ঈদ উদযাপনের সঠিক পদ্ধতি ও কুরবানীর শিক্ষা


ঈদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : প্রত্যেক জাতির যেমন রয়েছে নিজস্ব কৃস্টি-কালচার, সভ্যতা, জাতীয় উৎসব পালনের ব্যবস্থা, ঠিক তেমনিভাবে রয়েছে মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব সংস্কৃতি, সভ্যতা ও বাৎসরিক উৎসব পালনের স্বকীয়তা। কিন্তু মুসলিম ও অন্য জাতির মধ্যে পার্থক্য এখানেই যে, মুসলিম উম্মাহ উৎসব পালনে তাদের রবের নির্দেশনা, নববী আদর্শ ভুলে না। তাই তাদের উৎসব শুরু হয় সালাত তথা নামায আদায়ের মাধ্যমে। আল্লাহর একত্ব ঘোষণার মধ্য দিয়ে। পক্ষান্তরে অন্যান্য জাতি ও গোষ্ঠি এর বিপরীত। ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থাদি অধ্যয়নে জানা যায় যে, রাসূল যখন হিজরত করে মদীনায় এলেন মদীনার ইহুদীরা বৎসরে দু’দিন উৎসব পালন করত। রাসূল বলেন, “তোমরা এ দু’দিনে কি করো?” তারা বলে, “আমরা জহেলিয়্যাতের যুগ থেকেই এ দু’দিন উৎসব পালন করে আসছি।” রাসূল বলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্যে এর চেয়েও উত্তম দু’দিন উৎসবের ব্যবস্থা করেছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।” এরপর দ্বিতীয় হিজরী সনে রমযান মাসের দু’দিন বাকি থাকতে সালাতুল ঈদের হুকুম অবতীর্ণ হয়। (ফাতহুল মুলহিম লি শাব্বীর আহমদ উছমানী : ৪/৩৫৭; সিরাতে মুস্তফা : ১/৪৯৫)। ২য় হিজরী সনে রাসূল ঈদের সালাত আদায় করেন এবং সাহাবাদের নিয়ে ঈদগাহে গিয়েছিলেন। এটাই ছিল রাসূল এর প্রথম ঈদ উদযাপন (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৩/২০৭)।
ঈদের নামায আদায়ের সহীহ পদ্ধতি : ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামায দু’রাকাত করে যা অন্যান্য নামাযের ন্যায় সম্পন্ন করবে। তবে এখানে কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে যথা- ১ম রাকাতে সানার পর অতিরিক্ত তিন তাকবীর দিবে, অতঃপর কেরাতসহ অন্যান্য আমল বাকি নামাযের ন্যায়। ২য় রাকাতে কেরাতের পর অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলবে, এরপর বাকি অন্য নামাযের ন্যায় নামাজ সম্পন্ন করবে।
ঈদের অতিরিক্ত ছয় তাকবীর : কাসেম ইবনে আব্দুর রহমান বলেন, আমাকে রাসূল এর কয়েকজন সাহাবী হাদীস বর্ণনা করেছেন, রাসূল  আমাদের নিয়ে ঈদের নামায আদায় করলেন এবং চারটি তাকবীর দিলেন। নামায শেষে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভুলে যেও না। তারপর হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী গুটিয়ে চার আঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করে বললেন, জানাযার তাকবীরের ন্যায় (অর্থাৎ ঈদের নামাযেও চারটি তাকবীর রয়েছে)। (শারহু মাআনিল আসার: ২/৩৭১, হাদীস নং: ৭২৭৩)। হাদীসটি সহীহ। মাকহুল বলেন, আবু হুরাইরা (রাঃ) এর সঙ্গী আবু আয়শা (আল-উমাভী) জানিয়েছেন যে, কুফার আমীর সাঈদ ইবনুল আস (রাঃ) আবু মূসা আশআরী ও হুযাইফা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূল ঈদের নামাযে কতটি তাকবীর দিতেন ? আবু মূসা আশআরী (রাঃ) উত্তরে বলেন, জানাযার তাকবীরের ন্যায় চার তাকবীর। হুযাইফা (রাঃ) বলেন, তিনি ঠিক বলেছেন, আবু মূসা আশআরী আরো বলেন, আমি যখন বসরায় ছিলাম তখন এ ভাবেই তাকবীর দিতাম। আবু আয়শা বলেন, সাইদ ইবনুল আসের এই প্রশ্নের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম (সুনান আবী দাউদ: ১/১৬৩, হাদীস নং: ১১৫৫; মুসনাদে আহমাদ: ৩২/৫০৯-১০, হাদীস নং: ১৯৭৩৪; মুসনাদুস সাহাবা ফি কুতুবিত তিসআ: ৩২/৩৬৮; জামেউল উসূল মিন আহাদীসির রাসূল : হাদীস নং: ৪২৩৪)। সনদসূত্রে হাদীসটি হাসান বা উত্তম। ইবরাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স (রহঃ) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল আস (রাঃ) এক ঈদের দিনে আবু মূসা আশআরী (রাঃ) ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হুযাইফা (রাঃ)-দের ডেকে বললেন, আজ ঈদের দিন আমি কিভাবে ঈদের নামায আদায় করব? হুযাইফা (রাঃ) বললেন, আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করুন, আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বললেন, ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করুন, ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন, এভাবে তাকবীর দিবে যে, এ মর্মে তিনি উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেন। অর্থাৎ এক তাকবীর দিয়ে নামায শুরু করবেন। অতঃপর ৩ তকবীর দিবেন এবং কেরাত পাঠ কররেন, তারপর এক তাকবীর দিয়ে রুকু করবেন। অতঃপর সাজদা করবেন এবং দাঁড়িয়ে কেরাত পাঠ করবেন। তারপর ৩ তাকবীর দিবেন। অতঃপর আরো এক তাকবীর দিয়ে রুকু করবেন। (শরহু মা‘আনিল আছার : ২/৩৭২, হাদীস নং : ৭২৮৪)। সনদসূত্রে উক্ত হাদীসটি সহীহ। ওপরের হাদীসসমূহের আলোকে একথা স্পষ্ট যে, ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ৬ তাকবীর দিতে হবে।
ঈদের দিনের সুন্নত সমূহ :-
ঈদ মানে আনন্দ হলেও, এটি স্রেফ্ আনন্দ আর ফূর্তি নয়, নিষ্কলুষ আনন্দ আর ইবাদতের এক অপূর্ব মিলনের নাম ঈদ। এই কারণে ঈদের উৎসবও ইবাদতের আদল বা মেজাজেই করতে হবে। শুধূ নাজায়েজ হাঁসি তামাশা আর আমোদ ফূর্তিতে যাতে ঈদের সময়টুকু না কাটে সে দিকেও খেয়াল রাখা দরকার। ঈদ যেমন আনন্দ তেমনি ইবাদতও বটে। এ কারণে ঈদেরও কিছু সুন্নত তরিকা আছে। এর সুন্নত তরিকাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঈদের নামাজের আগে গোসল করে নেয়া, ভালো পোশাক পরিধান করা, আতর-সুগন্ধি মেখে ঈদগাহে যাওয়া, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া, ঝড়-বৃষ্টি বা অন্য কোন ওজর না থাকলে মসজিদের পরিবর্তে মাঠে বা ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়া। সম্ভব হলে এক রাস্তায় যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে নেয়া এবং ঈদুল আযহায় কুরবানির পরে খাওয়া। তবে ঈদের দিনে ফজরের ফরজ নামাজের পরে  ঈদের জামাত পর্যন্ত আর কোন সুন্নত বা নফল নামাজ পড়া সমীচিন নয়। তাই আসুন আমরা হাদিসের বিধানমতে পবিত্র ঈদ উদযাপন করি। 
ঈদুল আযহার শিক্ষা----
ঈদুল আযহা আমাদের সামনে পেশ করে আত্মোৎসর্গ ও ত্যাগের এক  জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রকৃত অর্থেই সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে যায় ঈদুল আযহা। কোরবানি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, আমি নির্ধারণ করেছি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির নিয়ম যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তুর উপরে (সূরা হজ্জঃ ৩৪)। কোরবানির গোশতে গরীব মিসকিনদেরও অধিকার রয়েছে। এতে তারা ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। রাসুলে কারীম (সাঃ) প্রত্যেক