খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

একটি সাধারণ গল্প

এম. রুবাইয়াৎ আল আজাদ | প্রকাশিত ০৪ জুন, ২০১৯ ০০:১০:০০

একটি সাধারণ গল্প

মাস শেষ হতে দিন দশেক বাকি। মফিজ তার ভাঙা চৌকিতে শুয়ে উপরের টিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। গত মাস থেকে গার্মেন্টস বন্ধ। বেতন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে গোলমাল করেছিল শ্রমিকরা। মালিকপক্ষ দাবি তো মানেইনি উপরন্তু কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। দু’মাসের ঘর ভাড়া বাকি। তার চেয়ে বড় বিপদ সামনে ঈদ। কখনও কখনও উৎসব ও বিপদের কারণ হয়। একমাত্র ঈদের সময় সে গ্রামে যায়। বিধাব মা আর দু’টো ভাই বোন তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। বছরে ঐ একটা দিনই একটু ভালো খাবার, নতুন জামা কাপড় পরে, ওরা একটু আনন্দ করতে পারে। কিন্তু এবার যে অবস্থা তাতে হয়তো তার আর গ্রামে যাওয়া হবে না। হাতে কোন টাকাই নাই। জমানো টাকাও গত মাসে অসুখ বাধিয়ে প্রায় শেষ করে ফেলেছে। কি হবে কিছুই বুঝতে পারছে না। সব রাগ হচ্ছে ঐ শ্রমিক নেতাগুলোর উপর। ঈদের আগে বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে গোলমাল সৃষ্টি করল। লাভ তো কিছুই হল না, আগে তবুও মাস শেষে কিছু পেত আর এখন তো কিছুই জুটছে না। বড়লোক মালিকদের কারখানা বন্ধ রাখলে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু তাদের মত গরীবের জন্য একমাস বেতন না পাওয়া কত কষ্টের তা কেউ বুঝতে চায় না। মফিজ পাশ ফিরে শোয়। ছোট ঘরটাতে মফিজের সাথে বাদল ভাইও থাকে। পাশের ঘরটাতে থাকে জরী আর তার পঙ্গু বাবা, তার পরের ঘরটায় সামাদ ভাই আর রোজিনা ভাবী। ওরা সবাই বিভিন্ন কারখানায় কাজ করে। এ বস্তির বেশিরভাগই গার্মেন্টস কর্মী। দুপুরের পর একটু তন্দ্রা এসেছিল মফিজের। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো বাদল ভাই।
বাদল ভাই এসেই বলল তুই এখনো শুয়ে আছিস! সবাই কারখানার সামনে জড়ো হয়েছে। সবাই শ্লোগান দিচ্ছে কারখানা খুলতে হবে, বেতন বোনাস দিতে হবে। 
মফিজ উঠে বসে। 
ঘামে ভেজা চপচপে জামাটা পাল্টিয়ে বাদল ভাই বলে চল চল। 
সত্যি কারখানা খুলবে- মফিজ বোকার মত জিজ্ঞাসা করে। 
আরে জরীদের কারখানা সকালে খুলেছে। তুই তো কোন খবরই রাখিস না বলেই বাদল বেরিয়ে যায়। 
মফিজ যেন একটু আশার আলো দেখতে পায়। সে খুবই সাধারণ। এসব মিছিল মিটিং এ সে কখনো থাকে না। মিছিল মিটিং কে তার বড় ভয়। তারপরেও আজ সে বাদলের পেছন পেছন যায়। যদি কোন ভালো সংবাদ পাওয়া যায়। 
কারখানা তো খুললই না। উল্টো শ্রমিকরা আবার শ্লোগান শুরু করা মাত্রই পুলিশ লাটিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দিল। হতাশ মনে ক্লান্ত শরীরে মফিজ আর বাদল সন্ধ্যার পর ফিরে আসে। জরী আসে একটু রাতে। ওর বাবা ঘুমিয়ে পড়লে। 
কি হল বাদল ভাই-জরী জিজ্ঞাসা করে।
কিছু হল না রে।
শুনলাম পুলিশ নাকি মারছে। 
হ রে গরীবরে সবাই মারে। মালিক পেটে লাথি মারে, পুলিশ পিঠে ডান্ডা মারে। তোদের কি খবর?
আমাদের ঝামেলা মিটছে। শুনছি বেতন বোনাস সবই নাকি দেবে। হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কোন বিশ্বাস নেই। 
বাদল ভাই আশ্বাস দিয়ে বলে বলছে যখন তখন দিবে।
কিন্তু তোমাদের কি হবে বলেই জরী মফিজের দিকে তাকায়। 
এবার মফিজ মুখ খুলে কি আর হবে ভাবছি কাল সকালে রিকশা নিয়ে বের হব।
ওর কথা শুনে বাদল আর জরী ওর দিকে অবাক হয়ে তাকায়। মফিজের মুখের দিকে তাকিয়ে জরীর মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুখী মানুষের মুখ সে দেখেছে। 
