খুলনা | মঙ্গলবার | ১২ নভেম্বর ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ভারত ভ্রমণে নয় দিন

ড. তুহিন রায় | প্রকাশিত ০৮ মে, ২০১৯ ০০:৫৯:০০

অনেকদিন আগে থেকে ভারত ভ্রমনের চিন্তা ছিল। কিন্ত সময়, সুযোগ মিলিয়ে তেমন হয়ে ওঠেনি। এটুকু জেনেছি বিশাল বৈচিত্র্যের দেশ ভারতবর্ষ। নানা ভাষাভাষি, সংস্কৃতির এক পূণ্যভূমি। বিশাল এক ভৌগলিক সীমা রেখার মিলনস্থল ভারত। সবমিলে এক অপূর্ব দেশ। যেখানে বিভিন্ন ভাষার মানুষের এক মিলনস্থল। গত বছর দেশটির গোয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিই। সম্মেলন শেষে পুনে, মুম্বাই ভ্রমন করি এবং গোয়ায় যাবার পথে হায়দারাবাদে লম্বা সময় ট্রানজিট থাকার ফলে রাতের হায়দারাবাদ ঘুরে দেখি। উপভোগ করি হায়দারাবাদের বিখ্যাত বিরিয়ানী। এ বছর ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারিতে ভারত ভ্রমনের সুযোগ হলো। দু’টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার মধ্যদিয়ে এবারের ভারত ভ্রমনের সূচনা হয়। ইতোপূর্বে ভারত ভ্রমন করলেও তা আর লিপিবদ্ধ করা হয়ে ওঠেনি। এবার সে ভুলটির পুনরাবৃত্তি আর করতে চাইনি তাইতো এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। বর্তমান প্রবন্ধটি ভারত ভ্রমনের দিনলিপি বলা যায়। এ সময় হিমাচল প্রদেশ (শিমলা), মধ্যপ্রদেশ (ভোপাল), পাঞ্জাব, হরিয়ানা (চন্ডিগড়) নিউ দিল্লী এবং কলকাতা ভ্রমনের ৯ দিনের অভিজ্ঞতা মাত্র। ১৮ থেকে ২৬ ফেব্র“য়ারি এক নতুন অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে মণি-মুক্তার সমাহার এই সংক্ষিপ্ত ভারত ভ্রমনকাহিনী। 
দিনটি ছিল সোমবার ১৮ ফেব্র“য়ারী, ২০১৯। দু’জন সহকর্মীসহ আমার তিনজন ছাত্রসহ রওয়ানা হই। আমার সাথে ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান এবং ড. খ ম রেজাউল করীম, সহযোগী অধ্যাপক, যশোর এম এম কলেজ। অন্যদিকে, আমার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাকিলুর রহমান এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন সনি। সাথে ছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের ছাত্র মিথিল। উদ্দেশ্যে ভারতের দু’টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা। সম্মেলনের একটি ছিল ভূপালে অন্যটি চন্ডিগড়। দুপুর একটায় বেনাপোলগামী ট্রেনটি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রেনটি আসতে দেরী হওয়ায় আনুমানিক দুইটার দিকে খুলনার ট্রেন স্টেশন থেকে রওয়ানা দিই বেনাপোলের উদ্দেশ্যে। পরে যশোরের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে সামনের দিকে এগোতে থাকে ট্রেনটি। আমরা যখন বেনাপোল পৌঁছাই তখন আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিট। ইমিগ্রেশনের আগে আমাদের যার যার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ইমগ্রেশনে ঢুকে পড়ি। সেখানে কাস্টমস কর্মকর্তা আমাদের ছাত্র হাফিজের সাথে দেখা হলো। হাফিজ অত্যন্ত আনন্দের সাথে আমাদের কাজকর্মে সহযোগিতা করলো। খুব দ্রুত ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে আমরা বাংলাদেশ বর্ডার পার হওয়ার জন্য এগিয়ে যাই। তখন ৫টার দিকে বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারে প্যারেড চলছিল। বাংলাদেশ এবং ভারতের সীমান্তরক্ষীরা এই প্যারডে অংশগ্রহণ করে। বিষয়টি ভিষন আনন্দের ছিল। নতুন অভিজ্ঞতা। প্রায় আধাঘন্টার মতো সেখানে অপেক্ষা করে আমরা বাংলাদেশের বর্ডার পার হই। কাস্টমস কর্মকর্তা হাফিজ ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সাথেই ছিলেন। অনেক ধন্যবাদ প্রিয় হাফিজকে। 
যাই হোক, বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেই সেখানকার ইমিগ্রেশনে কাজ শেষে মাহেন্দ্রতে করে বঁনগা রেলস্টেশনে পৌঁছাই আনুমানিক সন্ধ্যা ৬.