খুলনা | বুধবার | ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬ |

হাসপাতাল-ক্লিনিকে প্রয়োজনীয়  চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করুন

২৯ জুন, ২০১৯ ০০:০০:০০

হাসপাতাল-ক্লিনিকে প্রয়োজনীয়  চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করুন

খুলনার টুটপাড়া এলাকায় ন্যাশনাল হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি চিকিৎসক ছাড়াই রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নানা অব্যবস্থাপনার কারনে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালককে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।  চিকিৎসা সেবায় অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারনে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের নিজস্ব ফার্মেসী থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও অপারেশন কক্ষে অবৈধ প্যাথেডিন জব্দ করা হয়। এছাড়া অনুমোদনহীন শয্যা তৈরি করে হসপিটালটিতে রোগি ভর্তি রাখা হচ্ছে। গ্রামাঞ্চল থেকে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসা অসহায় মানুষকে ভুল বুঝিয়ে এক শ্রেণীর দালাল এ সকল নিম্নমানের হাসপাতালে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সর্বস্ব হারিয়ে অনেকে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়ছেন।  
দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয়খাতের হাসপাতালগুলোর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। দু-চারটি হাসপাতালের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই রকম। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসুস্থ অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর জীবন নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। রোগীকে জিম্মি করে যত রকম কায়দা-কানুন করে বিরাট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া যায় সেটাই হল প্রধান উদ্দেশ্য। রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করতে রাজি হয়। ডাক্তার আছে তো নার্স নেই আবার নার্স পাওয়া গেল তো ডাক্তার নেই। সরকারি হাসপাতালে রোগীকে স্ট্রেচারে তোলার সঙ্গে সঙ্গে ১২০ টাকা দিতে হয়।  টাকা না দিতে পারলে রোগীকে ফ্লোরেই পড়ে থাকতে হয়। রোগীর ব্যবহারের জন্য বাথরুমের করুণ দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। যত্রতত্র ময়লা পড়ে আছে। আমাদের প্রশ্ন, একজন মানুষ সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে যায়, নাকি আরও অসুস্থ হওয়ার জন্য? বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনো নিয়মনীতি মেনে চলছে কিনা বোঝার উপায় নেই। স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই যদি হয় উন্নতি তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হলেও এর কোনো প্রয়োজন আছে কি? কাদের জন্য এ প্রবৃদ্ধি বা এ প্রবৃদ্ধির সুফল কারা ভোগ করছে? জনসাধারণের জীবন মান উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন। মানুষ যদি সুচিকিৎসা না পায়, কর্মমুখী প্রকৃত শিক্ষা না পায় তাহলে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কীভাবে বুঝব? বেসরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ নার্স অদক্ষ। কম বেতনে অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ নার্স, ব্রাদার রাখা হয়েছে। যাদের অনেকেই বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে অক্ষম। এছাড়া একজন রোগীর ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন অন্য রোগীর ফাইলে রেখে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ডাক্তার-নার্সদের অবহেলা, দুর্ব্যবহার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাব দেখানো এসব আর নাইবা বললাম। ডাক্তারদের অদক্ষতার কারণে ভুল চিকিৎসা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীর শরীরে পুশ করে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হচ্ছে তার হিসাব কে রাখে? সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকদের বড় অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে ডাক্তারের খোঁজ করতে করতে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে।
সম্প্রতি  বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবি এক  গবেষণায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ৬২ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। অন্যদিকে সরকারি খাতের ৮০ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৩১টি শর্ত পূরণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব ঘটছে কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও উপকরণ ছাড়াই আইসিইউতে রোগী রেখে উচ্চ হারে ফি আদায় করছে। এমনকি রোগী মারা গেলেও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হচ্ছে। এক কথায় প্রকৃত সেবা কোথায় পাওয়া যাবে আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। সরকারি ওষুধ হাসপাতালে ভর্তি রোগী পায় না কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আমরা মনে করি, সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি এসব হয়রানি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