খুলনা | শনিবার | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

মহাজনের ঋণের জালে বন্দী তারা সংকট মোকাবেলায় নতুন স্বপ্ন নিয়ে চলছে সমুদ্রযাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

অর্থসংকট ও নদী ভাঙন আতঙ্কে খুলনার জেলে পল্লীর বাসিন্দারা

মোহাম্মদ মিলন  | প্রকাশিত ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:২০:০০

আতঙ্কে রয়েছে নদী ভাঙন কবলিত এলাকার জেলেরা। বসতভিটা একের পর এক নদীগর্ভে ভেঙে পড়ছে। তবুও নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছে তারা। আছে অর্থের সংকট। তারপরও ব্যস্ততা; পাড়ি দিতে হবে জীবিকার টানে গহীন সাগরে। আর মাত্র দেড় মাস পরেই যেতে হবে বঙ্গোপসাগরে। তাই প্রস্তুতির শেষ নেই খুলনার জেলে পল্লীগুলোতে। নানা সংকট মোকাবেলা করে সাগরযোদ্ধারা নেমে পড়ছেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে। সমুদ্রে মাছ ধরতে জাল, নৌকাসহ আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র নিতে হবে। এজন্য কেউ নতুন করে নৌকা গড়ছেন, কেউ পুরনোটিকেই সংস্কার করছেন, আবার কেউ কেউ জাল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দিন-রাত খাটতে হচ্ছে জেলে পরিবারগুলোর সদস্যদের। আর এসবের ফাঁকে টাকার জন্য ছুটছেন মহাজনদের কাছে। আগামী ২২ অক্টোবর (বাংলা ২ কার্তিক) এসব জেলেরা প্রায় ৫ মাসের জন্য ঘর ছাড়বেন। তাইতো শেষ সময়ে এমনই ব্যস্ত দিন কাটছে সমুদ্রগামী জেলেদের। পাইকগাছা উপজেলার মাহামুদকাঠি, হেতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর, কাঠিপাড়া গ্রামগুলো ঘুরে এ দৃশ্য দেখা গেছে।  
এখানকার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সাগর ও নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এরপরই বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে চলে যেতে হয় বঙ্গোপসাগরে। থাকেন সুন্দরবন সংলগ্ন আলোর কোল পয়েন্টে। সেখানেই মার্চ মাস পর্যন্ত চলে মাছ ধরা। ওই মাছ তাঁরা সেখানে শুকিয়ে জাহাজে করে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেন। 
জেলে ও তাদের স্বজনরা বলেছেন, জীবরে ঝুঁকি নিয়ে জেলেরা গহীন সমুদ্রে জীবন-জীবিকার জন্য ছুটে যান। নিজেদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তারপরও তাদের নিরাপত্তা নেই। কোন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ সহায়তা দেয় না। তাই মহাজনদের ঋণের জালে বন্দী হতে হয়। আর পাইকগাছার জেলেদের জন্য বড় আতঙ্ক কপোতাক্ষের ভাঙন। এ অবস্থার উত্তোরণ না হলে এক সময় তারা হারিয়ে যাবেন। 
উপজেলার বোয়ালিয়ার হিতামপুর গ্রামে কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে রয়েছে দেড় শতাধিক জেলে পরিবার। পুরোনো খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুটো নতুন নৌকা তৈরির কাজ চলছে। নৌকা দু’টি তৈরি করাচ্ছেন ওই এলাকার শীতিনাথ বিশ্বাস ও চিত্ত বিশ্বাস। এর কিছু দূর উত্তরে আরও দু’টি নতুন নৌকা   তৈরি করার কাজ চলছিল। ওই নৌকা দু’টি করাচ্ছেন সঞ্জয় বিশ্বাস ও নির্মল বিশ্বাস। নদীর পাড়ে নৌকা বানানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন মিস্ত্রি তপন মণ্ডল। নৌকা বানানোর জন্য তাঁকে  গোপালগঞ্জ থেকে নিয়ে এসেছেন জেলেরা। তপন মন্ডল বলেন, একটা নৌকা তৈরি করতে সময় লাগে কমপক্ষে ৪০ দিন। মিস্ত্রি লাগে চার জন। খরচ হয় কমপক্ষে চার লাখ টাকা। শুধু নৌকা বানানোর মজুরিই নেওয়া হয় এক লাখ থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। হাতে আর সময় নেই তাই শেষ সময়ের ব্যস্ততা সবারই। নৌকা ও জাল মেরামত করা, দড়ি বানানো তেলের জন্য ড্রাম প্রস্তুত করা, পুরনো নৌকা ও যন্ত্রাংশ একটু যাচাই করে নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজ করছেন জেলেরা। এ ছাড়া মাছ ধরতে যাওয়ার লোকও ঠিক করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে ছেলেদের। 
গোপালগঞ্জের সাতপার এলাকার নৌকা তৈরির কারিগর (মিস্ত্রি) মিলন বালা, দরগাপুরের শেখ ডালিম ও আব্দুল আলম বলেন, মূলতঃ খই কাঠ (বাবলা), মেহগনি কাঠে তৈরি হয় একেকটি নৌকা। নৌকা তৈরিতে সব মিলিয়ে ৫/৬ লাখ টাকা খরচ পড়ে।  
