খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

খুলনার বাজার সয়লাব নিষিদ্ধ খাদ্য পণ্যে

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ২১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯:০০

নগরীর রূপসা ট্রাফিক মোড়ের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘কেনাকাটা’য় গতকাল সন্ধ্যায় কেবিসি এগ্রো লিমিটেডের কোলেস্টেরলমুক্ত ফরটিফাইড রাইস ব্র্যান অয়েল হেলথ্ কেয়ার দেখে ক্রেতা প্রশ্ন করলেন এটা এখনো মার্কেটে। ওইটার কারখানায় নাকি দুই হাজার টন শুকরের চর্বি জব্দ করেছিল র‌্যাব? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, তাই নাকি? তাহলে কোম্পানির লোক এলেই ফেরত দেবো, বললেন দোকানী। শুধু হেলথ্ কেয়ার রাইস ব্র্যান অয়েল নয়, দুই দফায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্যগুলোও খুলনার বাজারে সয়লাব।
গত ৩ আগস্ট রাজধানীর ধামরাইয়ের ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন খাবার তৈরির কারখানা কেবিসি এগ্রো লিমিটেডে এ অভিযান ১১ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় দুই হাজার টন নিষিদ্ধ শুকরের মাংস, হাড়, চর্বি জব্দ করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় কারখানাটিকে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করে সিলগালা করা হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, কেবিসি এগ্রো (প্রাঃ) লিমিটেড হেলথ কেয়ার নামের প্রতিষ্ঠানটি সয়াবিন তেল তৈরি করার জন্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হংকং থেকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ শুকরের চর্বি আমদানি করে। এছাড়াও একই উপকরণ ব্যবহার করে মাছ ও মুরগির খাদ্যও তৈরি করে বাজারজাত করে আসছিল তারা। খবর পেয়ে আমরা অভিযানে আসি এবং অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাই।
এছাড়া, বিএসটিআই’র পরীক্ষায় নিম্নমানের ৫২ ভোগ্যপণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহারে গত ১২ মে আদেশ দেয় হাইকোর্ট। একই সাথে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আদালত নির্দেশ দেয়। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা।’ অথচ এ অঞ্চলের সবচেয়ে সব মোকাম খুলনার বড় বাজার, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে সয়লাব এসব নিষিদ্ধ খাদ্য পণ্য। ভেজাল পণ্যগুলো হল-সিটিওয়েলের সরিষার তেল, গ্রীন বি চিং এর সরিষার তেল, শমনমের সরিষার তেল, বাংলাদেশ এডিবল ওয়েলের সরিষার তেল, কাশেম ফুডের চিপস, আরা ফুডের ড্রিংকিং ওয়াটার, আল সাফির ড্রিংকিং ওয়াটার, মিজান ড্রিংকিং ওয়াটার, মর্ণ ডিউয়ের ড্রিংকিং ওয়াটার, ডানকান ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার, আরার ডিউ ড্রিংকিং ওয়াটার, দিঘী ড্রিংকিং ওয়াটার, প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, ডুডলি নুডলস, শান্ত ফুডের সফট ড্রিংক পাউডার, জাহাঙ্গীর ফুড সফট ড্রিংক পাউডার, ড্যানিশের হলুদের গুড়া, প্রাণের হলুদ গুড়া, ফ্রেশের হলুদ গুড়া, এসিআই’র ধনিয়ার গুড়া, প্রাণের কারি পাউডার, ড্যানিশের কারী পাউডার, বনলতার ঘি, পিওর হাটহাজারী মরিচ গুড়া, মিস্টিমেলা লাচ্ছা সেমাই, মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, মিঠাইর লাচ্ছা সেমাই, ওয়েল ফুডের লাচ্ছা