৩০ এর দিকে। সেখান থেকে শিহালদহগামী ট্রেনে করে শিহালদহ  স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। তথন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। বেশ একটা অনুভূতি কাজ করছিল ছাত্র-শিক্ষকের প্রথমবার বিদেশ ভ্রমন তথা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান। বেশ আনন্দ লাগছিল কিছুক্ষণ পরপর নতুন নতুন স্টেশন এবং স্টেশন থেকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের নাম। এর মধ্যে প্রফেসর মুজিব এবং প্রফেসর রেজার পান্ডিত্যপূণ্য আলোচনা সবাইকে মুগ্ধ করছিল। অজানাকে জানার কৌতুহল নিবারন করছিল ছাত্ররা। পথ এগিয়ে চলেছে। ক্রমান্বয়ে বিভূতিভূষন, গোবরডাঙা, মোসলেন্দুপুর, সংহতি, হাবড়া, অশোকনগর, বিড়া, দত্তপুকুর, বামনগাছি, বারাসাত, রিদয়পুর, মধ্যমপুর, নতুন বারাকপুর, বিরাটি, দূর্গনগর, ক্যান্টনমেন্ট, দমদম, বিধাননগর এবং সবশেষ আমরা পৌঁছালাম শিয়ালদহ স্টেশন। রাত তখন প্রায় ৯টা ৩০ মিনিট। আমরা বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম ছাত্রদের বিমানের সময় ছিল ১০টা ৪৫ মিনিট। খুব তাড়াহুড়ো করে ছাত্ররা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোশ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের দিকে রওয়ানা দিলো। আমাদের ফ্লাইটটি ছিল ১১টা  ৪৫ মিনিটে। ফলে আমাদের হাতে ঘন্টাখানেক সময় ছিল। উদ্দেশ্যে দিল্লী পৌঁছানো। ছাত্ররা শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেই একটি প্রিপেইড ট্যাক্সি নিয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে রওয়ানা হয়। প্রফেসর রেজা তাদেরকে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেয়।
আমরা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোশ বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমরা বিমান বন্দরে প্রবেশ করি। বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশনের নিñিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনি পেরিয়ে আমরা বিমানে উঠে পড়ি। আমাদের বিমানটি ছিল ‘ইন্ডিয়ান গো এয়ার’। ১১টা ৪৫ মিনিটে বিমানটি আকাশে উড্ডিয়মান হয়। প্রফেসর মুজিব, প্রফেসর রেজা আর আমি সবকিছু ঠিক থাকায় আনন্দ প্রকাশ করি। প্রথমেই যার যার সিটে বশে সিট বেল্ট বাঁধি। বিমানের শোঁ শোঁ শব্দ আর বিমানবালার আতিথেয়তায় ঘুমঘুম ভাবের মধ্যে দিয়েই আমরা দিল্লী পৌঁছে যাই। বিমান চালকের নিপুন চালনায় আমাদের বিমানটি সুন্দরভাবে দিল্লী ইন্দিরাগান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করে ২টা ২৫ মিনিটে। আমরা আমাদের লাগেজ নিয়ে বিমান বন্দর থেকে বের হই। উদ্দেশ্যে নিজাম উদ্দিন রেলওয়ে স্টেশন, দিল্লী। প্রিপেইড টেক্সি করে আমরা নিজাম উদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম। তখন প্রায় ভোরের দিকে। স্টেশন তথনও শরগরম। আমরা নাস্তা সেরে নিলাম। আমাদের সাথে আমাদের ছাত্ররাও যোগ দিল পূর্ব নির্ধারিত সময়নুযায়ী। তারা আমাদের আগেই বিমান থেকে নেমে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল। 
পূর্বেই আমাদের টিকিট কাটা ছিল ভূপালগামী ট্রেনের। তখন সময় ৬টা ২৫ মিনিট। ভোরবেলা ট্রেনে সবাই যার যার সিট নিয়ে উঠে পড়লাম। বেশ ঠান্ডা লাগছিল। ট্রেন চলছিল তার নিজস্ব গতিতে। একটু একটু ঘুম আসছিলো আবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। যাই হোক সকাল ৮টার দিকে ঘুম ভেঙে যায়। স্লিপিং বেড হওয়ায় খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছিল না লম্বা জার্নি হলেও। আমরা সকালে ট্রেনেই যার যার মতো নাস্তা সেরে নিলাম। অসুবিধা হলোনা। ট্রেন তার নিজস্ব নিয়ম মেনে চলতে লাগলো। ট্রেন থেকে খুব সুন্দর সুন্দর প্রকৃতি দেখতে দেখতে ট্রেন এগিয়ে যেতে লাগলো। মনে হচ্ছিল ’মন আমার আজিকে নাচেরে ময়ুরের মতো নাচে রে’। মধ্যপ্রদেশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য চোখে  পড়ার মতো ছিলো। লাল মাটির সাথে সবুজ শস্য, প্রকৃতি এক অপরুপ সৌন্দর্য্যরে ডালা সাজিয়ে যেনো বসে আছে। অসাধারণ সব দৃশ্য। কোথাও আবার পাহাড়ি অবয়ব পাথর সম্বলিত। সত্যিই ক্লান্ত দেহ মিলিয়ে কখনও আবার বিশ্রাম নিচ্ছি স্লিপিং বেডে। আবার কখনও বা উঠে বসছি, প্রকৃতি দেখছি। মধ্যপ্রদেশের নিজস্ব খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে ট্রেনে। বেশ আনন্দের সাথে সেগুলোর টেস্ট নিচ্ছি।  কখনও বা চা, কফির অর্ডার দিচ্ছি। ভালোই লাগছিল। মনে হচ্ছিল কি বিশালা পৃথিবীর সত্যিই কতটুকুই বা জানি। উপরে অসীম আকাশ। থরোথরো সাজানো, গোছানো প্রকৃতি যেনো ডেকে ডেকে বলছে তোমরা এসো, বসে যাও। দুপুরের দিকে খাবার অর্ডার দেওয়া হলো তারা আমাদের খাবার দিয়ে গেলো। খাবার খেয়ে নিলাম। ট্রেন চলছে তো চলছেই। চলার যেনো শেষ নেই। অবশেষে ১৯ তারিখ বিকেলে আমরা পৌঁছে গেলাম ভূপাল রেলস্টেশনে। আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থল। সময় তখন আনুমানিক ৫টা। ট্রেন স্টেশন থেকে বের হলাম ভূপাল প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটি রেগুলেটারি কমিশনের উদ্দেশ্যে যেখানে আমাদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে। আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করে চলতে লাগলাম। সমে¥লন কমিটির ঠিকানা অনুযায়ী আমরা চলতে লাগলাম। তখন সন্ধ্যা সমাগত। আমরা পৌঁছে গেলাম কনফারেন্স ভেন্যুতে। আমাদের জন্য সুন্দর রুম বরাদ্দ করা ছিলো। প্রফেসর মুজিব এবং প্রফেসর রেজা এবং আমি আলাদা আলাদা রুমে। ছাত্ররা এক সাথেই একটি বড় রুমে ছিল। আমরা যার যার রুমে প্রবেশ করি। