খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম মডেল

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী | প্রকাশিত ০৪ জুন, ২০১৯ ০০:১০:০০

শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম মডেল

ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি সার্বিক বিষয়েই মহানবী (সাঃ) আমাদের আদর্শ বা মডেল। তার জীবনের সর্বত্রই রয়েছে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় অনুপম আদর্শ। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ (সূরা আহযাব: ২১)। অন্য জায়গায় আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ইন্নাকা লাআলা খুলুক্বিন আজিম, অর্থাৎ নিশ্চয়ই আপনি মহান ও উন্নত চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত (সূরা কলম: ৪)। খোঁজ নিলে দেখা যাবে বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক মানুষই তার জীবনে কোন না কোন মানুষকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে। এখানে একটা ছোট্ট প্রশ্ন, মহানবী (সাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে এমন একটি মানুষও কি কেউ দেখাতে পারবেন যিনি জীবন চলার সব বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জন করেছেন অথবা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন?  এর উত্তর কেউই দিতে পারবেন না। কারণ, কোন মানুষই আজ পর্যন্ত নিজেকে সার্বিক বিষয়ে মডেল বা আদর্শ দাবি করতে সক্ষম হননি। অথচ মহান আল্লাহ তায়াল্ইা তাকে মডেল বা আদর্শ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পেশ করেছেন। আর তিনি কেয়ামত পর্যন্ত সমগ মানুুষের জন্য মডেল বা অনুকরণীয় নমুনা। জীবনের এমন কোন দিক নেই যে বিষয়ে তিনি দিক নির্দেশনা দেননি। হাতের নখ কাটা, মাথার চুল কাটা থেকে রাষ্ট্র চালানো পর্যন্ত সব বিষয়েই তিনি শুধু দিক নির্দেশনা দেননি, বরং তিনি তার জীবদ্দশায় তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। 
শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা কি হবে সেটাও আল্লার রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে শিখায়ে গেছেন। পবিত্র কোরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে পরিস্কার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি যদি কোন অমুসলিমের প্রতি জুুলুম করা হয়, তাহলে স্বয়ং রহমাতুল্লিল আলামীন হুজুর (সাঃ) জালেমদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবেন বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর স্পষ্ট হুকুম হলো, তোমরা শ্রমিকের মজুরি দিয়ে দাও তার গায়ের ঘাঁম শুকানোর আগেই (ইবনে মাজাহ)। আর আমাদের মালিকরা কি করেন? ন্যায্য মজুরি পেতেও শ্রমিকদের গলদঘর্ম হতে হয়। 
সূরা আরাফে মহান আল্লাহ পাক মাদইয়ান বাসীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন; তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদেও দ্রব্যাদি কম দিয়ো না এবং ভূপৃষ্টে সংস্কার সাধনের পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এটা হলো তোমাদেও জন্য কল্যাণ যদি তোমরা বিশ্বাসী হও (সূরা আরাফ:৮৫)। আর আমাদের উদ্দেশ্যে সারা জাহানের বাদশাহ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন:
যারা মাপে কম করে তাদের জন্য দুর্ভোগ; যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করেনা যে, তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। সেই মহাদিবসে; যে দিন মানুষ দাড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে (সূরা আত-তাতফিফ: ১-৬)। 
এই আয়াতগুলো থেকে তাফসিরবিশারদগণ এই ব্যাখা করেছেন যে, যারা কর্মচারী বা শ্রমিকদের কাছ থেকে কাজ বেশী নেয়, কিন্তু মজুরি দেবার সময় কম দেয় তারাও এই আয়াতে উল্লেখিত ধমকির আওতায় আসবে। অর্থাত ওই সমস্ত মালিদেরকে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত অপছন্দ করেন যারা তাদের অধীনস্থ কর্মচারী, শ্রমিক, বা কাজের লোকদেরকে তাদের ন্যয্য মজুরি দেয় না।
