খুলনা | মঙ্গলবার | ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ব্যভিচার : কারণ ও তার শাস্তির বিধান

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০

ব্যভিচার ধর্মীয়, সামাজিক ও আদশিক সকল মাপকাঠিতেই এইটি জঘন্য অপরাধ। সকল ধর্ম ও সকল দেশেই এটি অন্যায় বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ইসলাম এমন অপরাধকে মারাত্মক ঘৃণা করে এবং কঠোর শাস্তির বিধান পেশ করছে। ব্যভিচার বা যিনা একটি মহা অপরাধ যা অনেক অপরাধের সমষ্টি। ব্যভিচার হল অবৈধ যৌন মিলন। আর শরিয়তের পরিভাষায়, “ব্যভিচার হল একজন পুরুষ ও একজন নারী বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী হওয়া ছাড়াই অবৈধভাবে যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার নাম।” পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং অসৎ পন্থা (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং- ৩২)।” অন্য স্থানে কুরআনে উল্লেখ আছে, “লজ্জাহীনতার যত পন্থা আছে উহার নিকটও যেও না। তা প্রকাশ্যেই হউক আর গোপনেই হউক (আনআম ঃ আয়াত- ১৫১)।” ব্যভিচার সম্পর্কে নবী করিম (সাঃ) বলেন, “একদা একদল সাহাবী রাসুলুল্লাহ্ কে ঘিরে বসেছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা আমার হাতে বায়আত গ্রহণ কর এ মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর সাথে কোন জিনিসকে অংশীদার করবে না। চুরি করবেনা, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের নিজেদের সন্তানদেরকে (অর্থাৎ কন্যা সন্তান) হত্যা করবে না। কারো প্রতি জেনে শুনে মিথ্যা অপবাদ দিবেনা এবং কোন ন্যয়সঙ্গত উত্তম কাজের ব্যাপারে আমার অবাধ্য হবে না। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে কেউ (এ সকল অঙ্গীকার) পূরণ করবে, তার পুরুস্কার রয়েছে আল্লাহর কাছে, আর যে ব্যক্তি এগুলোর কোন একটিতে লিপ্ত হবে, সে এর জন্য দুনিয়াতে শাস্তিভোগ করবে(বুখারী ও মুসলিম)।”
ব্যভিচারের কারণ : পূর্বে বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষের অবৈধ মিলনের নামই ব্যভিচার। এ ব্যভিচার চলে আসছে, জন্মান্তর থেকেই, রোধ কেউ করতে পারেনি। সমাজের কঠোর শাসনে, আইনের চাপে, ধর্মের প্রবল বাধায় এই ব্যভিচার বন্ধ হয়নি। প্রচলিত সমাজে এই ব্যভিচারের মূল যে কারণ তা নিম্নœ আলোচনা করা হল :-
(১) উপযুক্ত বয়সে বিয়ে না হওয়া : পরিণত বয়সে বিবাহ না হলে ব্যভিচারের আশংখ্যা বেশী থাকে। মনের বাঁধ যখন ভেঙে যায় যৌবন যখন শরীরের অনু-পরমানুতে দংশন শুরু করে, তখন মান ইজ্জতের ভয় থাকেনা। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জাত-বিজাতের প্রশ্ন থাকেনা। যার কারণে যুবক যুবতীদের মধ্যে এ ব্যভিচার চলে।
(২) অবাধ চলাফেরা ও মেলামেশা : আজকাল শোনে কে কার কথা, এক শ্রেণীর যুবক-যুবতী ইচ্ছামত নিজের শালিনতা রক্ষা না করে হাটে বাজারে, সপিংমলে, রাস্তাঘাটে অবাধ চলাফেরা করে। বিশেষ করে হোটেলে, পার্কে এই কাজটি বেশী ঘটে। যুবতীরা সাজগোজ করে চাকচিক্য প্রদর্শন করে নিজের প্রতি অন্যের দৃষ্টির আকর্ষণ করে। অথচ হাদিসে উল্লেখ আছে, একদা রাসুল (সাঃ) বিবি ফাতেমা কে জিজ্ঞাসা করলেন, “স্ত্রী জাতির পক্ষে কোন কার্য সর্বাপেক্ষা উত্তম?” বিবি ফাতিমা তদুত্তরে বললেন, “মেয়েদের পক্ষে ইহাই উত্তম যে কোন পর পুরুষ তাহাদিগকে এবং তাহারা কোন পর পুরুষকে দেখতে না পায়।” উত্তর শুনে, নবী করিম (সাঃ) বললেন, “তুমি আমার কলিজার টুকরা।” সনাতন ধর্মের দেবতা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহৎসদেব বলেছেন, ‘কালির ঘরে যত সাবধানে থাক না কেন গায়ে দাগ লাগবেই লাগবে। যুবতীর কাছে অতি সাবধান হয়ে থাকলেও কিছু না কিছু কামভাব জাগবেই জাগবে (শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহৎসদেব উপদেশ- পৃষ্ঠা- ৭০)।’