রামনাথপুর গ্রামের মহিতোষ বিশ্বাস, অসীম কুমার মন্ডল, মনিশংকর বিশ্বাস বলেন, দৈর্র্ঘ্যে ৪২ হাত ও প্রস্থে ১২ হাত নৌকা নিয়ে আমরা সমুদ্রে যাই। প্রতি নৌকায় ৮-১০ জন জেলে থাকেন। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সাগরে অবস্থান করে জেলেরা মাছ ধরবে। নৌকা তৈরি, দীর্ঘ সময় নিজ ও পরিবারের খরচ সামলে জেলে পরিবারে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জেলেরা কোন ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় মহাজনের কাছ থেকে দাদন (ঋণ) নিতে বাধ্য হয়। এতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আয় করা অর্থের সিংহভাগই মহাজনের হাতে তুলে দিতে হয়। আমরা এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই। 
জেলেরা জানান, প্রতি বছর সাগরে মাছ ধরতে যায় ৫৫ থেকে ৬০টি ট্রলার। ওই এলাকার প্রতি পরিবারের কেউ না কেউ যায় ওইসব ট্রলারের সঙ্গে। 
দীপংকর বিশ্বাস ও দিনবন্ধু বিশ্বাস বলেন, কয়দিন পরেই  সাগরে যাবো। আর এদিকে কপোতাক্ষ নদের ভাঙন। আমরা দিশেহারা হয়ে গেছি। বাস্তুভিটা আর নেই। এই নিয়ে তিন বার ঘর বেঁধেছি। সবই নদীতে খেয়েছে। কিভাবে পরিবারের সদস্যরা থাকবে জানিনা। 
কাটাখালী জেলে পল্লীর পঞ্চানন বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা সমুদ্রে মাছ নয়, দেশের জন্য ডলার আনি। কিন্তু আমাদের জন্য কোন উদ্যোগ নেই। এই দু’বছর ‘অ্যাওসেড’ নামে একটি এনজিও আমাদের লাইফ জ্যাকেট, বয়া, দিকদর্শন যন্ত্র, রেডিও, টর্চ লাইট, জরুরি ওষুধ দিচ্ছে। তারা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এখন সাগরে বেঁচে থাকার সাহস পাচ্ছি। এমন উদ্যোগ নিলে জেলেরা বাঁচাতো।’ 
জেলেরা বলেন, খাওয়া, জেলেদের মজুরিসহ ট্রলার প্রতি খরচ হয় কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা। ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা না থাকায় ওই টাকা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার করেন তাঁরা। মৌসুম শেষে যে টাকা লাভ হয় তার একটি বড় অংশ চলে যায় ওই সুদের টাকা শোধ করতে। এ ছাড়া দাদন নিয়েও অনেকে সাগরে যান। যাদের কাছ থেকে দাদন নেওয়া হয় তাঁদের কাছে কম দামে শুটকি বিক্রি করতে হয়। এ কারণে তাঁদের স্বল্প মেয়াদে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেওয়া হলে জেলেরা অনেক লাভবান হবেন বলে জানান তাঁরা। তাঁদের দাবি, তাঁদের উৎপাদিত শুটকির একটি বড় অংশ রপ্তানি হয়। সেখান থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রায় আয় করে সরকার। এ ছাড়া পূরণ হয় দেশের মাছের ঘাটতির একটি বড় অংশও। সুতরাং জেলেদেরও ঋণ সুবিধা দেওয়া উচিৎ। একইভাবে বিমা সুবিধা দেওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অনেকটা শঙ্কামুক্ত থাকবে বলে মনে করেন তাঁরা।      
সমুদ্রগামী জেলেদের নিয়ে কাজ করা খুলনার বেসরকারি সংস্থা অ্যাওসেড প্রধান নির্বাহী শামীম আরেফীন বলেন, ‘আমরা ২/৩ বছর ধরে সমুদ্রগামী জেলেদের নিয়ে কাজ করছি। তাদের সমুদ্রে নিরাপত্তার জন্য উপকরণ প্রদান, আবহাওয়া বার্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে সচেতন করছি। এজন্য সম্প্রতি একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসেব মতে, উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩ লাখ সমুদ্রগামী জেলের রয়েছেন। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের সরকারি-বেসরকারি বেশী বেশী উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, অর্থনৈতিকভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।’  
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ










খুলনায় তৎপর ৮টি গ্রুপ 

খুলনায় তৎপর ৮টি গ্রুপ 

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০১:২০




ব্রেকিং নিউজ











‘খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের আরো অবনতি’

‘খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের আরো অবনতি’

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৪৩