খুলনা | শনিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ড. সাহিদা খানম | প্রকাশিত ১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯:০০

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদ-উল-আযহা বা ঈদ-উল-আজহা বা ঈদ-উল-আধহা। ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের সবচেয়ে বড় দু'টো ধর্মীয় উৎসবের দ্বিতীয়টি চলতি কথনে এই উৎসবটি কুরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এই উৎসবকে ঈদুজ্জোহাও বলা হয়। ঈদুল আযহা মূলত আরবী বাক্যাংশ। এর অর্থ হলো ‘ত্যাগের উৎসব’। এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল ত্যাগ করা। এ দিনটিতে মুসলমানেরা ফযরের নামাযের পর ঈদগাহে গিয়ে দুই রাক্বাত ঈদুল আযহা’র নামাজ আদায় করে ও অব্যবহিত পরে স্ব স্ব আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী ছাগল, ভেড়া ও মহিষ আল্লাহর নামে কোরবানি করে।
কোরবানির প্রচলন হয় আদি পিতা হজরত আদম (আঃ)-এর সময় থেকে। বিয়ে নিয়ে আদম (আঃ)- এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাঝে দ্বন্ধ হলে আল্লাহর ফয়সালার ব্যাপারে হজরত আদম (আঃ) তার দুই সন্তানকে আহ্বান জানান। আল্লাহতায়ালা দুই সন্তানকে কোরবানি করার নির্দেশ দিলে তারা দুই পাহাড়ের চূড়ায় নিজেদের কোরবানির বস্তু রেখে আসে। তখনকার নিয়মানুযায়ী যার কোরবানি কবুল হতো তার বস্তু আসমান থেকে আগুন এসে ঝলসে দিতো, ফলে তার কোরবানি কবুল হয়েছে বলে প্রমাণিত হতো। এভাবেই হাবিলের কোরবানি আগুন এসে ঝলসে দিলে তার কোরবানি আল্লাহ কবুল করেছেন বলে নির্ধারিত হয়। এটাই কোরবানির সূচনালগ্ন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘আর আপনি পাঠ করুন তাদের নিকট আদমের দুই সন্তানের ঘটনা যখন তারা দু’জন কোরবানি উপস্থিত করলো তখন আল্লাহ তাদের একজনের কোরবানি গ্রহণ করলেন এবং অপরটা গ্রহণ করলেন না’ (সূরা মায়িদা : ৩৪)।
ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, মহান আল্লাহ তা’আলা ইসলামের রাসুল হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে স্বপ্নযোগে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কুরবানি করার নির্দেশ দেন “তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি কর”। ইব্রাহীম স্বপ্নে এ আদেশ পেয়ে ১০টি উট কোরবানি করলেন। পুনরায় তিনি আবারো একই স্বপ্ন দেখলেন। অতঃপর ইব্রাহীম এবার ১০০টি উট কোরবানি করেন। এরপরেও তিনি একই স্বপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছে তো এ মুহূর্তে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আঃ) ছাড়া আর কোনো প্রিয় বস্তু নেই। তখন তিনি পুত্রকে কোরবানির উদ্দেশ্যে প্রস্তুতিসহ আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ সময় শয়তান আল্লাহর আদেশ পালন করা থেকে বিরত করার জন্য ইব্রাহীম ও তার পরিবারকে প্রলুব্ধ করেছিল, এবং ইব্রাহীম শয়তানকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছিলেন। শয়তানকে তার প্রত্যাখ্যানের কথা স্মরণে হজ্জের সময় শয়তানের অবস্থানের চিহ্ন স্বরূপ নির্মিত ৩টি স্তম্ভে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ করা হয়।
যখন ইব্রাহীম (আঃ) আরাফাত পর্বতের উপর তাঁর পুত্রকে কোরবানি দেয়ার জন্য গলদেশে ছুরি চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন যে তাঁর পুত্রের পরিবর্তে }}৪ পাতার ১ কলাম
একটি প্রাণী কোরবানি হয়েছে এবং তাঁর পুত্রের কোন ক্ষতি হয়নি। ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহ’র আদেশ পালন করার দ্বারা কঠিন পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ইব্রাহীম (আঃ) কে তার খলিল (বন্ধু) হিসাবে গ্রহণ করেন।
অতঃপর মানুষের জন্যে এ কোরবানির বিধান চালু হয়ে গেল। যা আজও মুসলিম সমাজে অত্যন্ত ভাব গাম্ভির্যের সঙ্গে পালন হয়ে আসছে। ত্যাগের সু-মহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের উপর পশু কোরবানি ওয়াজিব করে দিয়েছেন। উম্মতে মুহাম্মদির কোরবানি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর কোরবানিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইব্রাহীম (আঃ) এর গোটা জীবন ছিল কোরবানি তথা অতুলনীয় আতেœাৎসর্গ ও আতœত্যাগের মহিমায় উজ্জল। প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে কোরবানি করা ছিল ইব্রাহীম (আঃ) এর জীবনের অসংখ্য কোরবানির চরম ও শ্রেষ্টতম ঘটনা। তাদের স্মরণ পশু কোরবানির এ বিধান রোজ কেয়ামতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
