খুলনা | সোমবার | ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২ পৌষ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ম. জাভেদ ইকবাল | প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০:০০

ঘর বাঁধাতেই বাঙালি নারীর সার্থকতা। বিয়ের পর বাঙালি নারী বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িকে আপন ভাবতে শুরু করে। সুখী একটি সংসারের কল্পনা থাকে তার হৃদয় জুড়ে। মৃত্যু পর্যন্ত স্বামীর বাড়িই তার বাড়ি। কিন্তু এই বাড়িতেই নারী যে সব সময় তার কল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে এমন নয়। নানা রকম ঝড়-ঝাপটা, প্রতিকূলতার মধ্যে অধিকাংশ নারীকে তার জীবন কাটাতে হয়। অনেক ছোট-খাটো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে নারীর জীবনকে বিষিয়ে তোলা হয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) এক গবেষণা এবং এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ ও জাতীয় নারী  নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের (জেএনএনপিএফ) এক যৌথ গবেষণার ফলাফলে নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। উভয় গবেষণার ফলাফলেই বলা হয়েছে, নিজ ঘরেই নারীরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয়ে থাকেন। ইউএনওডিসির গবেষণার ফলাফল অনুয়াযী, ২০১৭ সালে বিশ্বে মোট ৮৭ হাজার নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ খুন হয়েছে একান্ত সঙ্গী অথবা পরিবারের সদস্যদের হাতে। এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ ও জেএনএনপিএফের গবেষণার তথ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার দুই-তৃতীয়াংশই হয় পারিবারিক পরিমন্ডলে। আর সহিংসতার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ দেশে পারিপারিক সহিংসতার শিকার মাত্র তিন দশমিক এক শতাংশ নারী বিচার পেয়ে থাকেন।
তিনটি সংস্থার গবেষণায় প্রাপ্ত এসব তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। নিজের বাড়িকে মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। দিন শেষে মানুষ নিজের বাড়ি ও পরিবারের কাছে ফেরে। পরিবারের সদস্যদের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করার মধ্যেই মানুষ তৃপ্তি খুঁজে পায়। সেই নিজের পরিবারের কাছেই যদি নারীকে নির্যাতিত হতে হয়, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়।
আমাদের দেশে নারীর ওপর নির্যাতনকারীর ভূমিকায় মূলত পুরুষকেই দেখা যায়। নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন এবং তাঁরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন স্বামী দ্বারা। এছাড়া শাশুড়ি, ননদ, দেবরসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা মানসিক নির্যাতন তো আছেই।
দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নানা আইন ও নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু সেসব আইন ও নীতিমালার প্রয়োগের অভাবে নারী নির্যাতন লেগেই আছে। এটা পরিষ্কার যে শুধু আইন করে নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। কেননা, মূল সমস্যা হচ্ছে নারীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের সমাজের নারী মানেই দুর্বল, তাঁদের বুদ্ধি নেই, তাঁরা কেবলই ভোগের বস্তু, তাঁদের কাজ শুধু রান্নাবান্না করা ও সন্তান লালন-পালন করা। এই দৃষ্টিভঙ্গির যত দিন না পরিবর্তন ঘটবে, তত দিন নারীরা নির্যাতিত হতে থাকবেন। নারীর প্রতি সমাজের এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।  এ জন্য সরকারকে আরও জনসচেতনতা সৃষ্টিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তবে আইনের প্রয়োগও করতে হবে। নারী নির্যাতনকারীদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
গবেষণার ফলে বলা হয়েছে, দেশে এখনও ৬৬ ভাগ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটি আদালতে উঙ্খাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। আবার ৩২ ভাগ অপরাধী খালাস পেয়ে যায়।
আমাদের সমাজে মনে করা হয় নারীর প্রতি নির্যাতন একটি স্বাভাবিক ঘটনা। একজন নির্যাতিত নারী খুব দায় না থাকলে অভিযোগ করেন না। আবার একজন নারী অনেক সময় থানায় গিয়ে সহযোগিতা পান না। আইনি জটিলতায় বিচার পেতে অনেক সময় লেগে যায়। একজন নারী বা একটি পরিবারের পক্ষে অর্থ খরচ বা সময় দিয়ে পরিশেষে বিচার পাওয়া খুবই কঠিন। সে কারণে অধিকাংশ মামলার বিচার আলোর মুখ দেখে না। অনেক সময় আমরা নারী নির্যাতনকে মেনেও নিই। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা নারী নির্যাতনকে সমর্থণ দিয়ে যাচ্ছি। এর ফলে সমাজে নারী নির্যাতন আরও বেড়ে যায়।
তবে আশার কথা হলো, দেশের সকল  বিভাগীয় শহরের একটি থানায় ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার’ নামে একটি সেল খোলা হয়েছে। বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি কয়েকটি জেলা শহরেও অনুরূপ সেন্টার খোলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল জেলাতে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার খোলা হবে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুরা আইনগত সহায়তা পেয়ে থাকেন। নিবিড়ভাবে তাদের সমস্যাগুলো শোনার পাশাপাশি ভিকটিমদের নিরাপদ আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করা হয় এবং তাকে আইনগত সকল সহায়তা প্রদান করা হয় এই ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোতে। এটা সরকারের একটা যুগান্তকারী উদ্যোগ।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং গৃহে এর ব্যাপকতাকে নির্মূল করার জন্য আইন এবং তার বাস্তবায়ন করা জরুরি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নারীরা যেন গৃহে সংঘটিত সকল ধরনের সহিংসতা চিহ্নিত করতে পারে সে বিষয়ে তাদের সচেতনতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। নারীরা যাতে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিংবা অভিযোগ করতে পারে তার জন্য সরকার সকল তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার যে সকল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। নারীরা যাতে সঠিক উপায়ে আইনগত অভিযোগগুলো দাখিল করতে পারে সে বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর ও আন্তরিক হতে হবে। নারীকে নিরাপদ রাখতে প্রথমে পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। নারীর প্রতি পুরুষের প্রথাগত ধ্যানধারণাগুলোর আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কেননা, একজন নারীর সম্মান মানে আমার মায়ের সম্মান, একজন নারীর সম্মান মানে আমার বোনের সম্মান, একজন নারীর সম্মান মানে আমার কন্যার সম্মান। এই মানসিকতাই নারীর ওপর সহিংসতা বহুলাংশে কমাতে পারে।
লেখক: উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।    


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৪১


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪৩




ব্রেকিং নিউজ


বেসরকারি সোনালী জুট মিল বন্ধ ঘোষণা

বেসরকারি সোনালী জুট মিল বন্ধ ঘোষণা

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:৩০







বিজয় দিবস ও আজকের মূল্যায়ন

বিজয় দিবস ও আজকের মূল্যায়ন

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:২১



বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন আমাদের গর্ব

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন আমাদের গর্ব

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০১:১৬