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়ি। সবাই মিলে একটু ঘোরাফেরা তারপর রাতের খাবার। রাতের খাবারে ভূপালের নিজস্ব খাবার ছাড়াও রুটি, পরাটা, সবজি, ডাল, সালাদ ইত্যাদি ছিল। ভূপালের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে পোহা, ভুটি খাখিস, শিক কাবাব, পলক পুরি, বিরিয়ানি পেলাফ, মালপুয়া, জালেবি ইত্যাদি ছিল। আমরা বেশ মজার সাথেই সেগুলো মধ্যে থেকে পছন্দের খাবার গ্রহণ করলাম। অতপর যার যার রুমে এসে বিশ্রাম নিলাম। সবাই বেশ ক্লান্ত। ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিদ্রাদেবীর বুকে সঁপে দিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল ছিলনা। সকালের দিকে উঠে দেখি সময় ৭টা। তাড়াতাড়ি করে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিই। 
সকাল ১০টায় ছিল ৫০তম বার্ষিক রিজিওনাল সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশনের ইন্ডিয়া কনফারেন্সের উদ্বোধন পর্ব। সেখানকার মান্যবর গভর্নর প্রধান অতিথি। আমরা আনুমানিক ৮.৩০টার দিকে সকালের নাস্তার জন্য রওয়ানা হলাম। বিভিন্ন রকমের খাবার সেখানে সাজানো আছে। সেখানে যেয়ে বিভিন্ন কনফারেন্স ডেলিগেটসের সাথে পরিচয় হলো। বিশেষ করে ইন্ডিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষকদের সাথে। মনে রাখার মতো  আমাদের  শ্রদ্ধায় সি আর পাঠক স্যারের সাথে অনেক সময় কাটিয়েছি। যিনি রিটিয়ার্ড অধ্যাপক, খড়গপুর আই আই টি এবং ইন্ডিয়ান রিজিওনাল সায়েন্স-এর প্রাক্তন পেসিডেন্ট। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও অনেক গুণীজনদের সাথে সকালের খাবার সময় পরিচিতি হয়। নাস্তা সেরে আমরা কনফারেন্স ভেন্যুতে চলে যাই। আধা ঘন্টা দেরীতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভূপালের নিজস্ব আনুষ্ঠানুকতায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। মেখানে মা সরস্বতীর গলায় মালা পরিয়ে কিছু মাঙ্গলিকতার সাথে ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভালো লাগলো দেশের প্রতি তাদের টান, মমত্ববোধ দেখে। উদ্বোধন পর্বের সমাপ্তি হয় পুনঃ জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। উদ্বোধন পর্বের পর পর প্লেনারি সেশন শুরু হয়। এভাবে পরবর্তীতে টেকনিক্যাল সেশনের পর্ব শুরু হয়। আমরা প্রত্যকটা সেশন অংশগ্রহণ করে দুপুরের খাবার খেতে যাই। বিভিন্ন রকমের খাবার পরিবেশন করা হলেও ভাত, পুরি, রুটি, মিষ্টি, সবজি দিয়েই দুপুরের খাবার খাই। 
পূর্বেই আমাদের অন্য একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দেবার জন্য আমিসহ প্রফেসর মুজিব এবং প্রফেসর রেজা সিদ্ধান্ত নিলাম আজ রাতেই আমরা ভূপাল ত্যাগ করব এবং সেভাবেই পরিকল্পনা করে চন্ডিগড় যাবার পরিকল্পনা করলাম। সেইদিনে সৌভাগ্যবশতঃ আমার এক ভাস্তি ভাবনা রায়কে মনে পড়ল। সেখানে সে আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনা করছে সি এসই ই তে, তাকে আসতে বললাম। সে তার এক বান্ধবীকে নিয়ে কনফারেন্স ভেন্যুতে আসে। ওদের সহযোতিায় আমরা ভূপালের কিছু জায়গা ঘুরে দেখি। সেখানে আমরা দারুল উলুম তাজুল মসজিদ ঘুরে দেখি (যেটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ মসজিদ বলে পরিচিত)। এছাড়াও রাজা ভোজ লেক, নিউমার্কেট, মাওলানা আজাদ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ঘুরে দেখি। অতপর সামান্য কিছু কেনাকাটা করে আমরা রাত্রের খাবার সেরে দিল্লীর উদ্দেশ্য রওয়ানা হই গন্তব্য চন্ডিগড়। যাই হোক, চন্ডিগড় পৌঁছাতে গেলে আমাদের দিল্লী হয়ে যেতে হবে। সেজন্য ভাবনা এবং ওর বান্ধবী সুতৃষ্ণার সহযোগিতায় ভূপাল টু দিল্লীর ট্রেনের বুকিং দিই। ভূপাল ঘোরা শেষে ভাবনা ও সুতৃষ্ণাকে ওদের হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে আমরা ভূপাল প্রাইভেট ইউনিভাসির্িিট রেগুলেটরি কমিশনে চলে আসি। আগে থেকেই লাগেজ রেডি থাকায় একটি গাড়ি নিয়ে ভূপাল রেল স্টেশনে চলে আসি এবং যথা সময়ে ট্রেনে উঠে পড়ি।
