খুলনা | মঙ্গলবার | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ২ আশ্বিন ১৪২৬ |

শিরোনাম :

Shomoyer Khobor

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন | প্রকাশিত ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:১৬:০০

পীর খানজাহান আলী রাঃ এর স্মৃতি বিজড়িত, রূপসা আর ভৈরব বিধৌত আজকের মেগা সিটি আমাদের প্রিয় এই খুলনা। শতবছরের ঐতিহ্য আর বঞ্চনার ইতিহাস সযতেœ লালন করে গড়ে উঠছে আজকের খুলনা। ১৮৮৪ সালে পৌরসভার মর্যাদা প্রাপ্ত খুলনা এখন জেলা ও বিভাগীয় সদর দপ্তর। প্রায় ১৮ বর্গ মাইলের এই শহর মেট্রোপলিটন সিটি হিসাবে স্বীকৃতি পায় ১৯৯০ সালে। ঘনবসতির এই শহর এক সময় ছিল শিল্পসমৃদ্ধ কিন্তু আজ মৃত প্রায়। বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ শিল্প কলকারখানা। যে খালিশপুর অঞ্চল একসময় শ্রমিক আর শ্রমিক পরিবারের কলকাকলিতে মুখরিত থাকতো সেই খালিশপুর-দৌলতপুর অঞ্চল এখন মৃত নগরী। হাহাকার আর হতাশার সুর এখন নিত্যকার বিষয়। যে কয়েকটি শিল্প কলকারখানা এখনও নিবু নিবু করে কেরসিন প্রদীপের মত বেঁচে আছে তার শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরী পায় না, যা-ও পায় তা-ও অনিয়মিত। এরই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আজ আমরা উদ্যাপন করছি খুলনা দিবস।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের পরে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর খুলনা। জেলা এবং বিভাগের সদর দপ্তর এই শহরে অবস্থিত। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে রূপসা এবং ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত খুলনা দেশের প্রাচীনতম নদী বন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম। শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় খুলনাকে একসময় শিল্প নগরী হিসেবে ডাকা হত। খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিঃ মিঃ দূরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় মোংলা সমুদ্র বন্দর অবস্থিত। পৃথিবী বিখ্যাত উপকূলীয় বন সুন্দরবন খুলনা জেলার দক্ষিণাংশে অবস্থিত। খুলনাকে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বলা হয়। রাজধানী ঢাকা থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব সড়ক পথে ৩৩৩ কিঃ মিঃ। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে স্থলপথ, রেলপথ ও জলপথ ব্যবহার করা যায়। ১৯১২ সাল থেকে অত্র অঞ্চলে নদীপথে স্টিমার (স্টিমবোট) চলাচল করে। যদিও মাঝখানে একটি দীর্ঘসময় নৌপথের নাব্যতা সংকটের দোহাই দিয়ে স্টিমার চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার তা পূণরায় চালু করেছে।
প্রচলিত মতানুসারে খুলনা শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ভৈরব নদীর তীরে খুল্লেনেশ্বরী দেবীর মন্দির ছিলো এবং এই দেবীর নামানুসারে খুলনা অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে। অপর একটি মত হচ্ছে বণিক রূপচাঁদ-এর স্ত্রী খুল্লনা এর নামানুসারে খুলনার নামকরণ করা হয়। বণিক রূপচাঁদ-এর নাম অনুযায়ী রূপসা নদীর নামকরণ করা হয়।