সামর্থবানদেরকেই কোরবানি করার আদেশ দিয়ে এরশাদ করেছেন, “হে লোকসকল ! প্রত্যেক সামর্থবান পরিবারের পক্ষে প্রত্যেক বছরই কোরবানি করা আবশ্যক (আবু দাউদ ও নাসায়ী)।” হুজুর (সাঃ) আরও এরশাদ করেন, “যে ব্যাক্তি সামর্থ থাকা সত্বেও কোরবানির আয়োজন করে নি সে যেন আমার ইদগাহের নিকটে না আসে (ইবনে মাজাহ)।” তাছাড়া কোরবানির মাধ্যমে অপরিসীম ছওয়াবও লাভ হয়। একবার সাহাবীগণ (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ , “এই কোরবানি কি?” হুজুর (সাঃ) উত্তর করলেন, “তোমাদের পিতা হযরত ইব্র্রাহিম (আঃ) এর সুন্নত।” সাহাবীগণ (রাঃ) আবারও প্রশ্ন করলেন, এতে আমাদের কি ছওয়াব রয়েছে ইয়া রাসুল আল্লাহ? হুজুর (সাঃ) জবাব দিলেন, “কোরবানির পশুর প্রত্যেক লোমের পরিবর্তে একটি করে নেকি রয়েছে।” তারা আবারও জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুল আল্লাহ! “পশমওয়ালা পশুদের পরিবর্তে কি হবে?” হুজুর (সাঃ) উত্তর করলেন, “পশমওয়ালা পশুদের প্রতিটি পশমের পরিবর্তেও একটি করে নেকি রয়েছে” (মেশকাত : মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)। আর এক হাদিসে রাসুলে আকরাম (সাঃ) বলেন, “কোরবানির দিনে বনি আদম এমন কোন কাজ করতে পারে না যা আল্লাহ তায়ালার নিকট রক্ত প্রবাহিত করা অর্থাৎ কোরবানি করা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। কোরবানির সমস্ত পশু উহাদের শিং, উহাদের পশম ও উহাদের খুরসহ কিয়ামতের দিন (কোরবানির পাল্লায়) এসে হাযির হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নিকট সম্মানের স্থানে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুলল্লচিত্তে কোরবানি কর (তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ)। 
ঈদুল আযহা আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় সেই শিশু ঈসমাইল (আঃ) ও আল্লার প্রেমে পাগল ইবরাহিম খলিলুল্লার (আঃ) কোরবানির কথা। মাওলা প্রেমের এক বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন তিনি সমগ্র জগৎবাসীর কাছে। তবে কেবল পশু জবাই করা আর গোশত খাওয়া ও বিতরণের নাম কোরবানি নয়। বরং আল্লাহর রাহে নিজের জান-মাল ও কষ্টার্জিত ধন-সম্পদ নিঃশঙ্কচে বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানি।  শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। দরকার হলো খালেছ নিয়ত। কারণ মহান আল্লাহপাক এরশাদ করেন, “আল্লাহর কাছে তোমাদের কোরবানির গোশত ও রক্ত কোন কিছুই পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি (সূরা হজ্জ : ৩)।” ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর হুকুমে তার শিশু পুত্র ঈসমাইল (আঃ) কে কোরবানি দেয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলেন। এর মধ্যে অনেক সুক্ষ রহস্য নিহিত রয়েছে। তিনি শুধু সন্তানের গলায় ছুরি চালান নি, বরং প্রকৃতপক্ষে ছুরি চালিয়েছেন তার নিজস্ব প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আর এটাই হলো কোরবানির মূল নিয়ামক ও প্রাণশক্তি। প্রকৃতপক্ষে পশু কোরবানির সাথে সাথে নিজের সমস্ত পশুবৃত্তি ও কূ-প্রবৃত্তিকেও কোরবানি করা পবিত্র ঈদুল আযহার মর্মকথা। 
লেখক: অধ্যাপক, ফিশারিজ এন্ড মেরিণ রিসোর্স টেকনোলজী ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়)


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।