যাই হোক, সারারাত ট্রেন ভ্রমন শেষে দিল্লীর নিজাম উদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে সকাল হয়ে যায়। তখন আমাদের হাতে কিছু সময় থাকায় আমরা দিল্লী ঘোরার পরিকল্পনা করি। যেহেতু সেদিন রাতেই আমাদের ট্রেনের টিকিট ফলে একটি মাইক্রো ভাড়া করে আমরা বেরিয়ে পড়ি। ইতিপূর্বে প্রফেসর মুজিব এবং প্রফেসর রেজার দিল্লী ভ্রমনের অভিজ্ঞতা থাকলেও আমার প্রথম দিল্লী ভ্রমন। ফলে আমার মধ্যে কৌতূহলটা একটু বেশি ছিল বৈকি! যাই হোক, প্রথমেই কিছু নাস্তা সেরে দিল্লীতে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর সমাস্থিল রাজঘাট ঘুরে দেখি। অসাধারণ সব স্মৃতি নিয়ে সাজানো সমাধিটি। সেখানে প্রতিনিয়ত আগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত থাকে।  ফুলে ফুলে ঢাকা সমাধি। প্রচুর দর্শনার্র্থী আসছে ঘুরে ঘুরে দেখছে আর স্মৃতির পটে সেগুলোকে ধরে রাখছে। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। পরবর্তীতে রাজঘাট থেকে বের হয়ে ইন্ডিয়া গেট দেখতে গেলাম, যেটি অনন্য সাধারণ এক র্কীতি ভারতের। ইন্ডিয়া গেট ভারতের জাতীয় স্তৃতিসৌধ। এটি ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লীর কেন্দ্র স্থলে অবস্থিত। প্যারিসের আর্ক দে ত্রিসেফর আদলে ১৯৩১ সালে নির্মিত এই সৌধটির নকশা করেন স্যার এডউইন লুটিয়েনস। পূর্বে এর নাম ছিল ‘অল ইন্ডিয়া ওয়ার মনুমেন্ট’। যাইহোক, ইন্ডিয়াগেটে প্রচন্ড মানুষের ভীঢ় লেগেই ছিল। ঐতিহাসিক জায়গা দেখার জন্য মানুষের ভীড় লেগেই থাকে। আমরা সেখানে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, প্রফেসর রেজা খুব দ্রুতগতিতে সেলফি স্টিক দিয়ে ছবি তুলতে লাগল। আমরা তার ক্যামেরায় বন্দী হয়ে থাকলাম স্মৃতির পাতায়। এখানে একটি বিষয় জানতে পারলাম ইন্ডিয়া গেটে ৭০,০০০ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি যারা ১৯১৪-১৯২১ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল। এছাড়াও তৃতীয় আফগান যুদ্ধে ১৩,৩০০ সার্ভিসমেন্স যারা প্রাণ হারিয়েছিল তাদের নাম খোদাই করা আছে। যাই হোক, সেখান থেকে বের হয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে অগ্রসর হলাম সুন্দর সব কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হলাম। ভবনটি ১৩০ হেক্টর বা ৩২০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা ঘুরে ঘুরে সুন্দর সব ভবন দেখলাম। অসাধারন সব স্মৃতি খুবই ভালো লাগল। ভারতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের অফিস রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থিত। খুবই তাড়া থাকার কারণে একটু দ্রুত করেই আমাদের বের হয়ে পড়তে হলো। 
পরবর্তী গন্তব্যস্থল দিল্লীর রেডফোর্ট ভবন দর্শন। এটিও বেশ পুরাতন ভবন। ঘুরে ঘুর ভবনটি দেখলাম। ভারতের প্রজাতন্ত্রী দিবসে ১৫ আগস্টে যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন সে জায়গাটিও দেখলাম। ঐতিহাসিক সব জায়গা দেখে একটা সুন্দর অনুভূতির জন্ম নিল মনে যা বারবার স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখে। ঐতিহাসিক লালফোর্ট ভবন দেখতে দেখতে প্রায সন্ধ্যা ঘনিয়ে  এলো। আমাদের পূর্বেই ট্রেনের টিকিট কাটার কারণে সঠিক সময় মতো রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে যাই। যদিও দূর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের ট্রেনটি আসতে দেরী হওয়ার ফলে ঘন্টা দু’য়েক আমাদের সেখানে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অবসরে আমরা কিছুটা সময় খাবার দাবার, ঘুরে ফিরে কাটিয়েছি। মজার ব্যাপার তখন প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা সেটি বেশ উপভোগ করি। একটি বিষয় বলা হয়নি, আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের সাথে ছিলনা তারা ভূপাল কনফারেন্স শেষ করে দিল্লী হয়ে কলকাতা ফিরবে। ফলে আমরা তিনজন শিক্ষক চন্ডিগড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। সে যাই হোক, আমাদের আপেক্ষার প্রহর শেষে অবশ্য ট্রেনটি আসে এবং আমরা ট্রেনে উঠে পড়ি এবং নির্ধারিত সিটে বসে পড়ি। রাতে প্রচন্ড শীতের মাঝে আমাদের ট্রেনটি চলতে থাকে। তখন আনুমানিক রাত ১২-১টা। সমস্ত শীতের কাপড় লাগেজর মধ্যে ছিল। এক সময় অবশ্য শীতের কাপড় লাগেজের মধ্যে থেকে বের করে ঘুমাতে চেষ্টা করি। ভোর হতে না হতেই টের পেলাম আমরা চন্ডিগড় রেলস্টেশনে এসে