খুলনা | শনিবার | ২৪ অগাস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

লাইলাতুল কদর : অফুরন্ত প্রতিদান লাভের রজনী

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী | প্রকাশিত ০১ জুন, ২০১৯ ০০:৪৯:০০

দিন-রাত, মাস সবই আল্লাহ্র। তার পরও কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে। আরবী মাস সমূহের মধ্যে রমযান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। এ মাসটি তিনটি মহান বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় এর সম্মান সর্বোচ্চ। প্রথমত, এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করা, দ্বিতীয় এ পবিত্র মাসে কুরআন মাজিদ নাযিল হওয়া, তৃতীয়ত এ মাসের বিশেষ একটি রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রজনী হিসেবে ঘোষিত হওয়া। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ইসলামী জীবন বিধানের পরিপূর্ণতা আসে। রমজান বা সিয়াম, কুরআন ও লাইলাতুল কদর একই সূত্রে গাঁথা। নিম্নে ‘লাইলাতুল কদর’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলোঃ
‘লাইলাতুল কদরের’ অর্থ ঃ ‘লাইলাতুল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাত, ‘কদর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিমাপ, পরিমাণ, নির্ধারণ ও ভাগ্য নিরূপণ, ‘কদর’ থেকেই ‘তাকদির’ শব্দ, অবশ্য কদর শব্দের অন্য অর্থ সম্মান, গৌরব, মর্যাদা ও মহিমা। সুতরাং ‘লাইলাতুল কদর’ মহিমান্বিত রজনী, সম্মানিত রাত্রি, ভাগ্য নিরূপন, বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ রজনী অর্থে সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে (কুরআনকে) এক পবিত্র রাতে নাযিল করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী, এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী (দুখান ঃ ৩-৫)।
কদরের রাতে কী আছে ঃ মহান আল্লাহ্ তায়ালা কদরের রাতকে হাজার মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম হিসেবে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ এক হাজার মাস মহান আল্লাহর ইবাদত করার চেয়েও এই একটি রাত ইবাদত করলে অনেক বেশী সওয়াব পাওয়া যাবে। এ রাতে হযরত জিব্রাইল (আঃ) অসংখ্য ফেরেশতা নিয়ে এ ধরা পৃষ্টে অবতরণ করেন। তিনি যাদের দন্ডায়মান এবং বসা অবস্থায় নামাজ ও মহান আল্লাহর জিকির ও কুরআন তিলাওয়াতরত দেখতে পান, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।
কদরের রাত কোনটি ঃ পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনায় ‘লাইলাতুল কদর’ রমজান মাসেই। তবে কবে? এ নিয়ে আলেমদের একাধিক মতামত পরিলক্ষিত হয়। (ক) তাফসীরে মাজহারির বর্ণনা মতে, এ রাত রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের মধ্যে আসে। কিন্তু এরও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। সহী হাদিসের দৃষ্টিতে এই ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে ‘লাইলাতুল কদর’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদরকে’ রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো (বুখারী শরিফ)। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের রমজানের শেষ ১০ অধিক পরিমাণে ইবাদত করার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই মূলত ‘লাইলাতুল কদরকে’ প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। তারপরও অধিক সম্ভাব্য রাত হিসেবে ২৭ তম রাতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। (খ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) গণিত সূত্র দিয়ে এর অধিক সম্ভাব্যতা প্রমাণ করেছেন। যেমন- সূরা কদর-এ ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার উল্লেখ আছে। আরবী বর্ণমালা অনুযায়ী ‘লাইলাতুল কদর’ লিখতে ৯টি অক্ষরের প্রয়োজন হয়। তিনকে ৯ এর সাথে গুণ করলে ফল ২৭ হয়। উপরোক্ত হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ রমজানের ২৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি (তাফসিরে রুহুল বয়ান)।
মুসলিম শরিফে হযরত উবাই ইবন ক্বাব বর্ণনা করেছেন ঃ শবে কদর হচ্ছে রমজানের ২৭ শে রাত। 
লাইলাতুল কদর অনির্দিষ্ট রাখার তাৎপর্য ঃ মহান আল্লাহর প্রতিটি কাজের ভিতর রয়েছে অসংখ্য নিয়ামত ও রহস্য। তদরূপ কদরের পবিত্র রজনীকে অনির্দিষ্ট রাখার অনেক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। যেমন-
(ক) প্রতিটি বেজোড় রাতে অধিক পরিমাণে ইবাদত করে বান্দা যাতে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হয়।
(খ) পাপিগণ এ রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং সঠিক পথে আসার অনুপ্রেরণা পাবে।
(গ) নির্দিষ্ট হলে কেউ দুভাগ্যবশত এ রাত হারিয়ে ফেললে সে অত্যন্ত মনকষ্টে নিপতিত হতে পারে।