হজরত ইবরাহিম (আঃ)-এর একটি মহান আদর্শ হলো- কোরবানি। যা আজও আমরা শ্রদ্ধাভরে পালন করে থাকি। সুতরাং কোরবানি করা এটা সুন্নতে ইবরাহিমি। হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানিকে আবশ্যক করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, ‘(হে নবী!) আপনি আপনার প্রভুর উদ্দেশে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ -সূরা আল কাউসার
কোরবানি যেহেতু মুসলিম জাতির একটি ঐতিহ্য। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সম্পর্কে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলের কতিপয় সাহাবা রাসূলকে জিজ্ঞাসা করলো “কোরবানি কী? ‘তিনি বললেন, তোমাদের পিতা ইবরাহিমের সুন্নত’। তারা বললো, ‘এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি। তারা বললো, ভেড়ারতো অসংখ্য পশম থাকে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হবে, যদি তা কোরবানি করে” –(ইবনে মাজাহ)
মানুষ আল্লাহকে কতটুকু ভালবাসে তার একটি পরীক্ষা হয়ে যায় এ কোরবানি দ্বারা। কারণ কোরবানির সূচনাই হয়েছে তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করে। হজরত ইবরাহিম (আঃ) তার সন্তানকে কোরবানি করতে আল্লাহ কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি বরং স্বপ্নের মাধ্যমে জানিয়েছেন। তিনি তাকওয়ার চরম শিখরে পৌঁছেছেন বলেই স্বীয় পুত্রকে কোরবানি করতে কোনো দ্বিধাবোধ করেননি।
এই ঘটনাকে স্মরণ করে সারা বিশ্বের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতি বছর এই দিবসটি উদযাপন করে। হিজরি বর্ষপঞ্জি হিসাবে জিলহজ্জ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ তারিখ পর্যন্ত ৩ দিন ধরে ঈদুল আজহার কুরবানী চলে। এবার আমাদের দেশে ১২ আগস্ট কোরবানীর ঈদ।
কোরবানি করার ফলে মানুষে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। কেননা মানুষ তার প্রিয়বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোরবানি করে থাকে। পরকালে এর সওয়াব পাবে এমন আশা থেকেই এ মহৎ কাজটি সম্পাদন করে থাকে। এক হাদিস থেকে জানা যায় যে, তিনি বলেছেন, হে মানুষ সকল! তোমরা ভালো ও ত্রুটিমুক্ত প্রাণী কোরবানি করো কেননা জান্নাতে যাওয়ার বাহন হবে এগুলো।
আর ঈদুল আযহার মূল আহ্বান হলো সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হতে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর মুহাব্বত সব কিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি আত্মসমর্পন করে দেয়াই হলো ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা।
মহান ত্যাগ আর কুরবানির মহিমায় ভাস্বর মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা আগামী ১২ আগষ্ট রোজ সোমবার। ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ থেকে আমরা এটাই শিক্ষা নিতে পারি, কুরবানির পশু কুরবানির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পশুত্বের কুরবানি করা। মানুষের ভেতরের অন্যায়-অবিচার, পাশবিকতা ও নিষ্ঠুরতার প্রবণতা মূলোৎপাদনে এই কুরবানি প্রতি বছর আমাদের দিয়ে যায় এক অসাধারণ শিক্ষা। এছাড়াও অভাগ্রস্থর সাহায্য, সহায়তা দান, সহমর্মিতা প্রদর্শন, পারস্পারিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা এবং  আল্লাহর রাস্তায় মানুষের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করা শেখায় প্রতিনিয়ত। ঊল্লেখ্য, যিনি যতো পরিমাণ সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করবেন তিনি আল্লাহর ততো নৈকট্য অর্জন করবেন। এই বিশেষায়িত শিক্ষা আমরা এই কুরবানি থেকে শিক্ষতে পাই। আর এসবের সমন্বয়েই মানবজীবনে প্রতিফলিত হয় আত্মশুদ্ধি ও ত্বাকওয়া। আমরা যদি অসহায়, নিরাশ্রয় ও অনাথ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদের আনন্দে শরীক করে নিতে পারি, তাহলে ঈদুল আযহার আনন্দ সত্যিকারভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠবে। পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে যাক-এটাই ঐকান্তিক কামনা।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও সাংবাদিক


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯

ঐতিহ্যবাহী রান্না কড়াই গোস্ত

ঐতিহ্যবাহী রান্না কড়াই গোস্ত

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ









লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৫৩