পড়েছি। সবাই নামার জন্য উদগ্রীব আমরাও নেমে পড়লাম। তখন বৃষ্টি পড়ছে প্রচন্ড শীত লাগছে। চন্ডিগড় রেলস্টেশনে নেমেই আমাদের গন্তব্যস্থলের ঠিকানা জানতে চেষ্টা করি। অবশেষে একজনকে পেয়ে গেলাম রেলওয়ে টার্মিনালে যে আমাদেরকে পিডব্লিউডি গেস্ট হাউজের ঠিকানা দিল (কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সিট) এবং পরে জানলাম সেই গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন যিনি আমাদেরকে পিডব্লিউডি ঠিকানা দিয়েছিলেন। তখন প্রায় ভোর আমরা আমাদের গেস্ট হাউজের আনুষ্ঠানিকতা সেরে রুমে চলে যাই। আমি এবং  প্রফেসর রেজা এক রুমে এবং প্রফেসর মুজিব অন্যরুমে। বেশ সুন্দর ছিল রুমটি। আমরা খুব দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করি। আবার আমাদের কাল সকাল ৯টায় চন্ডিগড় কনফারেন্সের উদ্বোধন হবে সেখানে থাকতে হবে। রেজিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য কাজ করতে হবে। 
যাই হোক সকাল ৮টার মধ্যে আমরা রেডি হয়ে আবার বের হয়ে পড়ি কনফারেন্স ভেন্যুর উদ্দেশ্যে। প্রায় গাড়িতে ১০ মিনিটের পথ। গাড়িটি কনফারেন্স কমিটির নিজস্ব পরিবহন ছিল। সেখানে পৌঁছিয়েই রেজিস্ট্রেশন করে নাস্তা সেরে নিই। নাস্তাটা চন্ডিগড়ের নিজস্ব খাবার ছিল বেশ মজার সব আইটেম। শীতের বেশ প্রচন্ডতা লক্ষ্য করলাম। কিছু অদুরে শিমলা। যাই হোক, খুব কম সময়ের মধ্যে নাস্তা সেরে চলে গেলাম কনফারেন্স ভেন্যুতে সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রফেসর ড. কৈলাশ চন্দ্র শরমা, ভাইস চ্যান্সেলর, কুরুক্ষেত্র ইউনিভার্সিটি। কি নোট স্পীকার ছিলেন প্রফেসর ইয়োকি হিমিয়ামা, প্রেসিডেন্ট আইজিইউ। বেশ সুন্দরভাবেই অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে। মা সরস্বতীর গলায় মালা পরিয়ে ভারতীয় জাতীয় সংগীত গেয়ে এই পর্বের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনলাম প্রধান অতিথি প্রফেসর কৈলাশ শর্মা এবং প্রফেসর আর বি শিং, সেক্রেটারি জেনারেল এবং ট্রেজারার, আজিইউ, দিল্লী স্কুল অব ইকোনোমিক্স। অমায়িক ছিল তাঁর ব্যবহার। অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন তিনি। পেনালিস্ট হিসেবে ছিলেন প্রফেসর মুজিবর, প্রফেসর কাইনিট, প্রফেসর বরিজ, ড. নিনা, প্রফেসর রাঘব, ড. কিন মারি, পি. ডস্টফেন, প্রফেসর আরবিসিং, প্রফেসর, বিসি বৈদ্য, প্রফেসর সাধনা কো টারি এবং প্রফেসর প্রকাশ। পরবর্তীতে প্লেনারি লেকচার সেশন শুরু হয়। সেটা উপভোগ করার পর দুপুরের খাবার বিরতি দেওয়া হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে টেকনিক্যাল সেশন, টি ব্রেক, এভাবে চলতে থাকে। প্রফেসর মুজিব একটা সেশনের চেয়ার ছিলেন। আমি আর ড. রেজা একটা সেশনের চেয়ার এবং কো-চেয়ার ছিলাম। বেশ ভালোভাবেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করলাম। সে দিনই অর্থাৎ ২৩ ফেব্র“য়ারি বিকেলে কনফারেন্স কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য অর্থাৎ যারা ভারতীয় নন তাদের জন্য কনফারেন্স ট্যুরের ব্যবস্থা রেখেছিল। আমারা বিকেল তিনটায় নির্ধারিত গাড়িতে উঠে পড়ি। প্রথমেই আমাদেরকে চন্ডিগড়ের রক গার্ডেনে নেওয়া হয়। বিশাল পাথর কেটে বাগানের মতো করে তৈরি করা হয়েছে। অসাধারণ সব কীর্তি না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না। ১৯৫৭ সালে ৪০ একর জমির উপর নির্মাণ করেন নিক চাঁদ সানাই। ঝর্ণা, পাথর অসাধারণ সব স্মৃতি নিয়ে সাজানো রক গার্ডেন। পরবর্তীতে আমাদের গন্তব্য হলো রোজ গার্ডেন। রোজ গার্ডেনের সেই নয়নাভিরম স্মৃতি ভোলার নয়। ফুলে ফুলে সাজানো পরির দেশ মনে হয়। একদিন সন্ধ্যার মেলা যেন মনে হলো ফুল আর ফুলের গালিচা যেন থরে থরে সাজানো। পরবর্তীতে আমাদের যাবার কথা ছিল শুকনা লেক, কিন্তু যাওয়া হয়ে উঠেনি আমরা সবাই মিলে কনফারেন্স ভেন্যুতে চলে আসি। তখন রাত আনুমানিক ৮টা। আমাদের রাতের খাবার খেয়ে চলে আসি পিডব্লিওডি গেষ্ট হাউজ, চন্ডীগড়। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় সঁপে দিই ঘুম চলে আসে। এক ঘুমেই রাত শেষ হয়ে যায়। সকালে ঘুম ভাঙে তার আগেই পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা ছিল আমরা শিমলা যাচ্ছি। যাই হোক, সকালের নাস্তা গেস্টহাউজ থেকে করে আমরা বের হলাম কনফারেন্স ভেন্যুর দিকে। 
