খুলনা | সোমবার | ২১ অক্টোবর ২০১৯ | ৬ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

কারাগারেই জানাজা : গোসল দিয়েছে ছেলে মুরসি একজন শহিদ : এরদোয়ান ফিলিস্তিনে ৩ দিনের শোক

নিজ শহরে অনুমতি মেলেনি, নীরবে কঠোর গোপনীয়তায় কায়রোতে সমাহিত মুরসি

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৯ জুন, ২০১৯ ০১:১৩:০০

রাতভর কড়া নিরাপত্তা শেষে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুৎ মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে গোপনীয়তায় রাজধানী পূর্ব কায়রোতে দাফন করা হয়েছে। কায়রোতে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই সাবেক এ মুসলিম ব্রাদারহুড নেতার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে তার দাফনের আবেদন জানালে তা নাকচ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে কায়রোর নসর এলাকায় গোপনীয় ওই দাফনে মুরসির পরিবারের সদস্যদের উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। মুরসির ছেলে আহমেদ মুরসি এবং তার আইজীবীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মুরসির ছেলে আহমাদ মুরসি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা নিজেরাই কারা হাসপাতালে তাঁর মৃতদেহের গোসল দিয়েছি এবং সেখানেই জানাজা পড়েছি।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া খবরে বলা হচ্ছে, মুরসির ভাই, স্ত্রী, পুত্র এবং দু’জন আইনজীবী তার জানাজায় অংশ নেন। এরপর কারা হাসপাতালে জানাজা শেষে কায়রোতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন মিসরের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। তবে আনাদোলু এজেন্সির পক্ষ থেকে এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কায়রোর শারকিইয়া এলাকার কারাগারে যেখানে মুরসিকে রাখা হয়েছিল, সোমবার রাতে সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, কারা চত্বরে রাতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে কায়রো শহরের অন্য এলাকাগুলো শান্ত ছিল।
মঙ্গলবার দেশটির নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমেও খবরটিকে কম গুরুত্বের ছেপেছে। শুধু দৈনিক আল-মাসরি আল-ইয়াওম খবরটিকে তাদের প্রথম পাতায় জায়গা দিয়েছে। অন্য সব দৈনিক ভেতরের পাতায় এবং ছোট আকার মুরসির মৃত্যু সংবাদ ছেপেছে। সেসব খবরের কোনোটিতে মুরসি যে প্রেসিডেন্ট ছিলেন তা উল্লে¬খ করা হয়নি।
এর আগে সোমবার এক মামলার শুনানিতে আদালত কক্ষেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অচেতন হওয়ার পর মারা যান ৬৭ বছর বয়সী এ সাবেক প্রেসিডেন্ট। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, ‘আদালতের এজলাসে হঠাৎ পড়ে গিয়ে’ তার মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ মে তিনি আদালতে বলেছিলেন, তার জীবন হুমকির মুখে।
মুসলিম ব্রাদারহুড এই মৃত্যুকে ‘নিশ্চিত হত্যা’ আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ‘ ব্রাদারহুড নেতা মুরসি শহিদ হয়েছেন।’ ধারণা করা হচ্ছে, মুরসি এমন মৃত্যুতে মিসরীয় সরকারের ওপর মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে। বিশেষ করে হাজার হাজার ইসলামপন্থী এবং আন্দোলনকারী কারাগারে রয়েছেন তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের বিষয়ে।
এদিকে মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। সোমবার ইস্তানবুল থেকে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, জালিমের কারাগারে শহিদ হয়েছেন মুরসি। কারাগারে নিক্ষেপ করে যারা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে সেই জালিমদের ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না।
এরদোয়ান বলেন, আমাদের চোখে মুরসি একজন শহিদ; যিনি তার বিশ্বাসের জন্য জীবন দিয়েছেন। ইতিহাস সেই একনায়ককে (জেনারেল সিসি) ক্ষমা করবে না, যে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে নির্যাতন করেছে এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার যাবতীয় চক্রান্ত করা হয়েছিল। আদালতে নিজের ওপর জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন তিনি। মিসরের জনগণ ও নিজের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মুরসির এ মৃত্যু জুলুমের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সূত্র: চ্যানেল নিউজ এশিয়া, আনাদোলু এজেন্সি।
তুরস্কে গায়েবানা জানাজা: তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুসরির গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব গায়েবানা জানাজায় হাজার হাজার মানুষের জনসমাগম ঘটে। তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক দপ্তরের পক্ষ থেকে তুরস্কের ৮৪টি প্রদেশের সকল মসজিদে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।
ইস্তাম্বুলের ফেইত মসজিদের মুরসির গায়েবানা জানাজায় হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। এছাড়া আঙ্কারায় অবস্থিত মিসরের দূতাবাসের বাইরে শত শত তুর্কি মুরসির মৃত্যুতে বিক্ষোভ করেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানও একটি জানাজায় শরিক ছিলেন বলে জানিয়েছেন। এরদোগান বলেন, মুরসি গণতন্ত্রের জন্য শহিদ হয়েছেন। ইতিহাস তাকে কখনো ভুলে যাবে না।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে মুরসি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ছিলেন। ৬৬ বছর বয়সী মুরসি ডায়াবেটিস, লিভার ও কিডনিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। ১৯৫১ সালে আল-আদওয়াহ গ্রামে জন্ম নেওয়া মুরসি গত শতকের ৭০-এর দশকে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক করেন। পরে পিএইচডি করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান।
মিসরের প্রথম অবাধ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ব্রাদারহুডের মুরসি। কিন্তু ২০১৩ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুৎ করে মিসরীয় সেনাবাহিনী। প্রেসিডেন্টের মসনদে বসেন মুরসির হাতে সেনাপ্রধান হওয়া আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। সেই বছরই মুরসির নেতৃত্বাধীন মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন অভিযোগে অনেককে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। মুরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি অর্থের বিনিময়ে কাতারের কাছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার করেছেন।
২০১৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের জুন মাসে তথ্য পাচারের এ মামলায় তাকে নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত দেশের গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের অভিযোগে মুরসিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
ফিলিস্তিনে ৩ দিনের শোক : আদালতের এজলাসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ মুরসির আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত গোটা মুসলিম বিশ্ব। ফিলিস্তিনের প্রতি ভিন্নরকম টান ছিল মোহাম্মদ মুরসির। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সব সময় সোচ্চার ছিলেন মিসরের সাবেক এ প্রেসিডেন্ট। তাই মুরসির মৃত্যুতে স্বভাবতই ফিলিস্তিনবাসী বেশি শোকাহত। ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে সোমবার রাতেই মোহাম্মদ মুরসির গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজা আল-আন অনলাইনের খবরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
ইতিমধ্যে গাজা উপত্যকা ও ফিলিস্তিনি ইস্যুতে মুরসির অবস্থানের কথা স্মরণ করে একটি বিবৃতি দিয়েছে প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। গাজা শাসন করা সংগঠনটির সোমবারের বিবৃতিতে উপত্যকাটির এক দশকের অবরোধ তুলে নিতে মুরসির অবস্মরণীয় ও সাহসী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন মুরসির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









‘ভারতের অর্থনীতি সংকটে’

‘ভারতের অর্থনীতি সংকটে’

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০





ব্রেকিং নিউজ