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকায় প্রবেশ করতে পারেননি তারা। পরে গেটের বাইরে থেকে আরেকটি তালা লাগিয়ে দিয়ে কার্যালয় সামনে অবস্থান নেন তারা। বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর বিকেল ৪টার পর থেকেই উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।
এর আগে আট দফা দাবি আদায় না পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বুয়েট শহীদ মিনারে অবস্থান করবে। দাবি মেনে নেওয়া না হলে বুধবার থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
প্রসঙ্গত, গত রবিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। নিহত ফাহাদ বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী ছিলেন।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









১০ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১০৪

১০ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১০৪

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:২৭





ব্রেকিং নিউজ