কনফারেন্সে যোগদান করে  সকালেই আমরা শিমলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। শিমলা ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের শিমলা জেলার একটি শহর ও পৌর কর্পোরেশনাধীন এলাকা। এটি হিমাচল রাজ্যের রাজধানী। আমরা সেদিন সারাদিনের জন্য একটি মাইক্রো ভাড়া করি এবং শিমলার উদ্দেশ্য রওয়ানা হই। বলে রাখা ভালো আমাদের ড্রাইভার একজনই ছিল যে আমাদেরকে চন্ডিগড় গেস্ট হাউজ নিয়ে এসেছিল প্রথম দিনে। আমরা ৫ জন শিমলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। নতুন করে আমাদের সাথে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী যোগদান করেন।  আমরা প্রায় দু’আড়াই ঘন্টার মধ্যে শিমলা পৌঁছে যাই। অসাধারণ জায়গা। পাথর আর পাথর। মনে হয় স্বপ্নের মতো। আপনার কাছে মনে হতে পারে আপনি চক্রাকারে ঘুরছেন। আস্তে আস্তে নিচ থেকে রাস্তা বেয়ে উপরের দিকে যাচ্ছেন। চর্তুদিকে গাছ আর গাছ। তার মধ্যে দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে আপনি ছুটে চলেছেন। কয়েক’শ ফুট উপরে আপনি উঠে যাচ্ছেন ঠিক নেই। উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কতদূরে উঠে গেছি। এখানকার বাড়িঘর ভিন্ন প্রকৃতির। লাল রঙের তৈরি বাড়িঘর। আবার গাড়ি পার্কিংগুলো করা হয়েছে সাধারণত বাড়ির ছাঁদের উপর। আমরা শিমলা থেকে একটু দূরে কুফরি চলে যাই। কুফরির উচ্চতা ২৭২০ মিটার। যেখানে শুধু বরফ আর বরফ। আমরা সেখানে গাড়ি থেকে নেমে বরফ সৌন্দর্য্য উপভোগ করি। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ছবি তোলা আর আঁকাবাঁকা ছবির মতো স্মৃতিগুলো উপভোগ করি। বিশাল পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য আমাকে বিমোহিত করে। অসাধারণ সব স্মৃতি নিয়ে কুফরি থেকে চলে আসি। ফেরার পথে কিছু সময়ের জন্য গাড়ি থেকে নেমে আমরা সামান্য কিছু কেনাকাটা করি এবং হালকা খাবার গ্রহণ করি। সন্ধ্যা সমাগত হওয়ায় আমরা দ্রুতগতিতে গাড়িতে উঠে পড়ি। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা সমাগত। আমারা স্মৃতিকোণে অনেক স্মৃতি নিয়ে রওয়ানা দিলাম চন্ডিগড় গেস্ট হাউজের দিকে। প্রায় রাত ১০টার দিকে পৌঁছে গেলাম গেস্ট হাউজে। খুবই ক্লান্ত ছিলাম। সারাদিনের পরিশ্রম, ঘোরাঘুরি। রাতের খাবার গেস্টহাউজে সেরে নিলাম। রুটি, সাম্বার, ইডলি, সবজি, ডাল, কফি। খাবার খেয়েই চলে গেলাম বিছানায়। আমাদের পরিকল্পনামাফিক পরদিন সকালে আমরা পাঞ্জাব যাব। সেভাবেই সবকিছু রেডি করে অর্থাৎ লাগেজ ঠিক করে ঘুমিয়ে পড়লাম। 
গাড়ির ড্রাইভার আসার কথা ছিল সকাল ৯টা। সে সময় মতো এসে পৌঁছালো। আমরা ঠিক সময়মতো নাস্তা করে বের হলাম। ড্রাইভারের সাথে চুক্তি ছিল সে আমাদের পাঞ্জাবের বগা-বর্ডার (ইন্ডিয়া-পাকিস্তান বর্ডার), অমৃতসর স্বর্ণ মন্দির এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের স্থান দেখিয়ে আমাদেরকে দিল্লী নিয়ে যাবে। যাই হোক, ড্রাইভার আমাদেরকে গাড়িতে নিয়ে চালাতে শুরু করল। আমরা রাস্তার দু’ধারের প্রকৃতির নয়নাভিরাম স্মৃতি দেখতে লাগলাম। দু’পাশে বিভিন্ন গাছগাছালি আর শস্যের সারিসারি লাইন। আবার কোথাও রাস্তার পাশে থরথর সাজানো মাল্টার স্তুপ। এক জায়গায় নেমে আমরা গাছ থেকে নামানো টাটকা মাল্টার জুস খেয়ে নিলাম। অবাক করার ব্যাপার সেখানে মাল্টা রাস্তার পাশে সাজানো, কোথাও স্তুপাকারে সাজানো, মানুষ গাড়ি থামিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় মাল্টা কিনে নিচ্ছে। যাইহোক, সুন্দর সুন্দর নতুন নতুন বিল্ডিং দেখা যাচ্ছিল, মনে হয় বলছে নতুনেরা এসো, বসে যাও। দুপুরে পাঞ্জাবের রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। সেখানের পাঞ্জাবের নিজ¯¦ খাবার খেয়ে নিলাম। উদ্দেশ্যে প্রথমেই বগা-বর্ডার দেখব। সেভাবে প্লান ছিল কিন্তু প্রথমে আমরা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের স্থান পরিদর্শন করলাম। কি নিষ্ঠুর সেই হত্যাকান্ড ছিল। সেই গভীর গর্ত এখনো দেখা যায় যেখানে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতীয় সাধারণ মানুষকে মারা হয়েছিল। আমরা জানি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যে কারণে ব্রিটিশদের দেওয়া উপাধি ’নাইট’ বর্জন করেছিলেন। 
