খুলনা | শনিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

মুহাম্মদ মাহ্ফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯:০০

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

পবিত্র কুরবানী ঈদ ত্যাগের মহিমায় ভাস্কর। কুরবানীর ত্যাগের উৎস হচ্ছে মহান আল্লাহর ভালবাসার জন্য নিজের সকল প্রকার মায়া মমতা ও ভালবাসাকে বিসর্জন দেয়ার কঠিন ব্রত। যার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তদীয় প্রাণপুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে কুরবানী করার মাধ্যমে। কুরবানী শব্দটি আরবি শব্দ। কুরব বা কুরনুন হতে উৎপত্তি। যার অর্থ আল্লাহর নৈকট্য, সান্নিধ্য অর্জন, উৎস্বর্গ করা, উপহার দেওয়া, সমার্পণ করা। বস্তুত কোন মহান উদ্দেশ্যে নিজের সবকিছু উৎস্বর্গ করার নাম কুরবানী। অন্যভাবে বলা যায় “আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করার নাম কুরবানী। এ পৃথিবীতে স্রষ্টার বাণী ও মহিমা প্রচারের জন্য নিজের জীবন-মরণ আল্লাহর জন্য সমার্পণ করার নাম কুরবানী”। মহান আল্লাহ বলেনÑ“বলে দিন নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মরণ বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য উৎস্বর্গিত”, (সূরা আনয়াম-১৬২)।
কুরবানী প্রবর্তণের কারণঃ এ কুরবানী প্রবর্তণের মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে তা হলোÑ এই যে দরিদ্র ও অভাবীদেরকে সমৃদ্ধ করা এবং নিকটতম ব্যক্তি ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। এ কুরবানী প্রবতর্ণের কারণ হলোÑ আল্লাহ তা’য়ালার কৃতজ্ঞতা পোষণ করা, গরীবদের প্রতি ধনীদের সমবেদনা জানানো, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত বাস্তবায়ন করা এবং হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সন্তান কুরবানীর বিনিময়ে পশু কুরবানীকে স্মরণ করা। এ প্রসঙ্গে যায়েদ ইবনে আকরাম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনÑ রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীরা রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল এ কুরবানী গুলো কী? বা এতে আমাদের কী কল্যাণ রয়েছে?” তখন রাসূল (সাঃ) উত্তরে বলেন, “এটি তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত বা তরীকা।” সাহাবীরা রাসূল (সাঃ) কে আবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তাতে আমাদের কী কল্যাণ রয়েছে?” রাসূল (সাঃ) বলেন, “প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী রয়েছে”।
কুরবানী ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য ঃ কুরবানীর ফযিলত ও গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে কয়েকটি ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হল ঃ--
(১) কুরবানীর দিনে কুরবানী করা আল্লাহর নিকট উত্তম আমল।
(২) কুরবানীর পশু যে অবস্থায় কুরবানী করা হবে ঠিক সেই অবস্থায় কিয়ামতের দিন উঠানো হবে।
(৩) কুরবানীর পশুর রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগে কুরবানি কবুল হয়ে যায়।
(৪) এ কুরবানী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত।  (৫) কুরবানী দাতার জন্য কুরবানীকৃত পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী দান করা হবে। (৬) কুরবানীকৃত পশুর রক্তের প্রথম ফোঁটা জমিনে পড়ার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে।
(৭) পক্ষান্তরে কুরবানীর ভিতর এত ফযিলত থাকার পরও কোন সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি কুরবানী না করে, তাহলে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেনÑ‘সে যেন ঈদগাহে না আসে’। 
