নগরীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সোর্সদের দৌরাত্ম চরমে : আতঙ্কে সাধারণ মানুষ


মহানগরীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কথিত সোর্সদের দৌরাত্মে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। নানা সময়ে এ সকল সোর্সদের টার্গেটে পড়ে সম্মানহানী শিকার হচ্ছে সরকারি, বেসরকারি চাকুরিজীবীসহ সাংবাদিকরা। অভিযোগ রয়েছে অধিদপ্তরের বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকের বড় একটি অংশ সোর্সদের মাধ্যমে আবারও মাদক স্পটগুলোতে চলে যায়। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন মাদকের স্পট ও মাদক বিক্রেতাদের সাথে সোর্সদের মাধ্যমে মাসোয়ারাও উত্তোলন করেন অসাধু কর্মকর্তারা। এ কারনে কথিত সোর্সদের কাছে নিজেদেরকে সপে রেখেছেন অধিদপ্তরের ওই সকল কর্তারা। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১ জুলাই রাত ৮টার দিকে অধিদপ্তরের কথিত সোর্সদের ইশারায় নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা এলাকায় ক্যাবল অপারেটর সুমন হাওলাদের বাড়িতে ৬/৭ জনের একটি দল প্রবেশ করে। এ সময় তারা বাড়ির নারী সদস্যদের সাথে অশালীন আচরণসহ নানা ধরনের ভয়ভীতিও দেখান। গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে এমন কথা বলে অসহায় এ পরিবারটির ঘরে তল্লাশীর নামে ব্যাপক অরাজকতাও করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে কোন ধরনের মাদকের আলাম না পেয়ে তারা চলে যান। এতে ওই পরিবারটিকে এলাকায় নানা প্রশ্নেরও সম্মুখিন হতে হয়েছে। ক্যাবল অপারেটর সুমন ওই এলাকার মুনসুর আলীর ছেলে। 
খুলনা জেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ এম হাবীবুর রহমান বলেন, গত বছরের শেষের দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৫/৬ জনের একটি দল ১৪, বাগমারা এলাকায় আমার বাড়িতে প্রবেশ করেন। অধিদপ্তরের পরিদর্শক আহসান হাবীব ওই অভিযানে নেতৃত্বে ছিলেন। সে সময় আমি খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারী শাখায় কর্মরত ছিলাম। মাদক অধিদপ্তরের সদস্যদের অশালীন আচরণ ও অরাজকতা দেখে আমার পরিবারের সদস্যরা হতভম্ব হয়ে পড়ে। আমি খবর পেয়ে বিষয়টি তাৎক্ষণিক তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল আহসান ও এডিএম স্যারকে অবগত করি। ওনারা এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ রাশেদুজ্জামানের নিকট জানতে চাইলে তারা সোর্সের ভুল তথ্য বলে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বিষয়টি নিয়ে আমার পরিবারসহ আমি অনেক কথার সম্মুখিন হয়েছি। পরবর্তীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সেই পরিদর্শক আমার কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করেন। 
তিনি আরও জানান, কথিত এসকল সোর্সদের কারনে সম্মানের সাথে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করেন এ সরকারি কর্মকর্তা। 
গত ১৩ মে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ৪৫, গগন বাবু রোডের মৃত সামছুল আলমের ছেলে মোঃ আরিফুল আলমকে বাসা থেকে তুলে নেয় অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মোসাদ্দেক হোসেনসহ ৪/৫ জনের একটি দল। পরে রূপসাস্থ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে নিয়ে তার স্ত্রী দুলু বেগমকে ফোনে জানানো হয় আপনার স্বামীকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে। এ সময় উপ-পরিদর্শক মোসাদ্দেক হোসেন ও এএসআই জাহানারা খাতুন তার কাছে মোটা অংকের ঘুষ দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে না পারায় সেদিনই তার স্বামীকে ১০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে সদর থানায় মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয় (নং-২৩)। এরপর তার স্বামী দু’মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন। 
এদিকে ঘটনার বিবরণ জানিয়ে খুলনা জেলা প্রশাসকের নিকট প্রতিকার চেয়ে গতকাল সোমবার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী আরিফুলের স্ত্রী দুলু বেগম (সিরিয়াল নং-৬৬৩)। 
সর্বশেষ অভিযান চালিয়েছে নগরীর ৮৩, মুসলমানপাড়া এলাকায় বাসিন্দা ও খুলনা প্রেস ক্লাবের সহকারী সম্পাদক (ক্রীড়া) এম এ জলিলের বাসভবনে। সর্বশেষ ৭ জুলাই সকালে কথিত সোর্সদের তথ্যমতে তার বাসায় অভিযান চালায় মাদক অধিদপ্তর। অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক পারভীন আক্তার। এ সময় তার সাথে ছিলেন অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মোঃ মোসাদ্দেক হোসেন, সিপাই মোঃ জিল্লুর রহমান, মোঃ রুবেল হোসেন, মোঃ বোরহানুর রহমান মৃধা। তাদের মধ্যে দু’জন এম এ জলিলের বাড়ির দেয়াল টপকে ছাদে গিয়ে অভিযানের নামে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। এর কিছুক্ষণ পর এম এ জলিলের বাড়ির পাশের ড্রেন থেকে ১০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করে তাকে মামলায় আসামি করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। 
এ বিষয়ে এম এ জলিলের স্ত্রী রুনা বেগম বলেন, কিছুদিন আগে মাদক অধিদপ্তরের সোর্স টুটুলের বিরুদ্ধে পত্রিকায় রিপোর্ট হওয়ার জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করছি। আমার স্বামী জীবনে ধূমপান পর্যন্ত করেনি। বাড়ির পাশের ড্রেনে মাদক রেখে উদ্ধারের নামে তারা আমার স্বামীকে সমাজে হেয় করেছে। এ ধরনের ষড়যন্ত্রের বিচার চাই।  
এ বিষয়ে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ রাশেদুজ্জামান বলেন, অভিযোগটি আমাদের হাতে আসেনি। জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অভিযোগটি আমাদের কাছে প্রেরণ করা হলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
র‌্যাব-৬’র স্পেশাল কোম্পানি কামন্ডার মেজর শামীম সরকার বলেন, সোর্সরা সাধারণত কাজ করলে নির্দিষ্ট অর্থ পায়। তাছাড়া তাদেরকে সোর্স হিসেবে সাধারণ মানুষের চেনার কথা না। সোর্সদের মধ্যে কেউ যদি মাদক বিক্রির সাথে জড়িত থাকে বা মাদক বিক্রেতাদের সাথে সখ্যতা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে বলেও জানান তিনি।     
কেএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার সরদার রকিবুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করেই কেএমপি কাজ করছে। কোন সোর্স মাদকের বিক্রি বা ভয়ভীতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানী করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।