সেখান থেকে বের হয়ে অল্পকিছু দূরেই অমৃতসর স্বর্ণ মন্দির। হরমন্দির সাহিব বা দরবার সহিব, কথ্যরুপে স্বর্ণমন্দির, শিখধর্মের পবিত্রতম তীর্থ স্থান। এটি চতুর্থ শিখ গুরু রামদাস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত অমৃতসর শহরে অবস্থিত। এই শহরটি গুরু দ্রি নগরী বা গুরুর নগরি নামে পরিচিত। হরমন্দির সাহিবে শিখধর্মের চিরন্তন গুরু শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব সর্বদা বিরাজমান। এই কারণে এই স্থান শিখদের নিকট পবিত্র। সে যাইহোক, আমরা সবাই সেখান থেকে স্কার্ফ ক্রয় করে মাথায় জড়িয়ে সামনে এগোতে লাগলাম। মন্দিরে ঢুকতে গেলে কেউ খালি মাথায় যেতে পারেনা। একটু সামনে এগিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি আমাদের সাথে  ড্রাইভারও ছিল। প্রথমেই জুতা রাখার জায়গা যেখানে সেখানে জুতা রেখে আমরা ভেতরে এগোতে থাকি। সবাইকে পা ধুয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। এমন সুন্দর করে তৈরি করা যেন পুকুর সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে। বিশাল এলাকা নিয়ে স্বর্ণ মন্দির, চতুর্দিকে জলবেষ্টিত। হাজার হাজার মানুষের ভিড় সেখানে। সবাই চতুর্দিকে প্রার্থনায় রত। সকল ধর্মের মানুষ সেখানে যেতে পারে। কোথাও কোনো বাধা নেই। আপশোষ থেকে গেল মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে যেয়ে চলে আসতে হলো। কারণ সেখানে এতবড় লাইন যেখানে ঢুকলে আর আমরা বগা-বর্ডার দেখতে পারব না। যাইহোক যাত্রা সংক্ষিপ্ত করে বের হলাম বগা-বর্ডারের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে উঠতেই প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো। খুব দ্রুত গতিতে যেতে থাকলাম কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেলো আর সুযোগ হলো না বগাÑবর্ডারের প্যারেড দেখা। উল্লেখ্য, বগা-বর্ডারের ইন্ডিয়া-পাকিস্থানের দৃষ্টি নন্দন প্যারেড দেখাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। সকল ট্যুরিস্ট এটি দেখতে সেখানে যায়। যাইহোক, আমরা প্যারেড দেখতে না পেলেও সেখানে যাই কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে কথা বলে অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করি। গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ভিতরে এক কিলোমিটার দূরে বর্ডার। আমরা খুব দ্রুত সেখানে পৌঁছে যাই। হাঁটা ছাড়া কোন উপায় নেই এদিকে সন্ধ্যা চলে এসেছে। কিন্তু টার্গেট আমাদের বর্ডারে যাবই সবশেষ ইচ্ছা পূরণ হলো। আপশোষ প্যারেড দেখতে পেলাম না। তাড়াহুড়ো করে বর্ডারে গেলাম। কিছু স্মৃতি ধরে নিলাম। দেখা গেলো দুই প্রান্তে পাকিস্থান এবং ভারেতের পতাকা সেখানে। অবশ্য তখন পতাকা নামানো হয়েছে। ওপার অর্থাৎ ভারতের পাশ খেকে পাকিস্থানের ধান ক্ষেত দেখা গেলো।
আমাদের এখন ফিরতে হবে অল্প কিছু কেনাকাটা করে গাড়িতে উঠে পড়লাম গন্তব্য দিল্লী ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্ট। ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইট। আমরা গাড়িতে বসে আছি ড্রাইভার কিছুই বলেনা। ওকে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছে। মনে হলো সে রাস্তার ঠিকানা ঠিক মতো চিনতে পারছে না। ইতিমধ্যে অনেক রাত হয়ে গছে। হাইওয়েতে লোকজন নেই বললে চলে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলে কিছুটা ইতস্তত মনে হলো। সে ভালো করে হিন্দিও বলতে পারেনা। সে তার লোকাল চন্ডিগড়ের টোনে কথা বলে। আর ইংরেজি তো মোটেই বোঝে না। আমরা বিপত্তিতে পড়লাম। কিছুটা উদ্বিগ্ন সবাই। আসলে আমরা ঠিক পথে আছি কিনা। তখন রাত প্রায় ১০টা বাজে। আমাদের ফা¬ইটের সময় যেহেতু বেশি সময় দূরে নয়, আমাদেন উদ্বিগ্নতার কারণ সে কারণে বেশি ছিল। অন্যদিকে ড্রাইভারের মনোভাবও বোঝা যাচ্ছে না। যাইহোক, পরে বুঝতে পারলাম সে আমাদেরেকে দিল্লী নিয়ে যাবে না। তার দুরুভিসন্ধিটা আমরা বুঝতে পারলাম। আমরা বেশ বিরক্ত হলাম। কিন্তু কিছুই বলতে পারছিনা। তার টার্গেট সে আমাদেরকে আবার চন্ডিগড় নিয়ে যাবে সেখানে সে অন্য ড্রাইভারকে আমাদের নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করবে। সেটাই সে করল আমাদের বসে বসে দেখা ছাড়া আর তেমন কিছু করার থাকল না। আমরা যখন চন্ডিগড় পৌঁছিলাম রাত তখন ১১টা। সেখান নেমে দেখলাম ড্রাইভার আর একজেনর সাথে দর-কষাকষি করছে। অবশেষে সে আমাদেরকে নতুন ড্রাইভার ঠিক করে দিল। আমরা গাড়িতে উঠলাম। আমাদের সাথে ড্রাইভারের চুক্তি ছিল সে আমাদেরকে দিল্লী নিয়ে যাবে আমরা তাকে ১০,০০০ টাকা দিব। সেইভাবে তাকে আমরা সকালে ৫০০০ টাকা পরিশোধ করি। বাকি টাকা পরে দিব এভাবে ভেবেছিলাম, সে কিন্তু মোটেও আমাদের কথা শুনল না। সে নতুন ড্রাইভারকে ২০০০ টাকা দিল বাকি টাকা নিজে রেখে দিল। আমরা কিছু বোঝাতে চাইলেও শুনলনা। যাইহোক, আমরা সব