কুরবানীর প্রেক্ষাপট ঃ পৃথিবীতে মানব জাতীর প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) এর পুত্রদ্বয়ের কুরবানী ছিল প্রথম কুরবানী। এখানে হাবিলের কুরবানী গ্রহনযোগ্য হয়। হযরত ঈসা (আঃ) ঈদ বা উৎসব পালনের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ“ঈসা ইবনে মারিয়াম বলেন, হে আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা আমাদের প্রতি আকাশ হতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য ঈদ বা আনন্দ উৎসব হবে” (সূরা আল মায়েদা-১১৪)। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মদিনায় আগমন করেন তখন সেখানকার নওমুসলিমদেরকে “নওরোজ ও মিহরাজান” নামে দুটি উৎসব পালন করতে দেখতে পান। তখন রাসূল (সাঃ) তাদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা উত্তরে বলেন, জাহেলিযুগে আমরা এ দিন গুলোতে খেলাধুলা করতাম। তখন রাসূল (সাঃ) বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে এ দু’টি দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দু’টি দিন প্রবর্তণ করে দিয়েছেন। একটি হলো “রোজার ঈদ” এবং অন্যটি হলো “কুরবানীর ঈদ” (আবু দাউদ)। প্রকৃতপক্ষে সকল নবী রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে কমবেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। এর মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তিনটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, প্রথমত : নমরুদ কর্তৃক আগুনে নিক্ষেপ, দ্বিতীয়ত : বিবি হযরত হাজেরাসহ পুত্র ইসমাঈলকে নির্বাসন এবং তৃতীয়ত : প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে আল্লাহর নামে কুরবানী প্রদান করা। মহামহিম আল্লাহর নামে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) নিজের পুত্র কে কীভাবে উৎস্বর্গ }} ৪ পাতার ৪ কলাম
করেছিলেন তার বিবরণ পবিত্র কুরআনের সূরা আল সাফফাতের (৯৯Ñ১১৩) আয়াতে উল্লেখ আছে। হযরত ইসমাঈল (আঃ) যখন কিশোর অর্থাৎ তার বয়স ১৩ বছর তখন বর্তমান সৌদি আরবের মিনা ময়দানে উক্ত কুরবানীর ঘটনা ঘটে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহ পাকের ওহী-আদেশ স্বপ্নের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে স্বীয় কিশোর পুত্র ইসমাঈল (আঃ) এর স্থলে বেহেশতী দুম্বা কুরবানী হয়। পিতা-পুত্রের এ আত্মত্যাগ আল্লাহ পাক এতই পছন্দ করেছেন যে, তাদের এ মহান স্মৃতি চির অমর করে রাখার জন্য আবহমান কাল অবধি স্বচ্ছল মুসলমান প্রত্যেকের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাকের উক্ত হুকুমের আওতায় আমরা প্রতি বছর কুরবানী করে থাকি। পিতা কর্তৃক পুত্রকে আল্লাহর রাহে কুরবানী করার উক্ত ঘটনাটি আল্লাহ পাক পবিত্র কালামে পাকে সূরা আস-সাফফাতে বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনÑ“অতঃপর ইসমাঈল যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হলেন ‘বৎস’ আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবেহ করেছি। এখন তোমার অভিমত কী? তিনি বললেন, আব্বাজান! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন (সূরা আস-সাফফাত-১১২)। উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত স্বপ্নের ব্যাপারে কোন কোন রিওয়াতের বর্ণনা মতে, এই একই স্বপ্ন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে উপর্যুপুরি তিন দিন দেখানো হয় (কুরতুবী)। একথা সত্য যে পয়গম্বরগণের স্বপ্ন-ই ওহী। তাই ইব্রাহীম (আঃ) এর স্বপ্নের অর্থ ছিল এই যে, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে তার প্রতি একমাত্র কিশোর পুত্রকে জবেহ করার হুকুম হয়েছে। এ হুকুম সরাসরী কোন ফেরেশতার মাধ্যমেও নাযিল করা যেতো। কিন্ত স্বপ্নে দেখানোর তাৎপর্য হচ্ছেÑহযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর আনুগত্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাওয়া (তাফসীরে কাবীর)। হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর অভিমত এজন্য জানতে চেয়েছেন যেÑ প্রথমত : তিনি পুত্রের পরীক্ষা নিতে মনঃস্ত করেছেন যে, পরীক্ষায় সে কতদূর উত্তীর্ণ হয়। দ্বিতীয়ত : উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ পালনের পথটি সহজ ও নিষ্কন্ঠক করা (রুহুল মা’আনি)। কিন্তু সে পুত্রও ছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর যোগ্য উত্তরসূরী ভাবী পয়গম্বর। তিনি জবাব দিলেনÑআপনাকে যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা সমাধান করে ফেলুন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) অতঃপর নিজের পক্ষ থেকে পিতাকে আশ্বাস দিলেন যে, আল্লাহ চাহেনতো আপনি আমাকে সবরকারীর মধ্যে পাবেন। হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর বক্তব্যে চূড়ান্ত আদব ও বিনয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত : তিনি আল্লাহ চাহেনতো (ইনশাআল্লাহ) বলে ব্যাপারটি আল্লাহ পাকের কাছে সমার্পণ করেছেন। দ্বিতীয়ত : তিনি একথাও বলতে পারতেন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন। কিন্তু বলেছেন আমাকে সবরকারীদের মধ্যে পাবেন এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ সবর ও সহনশীলতা আমার একারই কৃতিত্ব নয় বরং দুনিয়াতে আরো বহু সবরকারী আছেন। ইনশাআল্লাহ আমিও তাদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব। এভাবে তিনি অহংকার ও অহমিকার নাম গন্ধটুকু পর্যন্ত খতম করে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয় ও বশ্যতা প্রকাশ করেছেন (রুহুল মা’আনী)। অবশেষে পিতা ও পুত্র উভয়ই যখন এই নির্দেশিত ইবাদত পালন করার উদ্দেশ্যে কুরবানীগাহ মিনা প্রান্তরে পৌঁছালেন, তখন হযরত ইসমাঈল (আঃ) স্বীয় পিতাকে বললেন, আব্বাজান! আমাকে খুব শক্ত করে বেধে নিন, যাতে আমি খুব বেশি ছটফট করতে না পারি। আপনার পরিধেয় বস্ত্র সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিটা তাতে না পড়ে। অন্যথায় এতে আপনার সওয়াব হ্রাস পাবে। এছাড়া রক্তের দাগ দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আপনার ছুরিটাও ধার করে নিন এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আর আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলবেন। যদি আমার জামা তার কাছে নিয়ে যেতে চান তবে নিয়ে যাবেন। হয়তো এতে তিনি কিছুটা শান্তনা পাবেন। একমাত্র পুত্রের মুখে এসব কথা শুনে পিতার মানসিক অবস্থা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু ইব্রাহীম (আঃ) দৃঢ়তার অটল পাহাড় হয়ে জবাব দিলেন, হে বৎস! আল্লাহ পাকের নির্দেশ পালন করার ব্যাপারে তুমি আমার যথেষ্ট সহায়ক হয়েছো। অতঃপর তিনি পুত্রকে চুম্বন করলেন এবং অশ্র“পূর্ণ নেত্রে তাকে বেঁধে নিলেন। তারপর তিনি পুত্রকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় ছুরি চালাতে লাগলেন। কিন্তু বারবার ছুরি চালনা করা সত্ত্বেও তার গলা কাটছিল না। কেনান আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে ছুরির ধারে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করলেন। তবুও যখন ইব্রাহীম (আঃ) সজোরে ছুরি চালালেন, তখন আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে ডেকে বললেন, হে ইব্রাহীম! আপনি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছেন (সূরা সাফফাত-১০৫)। অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর পরিবর্তে বেহেশতী দুম্বা কুরবানীর ব্যব¯স্থা করে দিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালার বানীÑ “আমি জবেহ করার জন্য ইসমাঈলের পরিবর্তে এক মহান জীব দ্বারা বিনিময় দান করলাম।” (সূরা সাফফাতÑ১০৭)। বর্ণিত আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) উক্ত গায়েবী শব্দ শুনে উপরের দিকে তাকালেন এবং তিনি জিব্রাইল (আঃ) কে একটি দুম্বা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। উক্ত জান্নাতী দুম্বা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে দেয়া হলে, তিনি আল্লাহ পাকের নির্দেশে পুত্রের পরিবর্তে তা কুরবানী করেন। অতঃপর আল্লাহ পাক বলেনÑ “কুরবানীর এ রীতি আমি পরবর্তী সকলের জন্য কর্তব্য সাব্যস্ত করে দিলাম” (সূরা সাফফাতÑ১০৮)।
কুরবানীর আহকাম ঃ কুরবানীর আহকাম বলতে কুরবানীর বিধানকে বুঝায়। পার্থিব সকল সম্পর্ক শূণ্য করে অকুন্ঠ ও নির্ভেজাল আনুগত্যের ও তাকওয়ার মাধ্যমে কুরবানী করতে হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনÑ“আল্লাহ তা’য়ালার নিকট কুরবানীর গোশত ও রক্ত কিছুই পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু তোমাদের আনুগত্যের তাকওয়া ও পরহেযগারী।” (সূরা হজ¦Ñ৩৭)।
ঈদুল আযহা ও কুরবানীর দিনে করণীয় ঃ ঈদুল আযহা ও কুরবানীর দিনে সাধারণত তিনটি কাজ করা ওয়াজিব। প্রথমত : আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য জামাতের সাথে দু-রাকাত নামাজ আদায় করা (পুরুষের জন্য)। দ্বিতীয়ত : সামর্থ্যবান অর্থাৎ মালিকে নিসাব পূর্ণ ব্যক্তির জন্য কুরবানী করা। তৃতীয়ত: জিলহজ¦ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত ২৩ ওয়াক্ত নামাজে প্রতি ফরজ নামাজের পর একবার তাকবীরে তাশরীফ পাঠ করা।
কুরবানী কার উপর ওয়াজিব ঃ প্রতিটি সুস্থ্য মস্তিষ্ক, মুকিম প্রাপ্ত বয়স্ক মালেকে নিসাব অর্থাৎ খাওয়া-পরা, বাসস্থান এবং উপার্জনের উপকরণ ইত্যাদি ব্যতিত সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা এর সমতুল্য সম্পদের মালিক তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। উল্লেখ্য যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য মালের এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত। কিন্তু কুরবানীর ওয়াজিব হওয়ার কোন শর্ত নেই। তাই এ পরিমাণ মালের ঈদুল আযহার সময় তাৎক্ষণিক মালিক হলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। (শামী ৫:১৯৮ পৃষ্ঠা/ফাতাওয়া রশিদিয়া ৫৫৩ পৃষ্ঠা)।
কুরবানী সম্পর্কিত বিধান ঃ (১) কোন ব্যক্তির ওয়াজিব কুরবানী তার নির্দেশ ব্যতিত আদায় করলে ঐ ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না (শামী ৫:২৮৫)।
(০২) কুরবানীর জন্য পশু ক্রয় করা হয়েছে কিন্তু কুরবানীর পূর্বেই পশুটি মারা গেল, এমতাবস্থায় যদি ক্রেতা ধনী হয় তবে তার জন্য আরো একটি পশু ক্রয় করে কুরবানী করা জরুরী। আর যদি সে ব্যক্তি গরীব হয় তাহলে জরুরী নয় (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৪:৩২০/মাযমাউল আন হার ২:২৫০)।
(০৩) মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত করে থাকে যে, আমার মাল হতে আমার জন্য কুরবানী করবে, তখন তার রেখে যাওয়া মালের এক তৃতীয়াংশ হতে কুরবানী করা ওয়াজিব। আর উক্ত কুরবানীর সম্পূর্ণ গোশত গরীব মিসকিনদেরকে সদকা করে দিতে হবে (ফাতওয়া শামী ৫:২৯৪)।