সেমাই, এসিআই’র আয়োডিন যুক্ত লবণ, মোল্লা সল্টের আয়োডিন যুক্ত লবণ, কিং’য়ের ময়দা, রূপসার দই, মক্কার চানাচুর, মেহেদীর বিস্কুট, বাঘাবাড়ীর স্পেশাল ঘি, নিশিতা ফুডস’র সুজি, মঞ্জিলের হলুদ গুড়া, খুলনার মধুমতির আয়োডিন যুক্ত লবণ, সান ফুডের হলুদ গুড়া, গ্রীন লেনের মধু, কিরণের লাচ্ছা সেমাই, ডলফিনের মরিচের গুড়া, ডলফিনের হলুদের গুড়া, সূর্যের মরিচের গুড়া, জেদ্দার লাচ্ছা সেমাই, অমৃতের লাচ্ছা সেমাই, দাদা সুপারের আয়োডিনযুক্ত লবণ, মদিনার আয়োডিনযুক্ত লবণ ও নুরের আয়োডিনযুক্ত লবণ।
এরপর গত ১১ জুন বিএসটিআই এক বিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে ২২ পণ্য তুলে নিতে কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়। মানহীনতার কারণে প্রথম ধাপে ৫২ পণ্য নিষিদ্ধের পর আরও ২২ পণ্য নিষিদ্ধ করলেও খুলনা অঞ্চলের বাজারে ভরপুর বিকিকিনি হচ্ছে এসব খাদ্য পণ্য। বাজার থেকে সরানোর ২২টি পণ্যের মধ্যে রয়েছে-প্রাণ ডেইরির প্রাণ প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ঘি, স্কয়ার ফুড এ্যান্ড বেভারেজের রাঁধুনী ব্র্যান্ডের ধনিয়া গুঁড়া ও জিরার গুঁড়া, হাসেম ফুডস’র কুলসন ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, এসএ সল্টের মুসকান ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ, চট্টগ্রামের যমুনা কেমিক্যাল ওয়ার্কসের এ-৭ ব্র্যান্ডের ঘি, চট্টগ্রামের কুইন কাউ ফুড প্রোডাক্টসের গ্রিন মাউন্টেন ব্র্যান্ডের বাটার অয়েল, চট্টগ্রামের কনফিডেন্স সল্টের কনফিডেন্স ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ, ঝালকাঠির জে কে ফুড প্রোডাক্টের মদিনা ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই, চাঁদপুরের বিসমিল্লাহ সল্ট ফ্যাক্টরির উট ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ এবং চাঁদপুরের জনতা সল্ট মিলসের নজরুল ব্র্যান্ডের আয়োডিনযুক্ত লবণ। এ ছাড়া থ্রি স্টার ফ্লাওয়ার মিলের থ্রি স্টার ব্র্যান্ডের হলুদের গুঁড়া এবং এগ্রো অর্গানিকের খুশবু ব্র্যান্ডের ঘি নিম্নমানের হওয়ায় কোম্পানি দু’টির লাইসেন্স বাতিল করে বিএসটিআই। এসব পণ্যগুলো খুলনার বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতে দেখা গেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এসএম নাজিমুল ইসলাম বলেন, আদালতের নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বাজার থেকে তুলে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তারপরও বাজারে যদি থাকে তাহলে শিগগিরই এসব পণ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিশ্চিতকরণে আদালতে একাধিক রিটকারী কনসাস কনজুমার সোসাইটি’র (সিসিএস) নির্বাহী সম্পাদক পলাশ মাহমুদ বলেন, “সারাদেশে নিরাপদ খাদ্যপণ্য নিশ্চিতকরণের লক্ষে আন্দোলন করছি, আর আমার শহরেই আদালতের নিষিদ্ধ পণ্যে সয়লাব এটা দুঃখজনক। গুলি করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিই নিহত হয়, আর ভেজাল খাদ্যের কারণে গোটা জাতির অকাল মৃত্যু হয়; এটাই সকলকে বুঝতে হবে।”
কনজুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের খুলনা জেলা সভাপতি এড. এনায়েত আলী বলেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় বাংলাদেশ বসবাসের অযোগ্য বলেছেন সর্বোচ্চ আদালত। রাষ্ট্র আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