খুলনা | বুধবার | ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

থানা থেকে আদালত কখনোই ছিল না হাতে হাতকড়া

আলোচিত ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে অভিযোগ গঠন ৩০ জুন

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৮ জুন, ২০১৯ ১৩:০৯:০০

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে অভিযোগ তদান্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দেওয়া প্রতিবেদনকে অভিযোগপত্র হিসেবে নিয়ে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য ৩০ জুন দিন ঠিক করে দেন আদালত।
সোমবার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন। দুপুর সোয়া ২টার দিকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে কড়া পুলিশি পাহাড়ায় আদালতে নিয়ে আসা হয়। এর পরই তাঁর পক্ষে আইনজীবী মাসুমা আক্তার জামিনের আবেদন করেন।
জামিন আবেদনের শুনানির প্রথমে বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা জামিনের আবেদন বাদীকে অথবা বাদীপক্ষের আইনজীবীকে দেখিয়েছেন কি না? যেহেতু এটা নালিশি মামলা তাই বাদীর অথবা বাদীপক্ষের আইনজীবীকে দেখাতে হবে এবং আবেদনে ‘দেখিলাম’ লিখতে হবে।
এরপরই আইনজীবীরা মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়্যেদুল হক সুমনকে জামিনের আবেদনটি দেখান। তখন ব্যারিস্টার সুমন জামিনের আবেদনে ‘দেখিলাম’ মর্মে লিখেন। এর পরই বিচারক জামিন শুনানি শুরু করতে বলেন।
এর আগে আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা সোনাগাজী থানায় পাঠানো হয়েছিল বলে সেখান থেকে পুলিশের একটি দল ঢাকায় এসে সোমবার সকালে পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের দায়িত্ব বুঝে নেন। দুপুরে একটি প্রিজন ভ্যানে করে তাকে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় নেওয়া হয়। বাদামি রঙের টি শার্ট ও কালো চশমা পরা মোয়াজ্জেমকে দুপুর সোয়া ২টার পর আদালত কক্ষে নেওয়া হলে প্রথমে তাকে কাঠগড়ার বাইরে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায়। ওসি মোয়াজ্জেম আদালতে প্রবেশের পর তাঁর চোখে সানগ্লাস ছিল। আদালতের সাধারণ আইনজীবীরা ও বিচারপ্রার্থীরা তাঁর চোখ থেকে সানগ্লাস খোলার জন্য ও হাতে হাতকড়া পরানোর জন্য হৈ চৈ শুরু করেন। এরপর আদালত পুলিশ ওসি মোয়াজ্জেমের চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ফেলেন এবং হাতকড়া পরান। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে জামিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানির শুরুতে ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়্যেদুল হক সুমন আদালতকে বলেন, মাননীয় আদালত আপনি ২০ দিন আগে গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় পাঠান। একটা দীর্ঘ তদন্ত শেষে আপনি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানা পাঠানোর ২০ দিন পরে তিনি (ওসি মোয়াজ্জেম) পুলিশ দ্বারা ধৃত হন। আমি ওই মূল মামলায় যাওয়ার আগে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে আরো দু’টি অভিযোগ করতে চাই। তা হলো উনি (ওসি মোয়াজ্জেম) পুলিশের লোক হয়েও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি নির্দোষ হলে আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করতেন। সাধারণ একজন পাবলিক ভয় পেয়ে যেভাবে পালিয়ে যান, তিনি তা করেছেন। উনি আইনের লোক হয়েও গ্রেফতারি পরোয়ানার কথা শুনে ২০ দিন ধরে পলাতক ছিলেন।
শুনানিতে ব্যারিস্টার সুমন বলেন, এটা পুরো পুলিশ বিভাগের জন্য কলঙ্ক। উনার যদি সত্যিকার অর্থে মনে কোনো দুই নম্বরি না থাকত, তাহলে তিনি আত্মসমর্পণ করতেন। ক্রিমিনাল মামলার অর্থ হলো কোনো ব্যক্তিকে সংশোধন করা, আর উনার মামলার বিষয় হলো কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাহিনীকে সংশোধন করা। এবার সব কিছু আমলে নিয়ে বিজ্ঞ বিচারক আপনি যে সিদ্ধান্ত নিবেন তা আমরা মাথা পেতে নেব।
অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম শুনানিতে বলেন, এ মামলার আসামি ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিহত নুসরাতের ভিডিও প্রচার করেছেন। এতে মানহানি হয়েছে এবং সামাজিকভাবে ভিকটিম নুসরাত হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। বাদীপক্ষে আমাদের আবেদন আসামির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করা হোক।