(৩) নিয়ন্ত্রণহীন সহশিক্ষা : সহশিক্ষা ব্যবস্থা মানবজাতিকে অকল্যাণ, অবক্ষয় ও অশান্তি দান করছে। এ ব্যবস্থায় ছেলে মেয়েরা অবাধ মেলা মেশার সুযোগ পায়। ফলে তারা উশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ধর্ম, আদর্শ ও নৈতিকতাহীন শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের চারিত্রিক অবনতি ঘটায়। যার জন্যে দাম্পত্য জীবনে চরম অশান্তি, অসামাজিক কার্যক্রম যৌতুক প্রথা, তালাক, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, নারী হত্যা, মাদকের অবাধ ব্যবহার বেড়ে চলছে। 
(৪) ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব : ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাবের কারণে সমাজে ব্যভিচার দিন দিন বেড়ে চলছে, স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় থেকে নৈতিক শিক্ষা তুলে দেয়া হচ্ছে, অথচ, বাংলা, ইংরেজী তথ্য প্রযুক্তির ন্যায় ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা খুবই জরুরী। হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালন এ্যাঃ এলিনা খান বলেন, “যৌন বা ব্যভিচার হয়রানি বেড়ে যাওয়ার জন্য নৈতিকতার অবক্ষয় এবং আইন প্রণয়নকারী সংস্থার অবহেলা দায়ী।”
(৫) ব্যভিচার প্রতিরোধে ইসলামী মূল্যবোধ : কুপ্রবৃত্তিই মানুষের সকল অন্যায়-অবিচারের উৎস। ব্যভিচার যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ন্যয় অনাচার গুলোর উৎপত্তি ও এ কুপ্রবৃত্তি। যার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা রিপু দমনের জন্য দীর্ঘ এক মাস মাহে রমযানে সিয়াম সাধনার বিধান নাজিল করেছেন। নারীকে মার্জিত পোশাক পরে চলাফেরা করতে বলা হয়েছে এবং পুরুষদের কে দৃষ্টি অবনত রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ঘরের বাহিরে বের হলে, হিজাব পরিধানের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। পর্ণোগ্রাফি অবাধ মোবাইল ব্যবহার সর্বজন স্বীকৃত অশ্লীলতা ইসলাম মানব মনকে পবিত্র রাখার জন্য সকল প্রকার অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আপনি বলুন অবশ্যই আমার পালনকর্তা প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপাচার ও অসংগত বিদ্রোহ হারাম করেছেন (সূরা আরাফ ঃ আয়াত- ৩৩)।” তাই ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার নারীর শরীর প্রদর্শন সম্বলিত বিজ্ঞাপন, বিশ^-সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে ব্যভিচার, নৃত্য, যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য, অমার্জিত পোশাক পরিহিত চিত্র বা ছায়াছবি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পর পুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বাক্যালাপ করনা, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে যে, প্রলুদ্ধ হয় (সূরা আহযাব- ৩২)।”
পরিশেষে বলতে পারি, নৈতিকতার চর্চা, পরকালের প্রতি বিশ^াস ধর্মীয় অনুসাশন অর্থাৎ নারী ও পুরুষের পর্দা ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যভিচার কে অনেক অংশে রোধ করতে পারে।
লেখক: মুফাসিরে কুরআন ও প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ। শরণখোলা, বাগেরহাট।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা ২৩ অক্টোবর

পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা ২৩ অক্টোবর

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

গীবত বা পরনিন্দা ঘৃণ্যতম অপরাধ

গীবত বা পরনিন্দা ঘৃণ্যতম অপরাধ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৩৮


মশা প্রসংগে মহাগ্রন্থ আল কুরআন

মশা প্রসংগে মহাগ্রন্থ আল কুরআন

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:০৫

পবিত্র আশুরা ১০ সেপ্টেম্বর

পবিত্র আশুরা ১০ সেপ্টেম্বর

০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৩১

আল্ কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান

আল্ কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান

৩০ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০০




ব্রেকিং নিউজ