খুলনা | মঙ্গলবার | ২১ মে ২০১৯ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

শিল্পোন্নত দেশে বিক্রির উদ্যোগ সময়ের দাবি

সুন্দরবনে পৌনে ছয় কোটি মেট্রিক টন কার্বন মজুদ

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:২০:০০


সুন্দরবনে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ মেট্রিক টন কার্বন মজুদ রয়েছে বলে সম্প্রতি এক সমীক্ষায় প্রকাশ করেছে বনবিভাগ। বিশ্ববাজারে শিল্পোন্নত দেশের কাছে এ বিশাল পরিমাণের কার্বন বিক্রি করলে বাংলাদেশের আয় হতে পারে ১৮ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। কোন ক্ষতি ছাড়াই সুন্দরবনের এ কার্বন বাণিজ্য সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে সুন্দরবনের এ কার্বন সম্ভার বিক্রির উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি, বললেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর সুন্দরবনের বৃক্ষ ও বন জরিপ কার্যক্রমের উদ্বোধন হয়। বৃক্ষ ও বন জরিপ-২০১৬, প্রণীত নকশা অনুযায়ী বাংলাদেশে এক হাজার ৮৫৮টি নমুনা প্লট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়; যার মধ্যে সুন্দরবনে ১৭৩টি। এ জরিপের মাধ্যমে বনজ সম্পদের পরিমাণ, বনের আচ্ছাদন, বৃক্ষ প্রজাতি, কাঠ ও জ্বালানী কাঠের পরিমাণ, বনাঞ্চলে মজুদ কার্বন এবং বন থেকে প্রাপ্ত সুবিধাদির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ইউএসএআইডি’র আর্থিক সহায়তায় এবং সিলভাকার্বন ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কারিগরি সহায়তা বৃক্ষ ও বন জরিপ কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করে বন অধিদপ্তর। এটি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জরিপে অংশগ্রহণকারী একাধিক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন। তারআগে, ২০০৯ সালে ‘সুন্দরবন ফরেন কার্বন ইনভেন্টরি-২০০৯’ নামে যৌথ সমীক্ষা চালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্র। যৌথ সমীক্ষায় গাছের সংখ্যা, ঘনত্ব, উচ্চতা, লতা ও গুল্ম এবং জৈব উপাদান মিলিয়ে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ মেট্রিক টন কার্বনের সন্ধান পায় বনবিভাগ। অথচ অর্থ ব্যয় করে এ সমীক্ষা করার পর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কার্বন বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক কার্বন স্টক মার্কেটে নিবন্ধন করা হয়নি। নিয়োগ দেয়া হয়নি কোনো আন্তর্জাতিক ব্রোকার হাউসকে।
জরিপ পরিচালনাকারী একাধিক বিশেষজ্ঞ জানান, কার্বন বাণিজ্যে সুন্দরবনের কোন ক্ষতিও হয় না। বিশ্ববাজারে কার্বনের দাম বাড়ছে। শিকাগো কার্বন মার্কেটের বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারদর অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৮ হাজার ৮১৬ কোটি টাকার কার্বন বিক্রি করতে পারে। অথচ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।
কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই কার্বন কিনে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ফরেস্ট  কার্বন ফ্যাসিলিটি তহবিল, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো কার্বন বাজার ও লন্ডনের আন্তর্জাতিক কার্বন স্টক মার্কেটের কেনাবেচা হয়। 
২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি কার্বন বাজার সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সাল পর্যন্ত কার্বনের দাম প্রতি মেট্রিক টন ৪০ থেকে ৮০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি মেট্রিক টন কার্বনের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের আওতায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত কিয়োটো প্রটোকল অনুযায়ী, কোন উন্নয়নশীল দেশ তার বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া বনাঞ্চলে পুনর্বনায়ন করলে শিল্পোন্নত দেশগুলো বনজ সম্পদের কার্বন কিনতে পারবে। কোন শিল্পোন্নত দেশ যে পরিমাণ কার্বন কিনবে, সেই পরিমাণ কার্বন নিঃসরণও করতে পারবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক নাজমুস সাদাত শুভ বলেন, সুন্দরবনের মজুদ কার্বন বিশ্ব বাজারে বিক্রি করলে কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে কার্বন মার্কেটে ঢোকার আগে কয়েকটি পদক্ষেপে কাজ করতে হবে। দেখতে হবে আমরা কতটা ডিফরেষ্ট্রেশন কমাইতে পারছি। তার উপরে নির্ভর করছে আমরা বিশ্ব বাজারে কতটা কার্বন বিক্রি করতে পারবো। আমরা এখনো ওই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি কার্বন মজুদ রয়েছে বাইন, পশুর ও কাঁকড়া গাছে। সুন্দরি গাছ মাঝারি ধরনের কার্বন ধারণ করতে পারে। সুন্দরবনের ৬২ শতাংশ এলাকায় গাছের সংখ্যা বাড়ছে, গাছের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বৃদ্ধিসহ চারা গজানোর পরিমাণও তুলনামূলক ভাবে ভালো। এদিকে জেগে ওঠা চরগুলোতে নতুন বনাঞ্চলও সৃষ্টি হচ্ছে- যদিও গেওয়া ও কেওড়া গাছের কার্বন ধারণক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। নেপাল ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ বিশ্ববাজারে কার্বন বিক্রি করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। কার্বন বিক্রি ছাড়াও জাতিসংঘের অধীনে তৈরি বনায়নের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো বা ‘রিডিউসিং ইমিশন ফ্রম ডিফরেস্ট্রেশন এ্যান্ড ফরেস্ট ডিগ্রেডেশনের (রিড)’ তহবিল থেকেও অর্থ পাওয়ার পথ খোলা আছে।
প্রধান বন সংরক্ষক শফিউল আলম চৌধুরী টেলিফোনে বলেন, শিল্পোন্নত দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অতি কার্বন নির্গমনকারী; তাদের কাছে সুন্দরবনের কার্বন বিক্রি করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক ব্রোকার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে সুন্দরবনের কার্বন ধারণ ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। পরে আরও কয়েকটি বনাঞ্চলকেও আন্তর্জাতিক বাজারে নেয়া হবে।
পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার বলেন, কার্বন বিক্রির ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে। কার্বন বিক্রি করে সরকারের পাশাপাশি সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয় মানুষেরাও যাতে লাভবান হতে পারে সেটাও বিবেচনা করা হবে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ










যাকাত গরিবের হক

যাকাত গরিবের হক

২১ মে, ২০১৯ ০০:৫২