বাদল ভাই বলে কি বলিস তুই? পাগল হইছস নাকি। 
ঠিকই বলি বাদল ভাই। আর কতদিন আশায় থাকবো। হাতে টাকা নেই, ঘরে খাবার নেই, ঈদের কথাতো বাদই দিলাম। 
এত চিন্তা করিস না। সব ঠিক হবে। ঈদের এখনো বাকি আছে। সিগারেটা ধরিয়ে বাদল ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। 
জরী মফিজের পাশে এসে বসে। আস্তে করে বলে এবার বাড়ি যাবা না। 
না।
কেন?
কোন মুখ নিয়ে যাব? বছরে একটা শাড়ি কাপড়ও যদি দিতে না পারি। মফিজের ইচ্ছে করে কাঁদতে। কিন্তু জরীর সামনে কাঁদতে পারে না। 
জরী চুপচাপ বসে থাকে। নীরব সময় বয়ে যায়।
আশায় আশায় দিন চলে যায়। কারখানা খোলে না। রিকশা নিয়ে মফিজের বের হওয়া হয় না। সকাল থেকে কারখানার সামনে বসে থাকে। আজ বুঝি মালিক পক্ষের মনে একটু দয়া হয়। হঠাৎ হঠাৎ উড়ো খবর আসে আজ বিকালেই কারখানার চাকা ঘুরবে। সবাই নড়ে চড়ে বসে। বিকেলে খবর আসে আজ আর হবে না কাল সকালে খুলবে। আশায় বুক বেধে রাত কেটে যায়। সকালে কোন সুরাহা হয় না। কারখানার সামনে শ্রমিকদের সেই চেনা শ্লোগান। যে জ্বালাময়ী শ্লোগান কখনোই মালিকপক্ষের কানে যায় না। ঈদের আর মাত্র দু’দিন বাকি। কোন ব্যবস্থাই হল না। শোনা যায় ঈদের আগে আর কারখানা খুলবে না। এবার আর বাড়ি যাওয়া হবে না। মৃতের মত ভাঙ্গা চৌকিতে শুয়ে থাকে মফিজ। বাদল ভাই আসে সন্ধ্যার পরে। 
কি রে শুনলাম কোন বাসের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।
মফিজ উত্তর দেয় না। 
বাদল পাশে বসে বলে বাড়ি যাবি না। 
না ভাই তুমিতো সবই জানো।
আমার সাথে চল। 
কোথায়?
বাজারে যাবো।
মফিজ অবাক হয়। টাকা পাইলা কই। 
বাদল ভাই তিন হাজার টাকা তার হতে দিয়ে বলে আমি কোথায় টাকা পাইলাম সেইটা শুনে তোর কি কাম। এই টাকা দিয়ে মা ভাই বোনের জন্য কেনা কাটা কর, বাড়ি যা। আমার বাড়ি নাই, বউ নাই, সংসার নাই আমার তো জমানো টাকা কোন কামেই লাগে না। টাকাগুলো তোর কাজে লাগুক। যখন পারবি শোধ করে দিবি।
মফিজ কেঁদে ফেলে। বাদল ভাই বলে মাইয়া মানুষের মত  কান্দিস না। গরীবের দুঃখ শুধু গরীবই বোঝে। এখন বাজারে যা। 
মফিজরা বসুন্ধরা সিটিতে যায় না, কোন শপিং মলে যায় না। ওদের চাওয়া পাওয়া খুবই সামান্য। ফুটপাতের থেকে মায়ের জন্য সস্তা একটা শাড়ি আর ভাই বোনদের জন্য জামা কাপড় কিনেই নিজেকে রাজা মনে হয় মফিজের। বাকি টাকাটা যতœ করে রাখে। যাওয়া আসা ছাড়াও ঈদের দিন একটু ভালো মন্দ খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আজ রাতের ট্রেনে উঠবে মফিজ। টিকিট নিয়ে চিন্তা নেই। প্রতিবারই ট্রেনের ছাদে জায়গা করে নেয় সে। সন্ধ্যার আগেই ছোট্ট ব্যাগটা গুছিয়ে নেয়। সন্ধ্যার পরে জরী আসে। জরীকে দেখে মফিজ হাসতে হাসতে বলে বাড়ি যাচ্ছি। 
জরী ছোট্ট করে বলে জানি।
কে বলল?
বাদল ভাই। 
মায়ের জন্য কেনা শাড়ীটা খুলে দেখায়। ভাইবোনের জামা কাপড়গুলো দেখায় মফিজ। বার বার জিজ্ঞাসা করে কোনটা কেমন হয়েছে। 
জরী মাথা নাড়ে খুব সুন্দর হইছে। হঠাৎই জরী জিজ্ঞাসা করে তোমার জন্য কিছু কেন নাই?
না আমি আবার কি কিনবো। জানো জরী ওদের খুশিই আমার খুশি। ওদের হাসি মুখ দেখলে আমার আর কিছু লাগে না। আমার আলাদা কোন ঈদ নাই ওদের ঈদই আমার ঈদ।
জরী একটা প্যাকেট মফিজের দিকে এগিয়ে দেয়। মফিজ এতক্ষণ খেয়াল করেনি। সে অবাক হয়ে বলে এইটা কি?
তোমার জন্য। 
মফিজ প্যাকেট খুলতেই দেখে সুন্দর মেরুণ রঙের একটা পাঞ্জাবি। কোন কিছু বলতে পারে না শুধু জরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। 
জরী আস্তে করে বলে আমি জানতাম তুমি নিজের জন্য কিছুই কিনবা না। তাই তোমার জন্য কিনলাম। আমার তো দেওয়ার কেউ নেই। 
