নগরীর অখ্যাত আবাসিক হোটেলগুলো যেন ধর্ষণের আতুরঘর : টাকা দিলেই মিলছে রুম!


মহানগরীতে অবস্থিত অখ্যাত আবাসিক হোটেলগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নারীদের ধর্ষণের আতুরঘর হিসেবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি সময়ে বেশ কয়েকটি আলোচিত ধর্ষণের মামলায় সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। অথচ নাম সর্বস্ব ওই সকল আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক কোন ব্যবস্থা দেখা যায়নি। ওই সব আবাসিক হোটেলে টাকা দিলেই কোন প্রকার নিয়মকানুন ছাড়াই রুম ভাড়া পাওয়া যায়। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ ২/৩ ঘন্টার জন্য চড়া দামে কক্ষ ভাড়া নেয় বলে জানা গেছে। এ সকল বিষয়ে প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় দিনের পর দিন আবাসিক হোটেলগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। 
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, নগরীর বেশ কিছু অখ্যাত আবাসিক হোটেলে দিনের বেলায় নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসা করানো হয়। কেএমপির অভিযানে গত ৬ মাসে শতাধিক নারী-পুরুষ এ সকল হোটেল থেকে আটক হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানা ছাড়াও নিয়মিত মামলা দিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।  এ সকল নারী-পুরুষের সাথে কোন কোন অভিযানে নগরীর সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীও আটক হয়েছেন। তবে সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে পুলিশ তাদের মুচলেকা নিয়ে সতর্কতামূলক মুক্ত করেছেন। নগরীর অখ্যাত আবাসিক হোটেলগুলোতে ধর্ষণের বেশ কিছু ঘটনা জনসম্মুখে আসার কারনে মামলায় গড়িয়েছে। এছাড়া এ ধরনের অনেক ধর্ষণের ঘটনা ভিকটিম সামাজিক সম্মানের ভয়ে মুখ খোলেনা। 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর নগরীর খালিশপুরস্থ মুজগুন্নী পার্কে স্বামীর বন্ধুর সাথে ৫ বছরের কন্যা সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে যান এক গৃহবধূ। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পার্ক থেকে বেরিয়ে ইজিবাইকে উঠার সময় মোটরসাইকেল যোগে পুলিশ সদস্য পরিচয়ে মিরাজ তাদেরকে পথরোধ করে। পার্কে ঘুরতে আসার বিষয়টি তার স্বামী সৈকত বিশ্বাসকে জানাবেন বলে মুঠোফোনে ছবি তোলেন। এরপর ভয়ভীতি দিয়ে ওই গৃহবধূকে মোটরসাইকেলে তুলে গল্লামারী এলাকার চৌধুরী আবাসিক হোটেলে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে ধর্ষণ করে পুলিশ সদস্য মিরাজ। খবর পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই হোটেল থেকে গৃহবধূকে উদ্ধার ও মিরাজকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় পলি বিশ্বাস বাদী হয়ে খালিশপুর থানায় মামলা দায়ের করেন (নং-৪০)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আবুল খায়ের আসামি মিরাজকে অভিযুক্ত করে ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। ওই মামলায় গত ২৯ জুলাই পুলিশ সদস্য মোঃ মিরাজ উদ্দিন (৩৩) কে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ মহিদুজ্জামান। ২০১৮ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে নগরীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে নগরীর সাত রাস্তা মোড়ের টাইটান আবাসিক হোটেলে নিয়ে তানজিল ইসলাম (২৫) নামের একজন কোস্ট গার্ড সদস্য ধর্ষণ করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ২২ এপ্রিল একই হোটেলের চতুর্থ তলার ৪০৯ নম্বর কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করার পর বিবিএ’র ওই ছাত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বিষয়টি তানজিলকে জানানো হলে সে বিয়ে করতে পারবে না বলে জানান। পরবর্তীতে তানজিলের বাবা ও মাকে বিষয়টি জানান ঐ ছাত্রী। তবে ছাত্রীর সাথে তানজিলের বাবা-মা খারাপ ব্যবহারের পাশাপাশি হুমকিও দেয়। এ ঘটনায় ওই ছাত্রী বাদী হয়ে চলতি বছরের ১৯ জুন খুলনা সদর থানায় তানজিলসহ তার বাবা-মাকে আসামি করে মামলা করেন। 
নগরীতে বর্তমানে সব থেকে আলোচিত হয়েছে বেসরকারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিঞ্জন রায়ের ধর্ষণ মামলা। নগরীর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে খুলনা কর অঞ্চলের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ছেলে শিঞ্জন রায় (২৫) সোনাডাঙ্গাস্থ আবাসিক হোটেলসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করেন।  ছাত্রী (২০)’র সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক বছর ধরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে শিঞ্জন রায়। বর্তমানে ওই ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শিঞ্জন রায় গত ১৪ আগস্ট অন্যত্র বিয়ে করেন। এ খবর গর্ভবতী ওই ছাত্রীর কানে পৌঁছালে সে শিঞ্জনের খোঁজে গত ১৫ আগস্ট রাত ১০টার দিকে মুজগুন্নী আবাসিকের ১৬ নম্বর রোডে যান। সেখানে গিয়ে শিঞ্জন রায়ের দেখা পায়। এ সময় তার বিয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সে তাকে সেখান থেকে ইজিবাইকে জোর করে তুলে দিতে গেলে স্থানীয়দের নজরে আসে। এরপর বিষয়টি থানা পুলিশের কাছে খবর গেলে তারা দু’জনকেই সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় নিয়ে আসে। ১৬ আগস্ট সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় ওই ছাত্রী নিজেই বাদী হয়ে শিঞ্জন রায়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন (নং-২০)। বর্তমানে কারাগারে আছে শিঞ্জন, জব্দ করা হয়েছে পাসপোর্ট।
এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সরদার রকিবুল ইসলাম বলেন, নগরীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কর্মকান্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। গত ৬ মাসে বিভিন্ন হোটেল থেকে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে শতাধিক নারী-পুরুষকে আটকের পর আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ সকল আবাসিক হোটেলগুলোতে যাচাই-বাছাই করে কক্ষ ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কোন আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি। 
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।