(ঘ) যতরাতই ‘লাইলাতুল কদর’ মনে করে ইবাদত করবে প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক সওয়াব পাবে। 
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও ফযিলত ঃ ইসলামে লাইলাতুল কদর এর গুরুত্ব অপরিসীম। সমগ্র জাহানের হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য নাযিলকৃত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এই রাতেই নাযিল শুরু হয়। মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘আমি তা (আল-কুরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। তুমি কি জান মহিমান্বিত রজনী কি? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাইল (আঃ) অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। শান্তিই সে রজনীতে উযার আবির্ভাব পর্যন্ত (সূরা আল-কদর, আয়াত ঃ ১-৫)। এই সূরার বর্ণনা অনুযায়ী শব-ই কদর বা ‘লাইলাতুল কদর’ এর তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে : (ক) এরাতে কুরআন নাযিল করা হয়। (খ) এ রাত হাজার মাস অর্থাৎ (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা শ্রেয় এবং (গ) এ রাতে হযরত জিব্রাইল (আঃ) ফেরেশতাদলসহ শান্তির পয়গাম নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন।
*    হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শবই কদরে ঈমানসহ সওয়াবের নিয়তে ইবাদতের জন্য দাঁড়াবে তার পেছনের সকল গুণাহ মাফ করে দেয়া হবে (বুখারী)।
লাইলাতুল কদরের দু’আ ও করণীয় ঃ এই সম্মানিত ও মহিমান্বিত বরকতময় রজনী পাওয়ার জন্য প্রত্যেক মুসলমানেরই চেষ্টা থাকা উচিত। আর এর জন্য উত্তম পন্থা হল রমযানের শেষ দশকে ‘ইতিকাফ’ করা। এছাড়াও নিম্নে বর্ণিত কাজগুলো করা আবশ্যক।
(১) নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং পরিবারের সদস্য ও অধীনস্থদের ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা। (২) তারাবিহের সালাত আদায়ের পর রাতে তাহাজ্জুদ ও সালাতুত তাসবিহ আদায় করা। (৩) সিজদার মধ্যে তাসবিহ পাঠ শেষে দোয়া করা। কেননা সিজদারত অবস্থায় মানুষ তাঁর বরের নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দোয়া কবুল হয়। (৪) নিজের কৃত পাপের জন্য বেশী বেশী তওবা করা। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো পাপ না হয় তার জন্য দৃঢ় সংকল্প করা। (৫) অধিক পরিমাণে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা। উত্তম হবে কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কুরআন অধ্যায়ন করা। (৬) সাধ্য অনুযায়ী জিকির আসকার ও তসবীহ্ তাহলিল আদায় করা। (৭) কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে নিজ, পরিবার, পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, জীবিত, মৃত ব্যক্তিদের জন্য সর্বপরি দেশ, জাতি ও বিশ্ববাসীর শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর। 
কদরের রাতটি চেনার কিছু নির্দশণ ঃ এ রাত চেনার জন্য কিছু আলামত হাদিস শরিফে পাওয়া যায়। যেমন- (১) রাতটি গভীর অন্ধকার হয়ে যাবে না, (২) নাতিশীতোষ্ণ হবে, (৩) মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে, (৪) ইবাদতকারীগণ অধিক তৃপ্তি পাবে, (৫) বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে, (৬) হালকা আলোক রশ্মিসহ মুর্যোদয় হবে, যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো (বুখারী ও মুসলিম)। 
তাই পরিশেষে বলতে চাই, মুমিন বান্দা/বান্দীদের জন্য ‘লাইলাতুর কদর’ অত্যন্ত কল্যাণ ও বরকতময় রাত। এই রাতে ইবাদত করলে অনেক সাওয়াবের অধিকারী হওয়া যায়। এতবড় সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া করা ঠিক হবে না। এ রাতের ইবাদত হতে বিমুখ ব্যক্তি আসলেই হতভাগা। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ইবাদতের মাস মাহে রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রজনী ‘লাইলাতুল কদরের’ অফুরন্ত নেয়ামত অর্জন করার তাওফিক দান করুক। আমিন, ছুম্মা আমিন।
লেখক: মুফাসসিরে কোরআন ও প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ। শরণখোলা, বাগেরহাট।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




পবিত্র হজ্ব আজ

পবিত্র হজ্ব আজ

১০ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৫১


মিনায় হজযাত্রীরা

মিনায় হজযাত্রীরা

০৯ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৫৪


পবিত্র ঈদুল আযহা ১২ আগস্ট

পবিত্র ঈদুল আযহা ১২ আগস্ট

০৩ অগাস্ট, ২০১৯ ০১:০৭


১১ আগস্ট সৌদি আরবে  ঈদুল আযহা

১১ আগস্ট সৌদি আরবে  ঈদুল আযহা

৩০ জুলাই, ২০১৯ ০১:১৯




ব্রেকিং নিউজ












পেঁয়াজের বাজার বেসামাল

পেঁয়াজের বাজার বেসামাল

২৪ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৫৮