শিক্ষা : খুলনা শহরে ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিএল কলেজ এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার চাহিদা মিটিয়ে আসছে। বিএল কলেজকে একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অক্সফোর্ড বলা হতো। এ কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি দেশ ও বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন। ১৯৯১ সালে খুলনাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। ২০০৩ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা পূর্বে বাংলাদেশ ইনিষ্টিটিউট অব টেকনোলজি, খুলনা নামে পরিচিত ছিল। সম্প্রতি দৌলতপুর কৃষি কলেজকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নিত করা হয়েছে। এছাড়া দৌলতপুর দিবা-নৈশ কলেজ, আজম খান কমার্স কলেজ, মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ, সুন্দরবন কলেজ, খালিশপুর মহসিন মহাবিদ্যালয়, শাহপুর মধুগ্রাম কলেজ, খুলনা পাবলিক কলেজ, পল্লী মঙ্গল বয়েজ ও গার্লস স্কুল, খুলনা জিলা স্কুল, করনেশন গার্লস স্কুল, পাইওনিয়ার কলেজ, আফিল উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাইওনিয়ার স্কুল, মন্নুজান স্কুল, রোটারি স্কুল, সেন্ট জোসেফ স্কুল, সেন্ট জেভিয়ারস স্কুল, খুলনা কলেজিয়েট স্কুল, ইকবাল নগর গারলস স্কুল, আর মাদ্রাসার মধ্যে দারুল কুরআন সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, খুলনা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম। মাধ্যমিক শিক্ষার পর কারিগরি শিক্ষার জন্য খুলনা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ও বিভিন্ন বেসরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট আছে। খুলনা পাবলিক কলেজ অত্র অঞ্চলের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। 
এক সময় খুলনা শিল্পশহর হিসাবে বিখ্যাত হলেও বর্তমানে এখানকার বেশিরভাগ শিল্পই রুগ্ন। পূর্বে খুলনাতে দেশের একমাত্র নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিল ছিল যা এখন বন্ধ রয়েছে। খুলনার বেশির ভাগ পাটকলগুলোও একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তবে সাগর জুট স্পিনিং মিলস (সেনহাটি) তার উৎপাদন, রপ্তানি ও বাজারজাতকরণ ধরে রেখেছে সুনামের সাথে। বর্তমানে খুলনার উল্লেখযোগ্য শিল্প হল বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা রপ্তানীযোগ্য মৎস্য শিল্প। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তারশিল্প কারখানা বাংলাদেশ ক্যাবল শিল্প লিমিটেড খুলনায় অবস্থিত। 
খুলনাকে এক সময় বলা হত রুপালি শহর। এর কারণ এই এলাকাতে প্রচুর পরিমাণ চিংড়ি উৎপাদন করা হত। এখনও হয়, যদিও কিছুটা কমে গেছে। আপনি খুলনার দৌলতপুরের মহসিন মোড় থেকে যতই পথ অতিক্রম করতে থাকবেন ততই দেখতে থাকবেন রাস্তার দু’ধার দিয়ে শুধু বিল আর মাছের ঘের। এসব ঘেরে সাদা মাছের সাথে চাষ হয় প্রচুর চিংড়ি। এছাড়া খুলনার পাইকগাছা, দাকোপ, কয়রা উপজেলাতে লোনা পানি ঘেরে প্রচুর পরিমাণ বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হয়। খুলনা অঞ্চলের ডুমুরিয়ার কিছু গ্রামে মৃৎশিল্পের অস্থিত্ব বিদ্যমান। এখানে মাটির টব কলসি হাড়ি পাতিল তৈরি করে কুমোরেরা। 
সবশেষে এটা বলা যায় যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুলনার রয়েছে প্রভূত অবদান। কিন্তু সে অনুযায়ী এর উন্নয়ন হয়নি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ যাবৎ কাল কেবল অবহেলিতই হয়ে এসেছে। এর অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল তা করা হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার অবহেলিত এ অঞ্চলের উন্নয়নে আরো বেশি সজাগ দৃষ্টি দেবেন। আমরা সম্মিলিত চেষ্টায় হাতে হাত রেখে আমাদের প্রিয় এই খুলনাকে তিলোতমা নগরী হিসাবে গড়ে তুলব। আজকের খুলনা দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : চেয়ারম্যান, খুলনা উন্নয়ন ফোরাম।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪৩



ভারত ভ্রমণে নয় দিন

ভারত ভ্রমণে নয় দিন

০৮ মে, ২০১৯ ০০:৫৯


গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০০:১০




ব্রেকিং নিউজ