খুলনা | সোমবার | ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬ |

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব  মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

০৩ জুন, ২০১৯ ০০:১০:০০

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব  মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

বিশুদ্ধ বাতাস, স্বচ্ছ ও নিরাপদ পানীয় জল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং নিরাপদ বাসস্থান স্বাস্থ্য সম্পদের এ মৌলিক চাহিদাগুলোকে প্রভাবিত করছে জলবায়ু পরিবর্তন। সাম্প্রতিক অতীতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার জনের মৃত্যু ঘটেছে শুধু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে। পাশাপাশি জলবায়ু ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো, যেমন, অপুষ্টি, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি ভয়াবহ রূপ নিতে চলেছে। আগে পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে ভৌগোলিক কারণে এগুলোর প্রকোপ ছিল না বা কম ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন সেই অঞ্চলগুলোতে ভৌগোলিক সীমারেখা মুছে নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে এমনটাই জানা যাচ্ছে।
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষের পরিবেশ বিরোধী নানা রকম ক্রিয়াকলাপের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং কয়লা, পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি জীবাণু জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বায়ু মন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, মিথেন, ওজোন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিনহাউস গ্যাসের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বায়ু মন্ডলের নিচের স্তরে উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে তা প্রভাবিত করছে পৃথিবীর জলবায়ুকে। বিভিন্ন অঞ্চলে বদলে যাচ্ছে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের প্রকৃত পরিমাণ, এমনকি ‘ঋতুছন্দ’ও।  তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের এ পরিবর্তনগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নানা রকমের স্বাস্থ্য সমস্যা ডেকে আনছে। যেমনÑতীব্র গরম, কার্ডিওভাসকুলার ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। বয়স্ক মানুষ বেশি সংখ্যক এর শিকার হচ্ছেন। উচ্চ তাপমাত্রা, বায়ুতে ওজন এবং অন্যান্য দূষণের মাত্রা বাড়তে সাহায্য করছে। এ ধরনের দূষিত আবহাওয়া শহরাঞ্চলে অ্যাজমার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ এর শিকার। জলাবায়ুর পরিবর্তনে গত অর্ধ-শতাব্দীতে আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ বেড়ে গেছে। প্রচলিত চিকিৎসা ও পরিকাঠামো এক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকার হচ্ছে না। সমুদ্রের পানিতল বৃদ্ধি ও আবহাওয়া সংক্রান্ত নানা দুর্যোগ, বিশেষ করে ক্ষতি করছে তাদের, যারা সমুদ্রের কাছাকাছি অঞ্চলে বাস করেন। প্রসঙ্গত, পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ সমুদ্র থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে এরা নিজেদের বাসস্থান থেকে দূরে সরতে বাধ্য হলে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা ও সংক্রামক ব্যাধিসহ অজানা পরিবেশের শিকার হতে পারেন। বিশুদ্ধ পানির অভাব বা সমস্যা হলে মানুষ পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হবেন। বাড়বে ডায়রিয়ার ঝুঁকি, যে রোগে প্রত্যেক বছর প্রায় ২২ লাখ মানুষ মারা যান। আবার পানির অভাব তীব্র হলে খরা এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। 
মনে করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন ২০৯০ সালের মধ্যে খরাপ্রাপ্ত এলাকাকে অনেক বাড়িয়ে দেবে। প্রকৃত পক্ষে এর সম্ভাবনা প্রায় ২ গুণ বেড়ে যাবে, আর খরার গড় সময়কাল বেড়ে যাবে প্রায় ৬ গুণ। অন্যদিকে বন্যার সংখ্যা ও ভয়াবহতাও বাড়বে। ফলে যেমন পানি দূষিত হয়ে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের আক্রমণ বাড়বে, তেমনই বন্যা-পরবর্তী জমা পানিতে মশা ও নানা কীটপতঙ্গের রমরমায় বাড়বে এগুলো সম্পর্কিত নানারকম রোগ। এছাড়া বন্যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে একদিকে যেমন জীবন ও সম্পত্তিহানি ঘটবে, অন্যদিকে তেমন যাতায়াত ও চিকিৎসা পরিষেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রভাবে খাদ্যশস্যের উৎপাদন যথেষ্ট কমে যাবে। 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি রোগের প্রকোপের সরাসরি সম্পর্ক লক্ষ করা গেছে। যেমনÑঅতিরিক্ত উষ্ণতা ও তাপমাত্রায় অনেক সময় কলেরার মতো ব্যাকটেরিয়াজাত সংক্রমণ মহামারির আকার নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কার্যকারণ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত। একপক্ষ মনে করে, মানুষের ক্রিয়াকলাপের ফলেই এ অবাঞ্ছিত পরিবর্তন। 
আমরা মনে করি প্রাথমিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ক আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করা দরকার। তারপর স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ক একটি নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে এবং রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রক্রিয়াটিকে সার্বিক রূপ দিতে হবে। অর্থাৎ প্রশাসন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানকে এক্ষেত্রে সমন্বয় উন্নত করতে হবে। আবহাওয়ার চরমতা ও তৎপরবর্তী সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পরিকল্পনাগুলোকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