মেনে নিয়ে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। জানতে পারলাম দুই ঘন্টার মতো সময় লাগবে দিল্লী পৌঁছাতে। কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলাম। রাতের আলোতে গাড়িটি চলতে লাগলো। আমরা বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম ড্রাইভারকে বললাম কোন ভালো খাবার দোকান থাকলে থামাতে। ঘন্টাখানেক পরে সে থামালো আমরা নেমে খেয়ে নিলাম। বেশ ঠান্ডা লাগছিল। ড্রাইভারকে খাবার জন্য বললাম সে খেল না। খাবারের রেস্টুরেন্টটির নাম ছিল খান’স রেস্টুরেন্ট। আমরা রুটি, ডাল, সবজি খেয়ে নিলাম সাথে বাটার ছিল। চারশ’ টাকার মতো বিল এলো।
গাড়িতে উঠে পড়লাম।  জানতে পারলাম অল্প সময়ের মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাব। গাড়ি চলতে লাগল তার নিজস্ব গতিতে। আমরা একটু স্বস্তি পেলাম। সত্যিই অল্প কিছু পরেই আমরা ইন্দিরাগান্ধী এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। গাড়ির ড্রাইভারকে বিদায় দিলাম। সময় তখন হাতে মাত্র ১ ঘন্টা। খুব তাড়া করে ইমিগ্রেশন পর্ব শুরু হলো। নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করলাম। সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে আমরা উঠে পড়লাম ‘স্পাইচ জেড’ বিমানে। আড়াই ঘন্টা আকাশে চেপে নেমে পড়লাম নেতাজী সুভাষচন্দ্র এয়ারপোর্ট, কলকাতা। আনুমানিক ৮টার দিকে লাগেজ নিয়ে আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম। উদ্দেশ্যে শিয়ালদহ স্টেশন যাব, যেমন ভাবনা তেমন কাজ। বের হলাম একটি প্রিপেইড ট্যাক্সি করে শিয়ালদহ স্টেশনে। খুব দ্রুত সেখানে পৌঁছে গেলাম। আমাদের লাগেজগুলো একখানে রেখে আমরা চলে আসি কলকাতা নিউমার্কেট। সামান্য কিছু কেনাকাটা করে চলে আসি শিয়ালদহ। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য জামা কাপড়, কিছু খাবার দাবার নিয়ে আমরা শিয়ালদহ স্টেশনে চলে আসি। এখন লক্ষ্য বাড়ি ফেরার। প্রফেসর মুজিব এবং প্রফসর রেজাও কিছু কেনাকাটা করলেন বাসার জন্য। আমরা খুব ব্যস্ততার মধ্যে বেনাপোলগামী ট্রেনে উঠে বসলাম। ট্রেনটি মানুষে ভরপুর ছিল। দিনটি বেশ বৃষ্টি স্নাত, রিমঝিম বৃষ্টির মধ্যে ট্রেনটি চলতে লাগল। ভালোই অনুভূতি কাজ করল নয়দিন তবু মনে হয় কতদিন বাড়ি, দেশ ছাড়া। বেশ মনে পড়ছিল ছোট্ট দু’টি বাচ্চার কথা। মনে হচ্ছিল বাড়িতে পৌঁছালেই স্বস্তিটা পাব। প্রফেসর মুজিব এবং রেজার চোখে মুখে যেন তৃপ্তির ছাপ দেখা গেলো। এটাই বোধ হয় দেশপ্রেম, ভালোবাসা দেশের প্রতি। যাইহোক, ক্লান্তির মধ্যে আমরা প্রায় ঘন্টা দু’য়ের মধ্যে ট্রেন স্টেশনে নেমে পড়লাম। ট্রেন থেকে নেমে ইজিবাইক করে বেনাপোল পৌঁছে গেলাম। ইমিগ্রেশনের নিয়ম কানুন মেনে বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন শেষ করলাম। বেশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হলো সবকিছু। বের হয়ে এলাম বেনাপোল কাস্টমস থেকে। তখন বিকেল ৪টা ৩০ বাজে। 
খুব দ্রুত একটা ট্যাক্সি নিয়ে বের হলাম ট্রেন স্টেশনের দিকে। ট্রেন ছাড়বে  বিকেল ৫টায়। আমরা ঠিক ৫টার একটু আগে ট্রেন স্টেশন পৌঁছে গেলাম। ট্রেনে উঠে পড়লাম। সন্ধ্যা সমাগত। ট্রেনে সিট নিয়ে বসে পড়লাম। বৃষ্টি পড়ছে। সুন্দর একটা অনুভূতি। বাড়িতে আসছি, দেশে এসেছি। মনে হলো নয় দিন নয়, নয় মাস দেশের বাইরে ছিলাম। রিমঝিম বৃষ্টি তখনও হচ্ছে। যশোরের অকৃত্তিম সৌন্দর্য্য বৃষ্টির ছোঁয়ায় যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। ধান গাছ, সূর্যমুখী, আলুর ক্ষেত অসাধারণ এক মায়াবী পরিবেশ আমাকে নস্টালজিক করে তুলেছিল। সবশেষ সকল চিন্তার অবসান করে আমরা এসে পৌঁছালাম খুলনা ট্রেন স্টেশন। নামলাম লাগেজ নিয়ে মনে হচ্ছিল এসেছি আমার ঠিকানায়, আমাদের ঠিকানায়। প্রফেসর মুজিব এবং প্রফেসর রেজা একটি ইজিবাইক ভাড়া করল আর আমি অন্য একটি ইজিবাইক করে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম যেখানে অপেক্ষার প্রহর গুণছে প্রিয়জনেরা। 

(লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।)

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

প্রখ্যাত সুফিসাধক খানজাহান (রহঃ)

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৪১


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪৩



হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:১৬


গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০০:১০


ব্রেকিং নিউজ