মফিজ মাথা নিচু করে তারপর বলে আমি তো তোমারে কিছুই দিতে পারলাম না।
আমার কিছু লাগবে না। তুমি ভালো ভাবে ফিরে আসো। আজ নাই বা দিলা আর একদিন দিও। তারপর জরী মফিজের হাতটা ধরে বলে আমার একটা শখ পূরণ করবা। 
বল। 
আমার খুব ইচ্ছা তুমুল বৃষ্টির ভিতরে তোমারে নিয়ে ঢাকা শহরে রিকশায় করে ঘুরবো। রিকশার হুড খোলা থাকবে। তুমি আমি ভিজতে থাকবো।
মফিজ বোকার মত মাথা নাড়ে। 
মফিজ বোঝে জরীর ভালোবাসা। কিন্তু তার মতো মানুষের ভালোবসা মানায় না। জরীর দিকে তাকায়। জরীও সব বোঝে। সবকিছুর পরেও দু’টো মন নীল আকাশের বুকে রঙিন স্বপ্ন আকতে চায়। আর তাইতো জরী আর মফিজের চার চোখে অশ্র“ জমে।
ট্রেনের ছাদে বাসের পাদানিতে করে হাজার মানুষের সাথে আমাদের মফিজও এক সময় গ্রামে পৌঁছাবে। পরনে জরীর দেওয়া পাঞ্জাবি আর মনে এক টুকরো আনন্দ নিয়ে সে এগিয়ে যাবে প্রিয়জনদের কাছে যারা তার অপেক্ষায় আছে। প্রিয়জনদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে হাজার হাজার মফিজরা ঈদের সময় ছুটে যায় নাড়ীর টানে। আমরাও আশা করি এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো যেন নির্বিঘেœ প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছতে পারে। অনাবিল আনন্দে ভরে উঠুক তাদের উৎসব। 
আবার এমনও তো হতে পারে, ট্রেনে উঠতে না পেরে মফিজ রাতের বাসে ওঠে। বগুড়া পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যাবে। রাস্তায় যে পরিমাণ জানযট তাতে দুপুর হয়ে গেলেও অবাক হওযার কিছু নেই। ভোরের দিকে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর একটু ফাঁকা পেয়েই বাস টানতে শুরু করলো। প্রত্যেকটা বাস এক ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। যাত্রীরা প্রায় সবাই ঘুম। মফিজদের বাসটা একের পর এক সামনের বাসগুলোকে ওভারটেক করছে। রংপুরগামী একটা বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে হঠাৎই ওপাশ দিয়ে একটা গরু বোঝাই ট্রাক সামনে চলে এলো। চালক আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলো না। মুহূর্তক্ষণ মাত্র। একটা বিকট শব্দ, কতগুলো নারী পুরুষের আর্তচিৎকার। মফিজের টকটকে লাল রক্তে ভেসে যায় চর্তুদিক। বাড়ি ফেরা হয় না, স্বজনদের অপেক্ষার অবসান হয় না। তুমুল বৃষ্টিতে প্রিয়জনকে রিকশায় নিয়ে ঘোরার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। 
গল্পের শেষটা দু’রকমই হতে পারে। দু’টো পরিনতিই স্বাভাবিক এবং পাশাপাশি দ্যোদুল্যমান। কিন্তু গল্পটা এমন হোক তা আমরা চাই না। গল্পটা হোক আনন্দের, মিলনের, ভালোবাসার। গল্পের মত সড়কেও জীবন মৃত্যু পাশাপাশি রেখে মফিজদের নিত্য পথ চলতে হয়। এ রকম জীবন মৃত্যু পাশাপাশি রেখে আমরা পথ চলতে চাই না। আমরা নিরাপদ সুন্দর একটা সড়কপথ চাই। যেখানে মৃত্যুর মিছিল থাকবে না, থাকবে জীবনের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প। 
সড়ক পথ, রেল পথ, নৌ পথ যে পথেই ভ্রমন করবেন সাবধানে করবেন। আপনার একটু সতর্কতা বাঁচাতে পারে অনেক গুলো জীবন। প্রতিটা জীবনই মূল্যবান। উৎসবের আনন্দ ছুঁয়ে যাক সবার প্রাণে। ঈদ মোবারক।
লেখক ঃ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা
বিআরডিবি, রূপসা, খুলনা।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ







উৎসব মুখর পরিবেশে আ’লীগের সম্মেলন

উৎসব মুখর পরিবেশে আ’লীগের সম্মেলন

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:২৮




কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ

কুষ্টিয়া মুক্ত দিবস আজ

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:২২