খুলনায় মাদকের পর দ্বিতীয় স্থানে নারী-শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা


মরণ নেশা মাদক মামলার পর খুলনায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা। প্রতি মাসে গড়ে ৫ নারী ও শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের হচ্ছে। জেলার তুলনায় মহানগরীতে ধর্ষণের সংখ্যা তুলনামূলক বেশী। গত ২৩ মাসে মহানগরী এলাকায় ৭৩টি ও জেলার থানাগুলোতে ৫৭টি ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। 
জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালের মে থেকে চলতি ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৩০ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। অধিকাংশ মামলার চার্জশীট হয়েছে। এ বছরের গত তিন মাসে জেলার ৯ থানা ও মহানগরের ৮ থানায় ৫০টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। 
সম্প্রতি সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা আটরার আফিল জুট মিল এলাকায়। গত ২৯ জানুয়ারি আফিল জুট মিলস্ সিটি গেট এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে আটরা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ধর্ষিত হয়। এখানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তিন বন্ধু মিলে ধর্ষণ করে। তার পিতা বাদী হয়ে একই দিনে খানজাহান আলী থানায় মামলা করে। ধর্ষিতা ২৯-৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে চিকিৎসাধীন ছিলো। এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে আটরা মশিয়ালী গ্রামের রুস্তুম আলীর ছেলে সাগর আলী, রেনু মিয়ার ছেলে বিল্ল¬াল ও টোকান আলীর ছেলে শফিককে পুলিশ গ্রেফতার করে। 
এছাড়ও ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নগরীর লবণচরা থানাধীন বুড়ো মৌলভীর দরগা এলাকার ৩নং গলির ঢাকাইয়া হাউজ এ.পি ভিলা নামের বাড়িতে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা গণধর্ষণের শিকার হয়। এ সময় ৫ জন মিলে গণধর্ষণের পর পারভীন সুলতানা ও তার পিতা ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যা করে। কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে এক্সিম ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে উত্ত্যক্ত করতো এলাকার কয়েকজন বখাটে সন্ত্রাসী। তাদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় এ লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিলো। বাবা-ও মেয়েকে হত্যার পর বাড়ির ভেতরে সেফটি ট্যাংকির মধ্যে লাশ ফেলে দিয়ে গুমের চেষ্টা করে খুনিরা। পরে তাদের ঘরে টাকা পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় লবণচরা থানায় পারভীন সুলতানার ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব বাদী হয়ে হত্যা, ডাকাতি ও গণধর্ষণের অভিযোগে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক হিসেবে চিহ্নিত হয়। 
এ হত্যাকান্ডের সাড়ে ৬ মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ৯ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই মোঃ কাজী বাবুল খুলনা’র মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। এছাড়া ধর্ষণের মামলায় একই বছরের ২৪ মার্চ আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হয়। এ দু’টি মামলার চার্জশীটভুক্ত ৫ আসামিরা হচ্ছে লবণচরা থানাধীন বুড়ো মৌলভীর দরগা এলাকার সাইফুল ইসলাম পিটিল, মোঃ লিটন, আবু সাইদ, মোঃ শরিফুল ও মোঃ পলাশ। এদের মধ্যে শরিফুল পলাতক বাকী ৪ জন কারাগারে রয়েছে। 
অন্যদিকে খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ২০০২ সালের মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। 
খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আনিছুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে ধর্ষণের অভিযোগ আসলে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা রেকর্ড হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অনেক সময় ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা থানায় আসেন। তদন্ত শেষে চার্জশীট দেওয়া হয়। জেলায় এ অপরাধ কমেছে বলে তিনি দাবি করেন। 
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এর পাবলিক প্রসিকিউটর জেসমিন পারভীন জলি জানান, জেলায় তিনটি আদালতে এ সংক্রান্ত মামলার বিচার হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল-৩ এ তিন হাজার মামলা বিচারাধীন। প্রতি মাসে গড়ে ৮-১০টি মামলার রায় হচ্ছে। ২০০২ সালের মামলা এখনও বিচারাধীন। ধর্ষণ মামলার বিচার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। 
খুলনা জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডাঃ মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনার পর একবার গোসল ও দুইবার প্রস্রাব হলে আলামত নষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে মেডিকেল টেস্ট ধর্ষণ প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য হয়। 
রূপসা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ইলিয়াছুর রহমান গত মাসের আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উল্লেখ করেন, ছেলে মেয়েরা সামাজিক মননশীল কাজে নিয়োজিত হলে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হবে না। 
মানবাধিকার কর্মী এড. মোমিনুল ইসলাম জানান, জেলার তিনটি আদালতে বিচার চলছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়ায় এ অপরাধ দিন দিন কমছে। 
মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক রসু আক্তারের মতে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। মাদ্রাসা ও মন্দিরে এ ঘটনা ঘটছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। 
 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।