এরপরই ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে তাঁর আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ শুনানিতে বলেন, আসামি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে। আসামি আইনের আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে যাওয়ার পথে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু বলা হচ্ছে, বাইরে থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন আইনের সেবক হয়ে, আসামি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আত্মসমর্পণ করতে এসেছেন। কিন্তু আসামিকে আত্মসমর্পণের সুযোগ না দিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করে আসামিকে নিয়ে আসছে।
আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, হাইকোর্টে আসামির টেন্ডার নম্বর আছে। আসামি তাঁর আইনজীবী দিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে এফিডেভিট করে মামলা জমা দিয়েছেন। যা শুনানির জন্য আছে। আসামি যাচ্ছেন, শুনানি হবে, তখনই গ্রেফতার করা হয়েছে। সবাই বলে আমি (ওসি মোয়াজ্জেম) পলাতক ছিলাম।
তখন বিচারক আইনজীবীকে প্রশ্ন করেন, সবাই মানে? আইনজীবী ফারুক বলেন, অনেকে বলে পলাতক ছিলাম। বিজ্ঞ আদালত, আমি পলাতক ছিলাম না। আমি জানতে পেরেছি আমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত, বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে একটাই আছে। আমি আত্মসমর্পণ করার জন্য সিকিউরিটি পাই নাই। আমার সিকিউরিটির সমস্যা। আমি যখন বাইরে বের হই তখন আমাকে পাবলিক ধরে, নানা লোকজন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সাংবাদিক মিডিয়ার সামনে ফেইস করতে হয়।  এজন্য বিজ্ঞ আদালত আমি আপনার সামনে আসতে পারি নাই, আপনার আদালতে আসতে পারি নাই। তাই আমি আইনের সেবক হয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে আত্মসমর্পণ করতে গিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, আমি ভিডিও শেয়ার করেছি। কিন্তু মাননীয় আদালত, আমি এটা স্টেটমেন্ট হিসেবে নিয়েছি। আমি এটা রেকর্ড করেছি, এটা শেয়ার হয়েছে অন্য জায়গা থেকে।
ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী বলেন, আমি যেটা বলতে চাই, এ ভিডিও রেকর্ডিং কেন করা হয়েছে? অনেক সময় দেখা যায়, বাদী অথবা ভিকটিম এজাহার থানায় এসে ঠিকই দায়ের করে, তখন তারা আপস করে ফেলে অথবা সরে আসার চেষ্টা করে। এখন বাদী রাগের বশে মামলাটি করল কি না-এ বিষয়ে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
তখন বিচারক বলেন, আপনি কি তাহলে স্বীকার করে নিলেন, ভিডিও আপনি করেছেন?
তখন আইনজীবী বলেন, না। ভিডিও রেকর্ডের কথা আরজিতে বলা আছে। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমাকে জামিন দেন, পলাতক হব না।
শুনানি শেষে বিচারক জামিনের আবেদন খারিজের আদেশ দেন। এরপর আবারও কড়া পাহাড়ায় ওসি মোয়াজ্জেমকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর আগে সাইবার ট্রাইব্যুনাল পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর রবিবার বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর হাইকোর্ট এলাকা থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগরের শাহবাগ থানা পুলিশ। এরপর ফেনীর সোনাগাজী থানাকে অবহিত করে তারা। প্রায় তিন সপ্তাহ লাপাত্তা থাকার পর আগাম জামিন চাইতে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন তিনি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় দায়ের করা এ মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে পুলিশ পরিদর্শক মোয়াজ্জেমের সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। 
প্রসঙ্গত ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত গত মার্চ মাসে তার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করলে ওসি মোয়াজ্জেম তাকে থানায় ডেকে জবানবন্দী নিয়েছিলেন। তার কয়েক দিনের মাথায় নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করা হলে সারাদেশে আলোচনা শুরুর হয়। তখন ওই জবানবন্দীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত। গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেমকে আসামি করে ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন আইনজীবী সুমন।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ





এইচএসসি’র ফল  প্রকাশ আজ

এইচএসসি’র ফল  প্রকাশ আজ

১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:৪২









ব্রেকিং নিউজ