(০৪) পক্ষান্তরে স্বীয় মাল দ্বারা নিজ নামে নফল কুরবানী করে তার সওয়াব এক বা একাধিক মৃত ব্যক্তির জন্য বকশিস করা জায়েয আছে। এরূপ কুরবানীর গোশত ধনী-গরীব সকলেই খেতে পারে (ফাতাওয়া রহীমিয়া ২:৮৬)।
(০৫) নাবালেক ছেলে মেয়েদের পক্ষ থেকে কুরবানী করা মুরব্বীদের জন্য ওয়াজিব নয় বরং মুস্তাহাব। নাবালেক ছেলে-মেয়ে মালদার হলেও তাদের সম্পদ হতে কুরবানী দেওয়া যাবে না (ফাতাওয়ে শামী)।
(০৬) শরীকদের প্রত্যেকেরই কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকতে হবে। কেউ যদি শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে শরীক হয় তাহলে কারো কুরবানী-ই দুরস্ত হবে না (ফাতওয়া শামী)।
(০৭) যে পশুর একটি পা নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে চলার সময় সেটা দ্বারা সাহায্য নিতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী দুরস্ত হবে না (ফাতওয়া শামী)।  
(০৮) শিংয়ের গোড়া দিয়ে ভেঙ্গে যদি ক্ষত মগজে পৌঁছে তাহলে কুরবানী হবে না (ফাতওয়া শামী)।
(০৯) কুরবানীর গোশত ও চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা নাজায়েজ। এমনকি অর্থ সদকা করার উদ্দেশ্যেও সেগুলো বিক্রি করা যাবে না (ফাতওয়া শামী)।
(১০) কান বা লেজের তিন ভাগের এক ভাগ এর বেশি কাটা গেলে তা দ্বারা কুরবানী হবে না (ফাতওয়া শামী)।
(১১) যে ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব তিনি নিজের কুরবানী না দিয়ে পিতা-মাতা বা অন্য কারো নামে কুরবানী করলে তার ওয়াজিব কুরবানী আদায় হবে না। তাই প্রথমে তার নিজের ওয়াজিব কুরবানী অবশ্যই করতে হবে, নিজের কুরবানী করার পর সামর্থ্য থাকলে মা-বাবা বা অন্য কারো জন্য কুরবানী করা যেতে পারে।
(১২) যার উপর পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয় তিনি যদি কুরবানীর নিয়তে পশু ক্রয় করেন তখন তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। 
(১৩) পরিবারের সদস্যরা যদি পৃথক উপার্জন করে সাহিবে নিসাব হলে সকলেরই কুরবানী করা ওয়াজিব।
(১৪) জন্মগতভাবে শিং নেই কিংবা শিং ওঠার পরে শিং ভেঙ্গে গেছে এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েজ আছে।
(১৫) জবাইকৃত পশুর প্রাণ বের হয়ে স্থির না হওয়া পর্যন্ত তার চামড়া ছাড়ানো উচিত নয়।
(১৬) পশু বানানোর পারিশ্রমিক হিসাবে গোশত দেয়া জায়েয নেই।
(১৭) যাকাত ও ফিতরার টাকার মতো কুরবানীর পশুর চামড়ার টাকা দিয়ে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণে ব্যয় করা জায়েজ নেই।
(১৮) কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয় স্বজন এবং এক ভাগ গরীব পাড়া প্রতিবেশী ও মিসকিনদেরকে দান করা মুস্তাহাব। তবে কোন কারণে এর ব্যতিক্রম করাও জায়েজ আছে।
(১৯) জিলহাজ¦ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত কুরবানী দাতার জন্য হাত পায়ের নখ ও শরীরে কোন চুল না কাটা কর্তব্য। 
পরিশেষে বলতে চাই শরীয়তের সকল বিধান মান্য করে আমরা যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে খালেস দিলে কুরবানী করতে পারি মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সকলকে সেই তাওফিক দান করুন। (আমিন ছুম্মা আমিন)
লেখক, ধর্মীয় আলোচক ও প্রভাষক মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ, শরণখোলা, বাগেরহাট


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯

ঐতিহ্যবাহী রান্না কড়াই গোস্ত

ঐতিহ্যবাহী রান্না কড়াই গোস্ত

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ









লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৫৩