শুধু শ্রমিক নয়, আমাদের অধীনস্থ কাজের লোক, কাজের মেয়ে, কর্মচারী, খাদেম তাদের  ব্যাপারেও ইসলাম আমাদের উত্তম ব্যবহার শিক্ষা দিয়েছে। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আমার ৮ বছর বয়স থেকে দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ মহানবী (সাঃ)-এর খেদমত করেছি। এর মধ্যে আমি অনেক অন্যায় করেছি। কিন্তু দয়ার নবী কোন দিন এ কথা বলেননি, এ কাজ তুমি কেন করেছো অথবা একাজ তুমি কেন করোনি? তার পবিত্র বাণী বা হাদিস আজও আমাদের হৃদয়কে আন্দোলিত না করে পারে না। 
এক হাদিসে বিশ্বনবী (সাঃ) এরশাদ করেন: কিয়ামতের দিন আমি তিন শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবো। তার মধ্যে একশ্রেণী হলো তারা, যারা তাদের শ্রমিকদেরকে কাজ সম্পন্ন করার পরও ন্যয্য পাওনা দেয় না (বুখারি)। 
মানবতার মূর্ত প্রতিক, সর্বযুগের, সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ মহা মানব হুজুর (সাঃ) হতদরীদ্র ও নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতি উৎসাহ প্রদান করতে গিয়ে এরশাদ করেন, যদি কোন ব্যক্তি কোন বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ বস্ত্র পরাবেন। যদি কেউ কোন ক্ষুধার্তকে খানা খাওয়ায় আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যদি কেউ কোন পিপাসিতকে পানি পান করাবে মহান আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতের মোহরযুক্ত পানীয় পান করাবেন (আবু দাউদ, তিরমিজী)। এটাই ইসলাম। এটাই নবীর শিক্ষা। এভাবেই কায়েম হতে পারে সমাজে শান্তি। অন্য কোন মতাদর্শে শান্তি আসতেই পারে না। 
মহানবীর (সাঃ) জীবনের শেষ কথা ছিল এরকম: নামাজ, নামাজ। আর তোমাদের অধীনস্থদের (চাকর-নকর, কর্মচারী, খাদেম, কাজের লোক ইত্যাদি) ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো (আবু দাউদ)।
হযরত আবু মাসউদ (রাঃ) বলেন, একদা আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করিতেছিলাম, এমন সময় আমার পিছন দিক থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, হে আবু মাসউদ! নিশ্চয়ই তার ওপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা আছে আল্লাহ তোমার ওপর তার চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান। আমি ফিরে তাকায়ে দেখি রসুলুল্লাহ (সাঃ) কথা বলছেন। বললাম, ইয়া রসুলাল্লাহ (সাঃ), আল্লা’র ওয়াস্তে আমি তাকে আজাদ বা মুক্ত করে দিলাম। এতে রসুলুল্লাহ (সাঃ) ফরমাইলেন: যদি তুমি এটা না করতে তাহলে দোযখ তোমাকে অবশ্যই স্পর্শ করতো অথবা দোযখ তোমাকে অবশ্যই গ্রাস করতো (বুখারি: আদাবুল মুফরাদ)। 
দয়ার নবী (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের চাকর-নকর ও অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনে রেখেছেন। সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাই খাওয়াবে যা তোমরা খাও; তাদেরকে তাই পরাবে যা তোমরা পরিধান করো। তাদেরকে তোমরা সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাবে না। তবে যদি তা করো, তাহলে তার কাজে তুমিও সাহায্য করবে (বুখারী)। আমরা এবার আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েদের কথা একটু খেয়াল করি। তাদের সাথে আমরা কিরূপ আচরণ করি এবং তাদের দিয়ে কিভাবে কাজ করায়ে নিই। ইসলামের পরিস্কার বিধান হলো, তাদের সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপাবে এবং তাদের হকের  দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এক ব্যক্তি এসে বললো, ইয়া রসুলাল্লাহ (সাঃ) আমরা আমাদের গোলাম বা কাজের লোকদেরকে কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, দিনে সত্তরবার (আল হাদিস)। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। তাই আসুন আমরা আজ থেকে শপথ নিই, আমরা আমাদের বাকি জীবনটুকু ইসলামের আদর্শ মোতাবেক চালাবো এবং আমাদের  অধীনস্থ চাকর-নকর, কর্মচারী, কাজের লোক, কাজের মেয়ে ও খাদেমদের ব্যাপারে ইসলাম যে মহান শিক্ষা দিয়েছে তা মেনে চলবো।
(লেখক: অধ্যাপক, ফিশারিজ এন্ড মেরিণ রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।) 
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ







উৎসব মুখর পরিবেশে আ’লীগের সম্মেলন

উৎসব মুখর পরিবেশে আ’লীগের সম্মেলন

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:২৮




কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ

কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:২২