খুলনা | শনিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

ভিনদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে বাঙালির নিজস্ব স্বত্তা কি হারিয়ে যাবে?

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৪০:০০

ঘটা করে বর্ষবরণে দ্বিমত থাকলেও চিরায়ত ঐতিহ্য ও নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণে আপোষ নেই কারো। তবে নানান দেশের সংস্কৃতি আজ গ্রাস করছে বাঙালি স্বত্তা। আকাশ সংস্কৃতি আর ইন্টারনেটের অত্যাধুনিকতায় আজ বাঙালি একাকার। ভিনদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে জীবন-যাপন অভ্যস্ত বাঙালি এখন সংকর জাতি। বাঙালিয়াপনা এখন উদ্যাপনের বিষয় জীবন চিরচারিত নয়। আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে এসব নিয়ে কেউ না ভাবলেও বাংলার শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শ্বাশত বাঙালি কৃষ্টির ধারক কামার-কুমারদের এসবে ভাবনান্তর ঘটেছে। উপরোক্ত মন্তব্য করে তারা এ জাতির সামনে প্রশ্ন রেখেছেন-এভাবে কি বিলীন হয়ে যাবে বাঙালি জাতির নিজস্ব স্বত্তা?
“সার্বজনীন উৎসবের মধ্যে পহেলা বৈশাখ প্রধান। গ্রামাঞ্চলে নবান্ন, পৌষ পার্বণ ইত্যাদি লোকজ উৎসবের প্রচলন রয়েছে। হারিয়ে গেছে জারি-সারি-ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী, গম্ভীরা, কবিগান ও যাত্রাপালা। এক সময় বাঙালি জীবনে প্রবাদ ছিল-‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু পুকুরভরা মাছ।’ এখন আর এই প্রবাদ বাক্যটি উচ্চারিত হয় না। কারণ সমাজ-কাঠামোর বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে। জমির আয়তন বাড়েনি, কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে, উৎপাদন কমেছে, তবে অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহারে হাইব্রিডের আমদানি ঘটেছে। তাই প্রয়োজনের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ফলে ধাক্কা লেগেছে সাংস্কৃতিক বোধে। নড়ে গেছে সমাজ কাঠামোর পাটাতন।” কথাগুলো বললেন বিবেকানন্দ শিক্ষা ও  সংস্কৃতি পরিষদ খুলনা মহানগর সভাপতি ও সবুরুন্নেছা মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ দেবদাস মণ্ডল।
তিনি আরও বললেন, “এখনি বাঙালির নিজস্ব সত্তায় ফিরে না এলে, একটা সময় বিলোপ হবে বাঙালি সংস্কৃতি। বর্তমান প্রজন্মকে প্রশ্ন করা হলে সকলেই কি বলতে পারবে, আমাদের জাতীয় পোশাক কি, জাতীয় খেলা কি? নৃত্যশিল্পের নানা ধরণ বাংলাদেশে প্রচলিত ছিল। এখন উপজাতীয় নৃত্য, লোকজ নৃত্য ও শাস্ত্রীয় নৃত্য কোথায়? একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বিদেশী কীবোর্ড, ড্রামস, গীটারের আধুনিকতার মিশ্রণে হারিয়ে যাচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে আধুনিকতা প্রয়োজন আছে; তবে বাঙালির নিজস্ব স্বত্তা বিলীন করে দিয়ে নয়। এইতো সেদিন বাঙালি বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, লক্ষ্য জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি; আর আজ ভিনদেশী অনুসরণে বাঙালি সংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে। এটা কি দুঃখের নয়? আপদমস্ত এই শিক্ষকের সবচেয়ে বড় আপত্তি, বাংলাকে ইংরেজি অক্ষরে লেখা। বর্তমানে যা বাংলিশ বলে পরিচিত।
সরকারি বিএল কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শংকর কুমার মল্লিক বলেন, “বাঙালি ঐতিহ্য সুদীর্ঘকালের। এটা একবারে ধ্বংস হয়ে যাবে না। কিন্তু সভ্যতা ও সংস্কৃতি সমান তালে চলে না। উত্থান-পতন হয়। আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অতিব্যবহার/অপব্যবহার আমাদের যান্ত্রিক করে তুলেছে। প্রযুক্তি খারাপ নয়; তবে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে নিজস্ব স্বত্ত্বা বিসর্জন দেয়াটাই খারাপ। তাছাড়া ‘কর্পোরেট কালচার’ ক্রমশঃ আগ্রাসন ছড়াচ্ছে। তরুণ ও যুব সমাজের ঐতিহ্যমুখী হওয়া উচিত; বাস্তবতা উল্টো প্রযুক্তি নির্ভর। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মনষ্ক হচ্ছি না। ভাষার ব্যবহারও বিকৃতি করছে আমাদের তরুণ ও যুব প্রজন্ম। অবশ্যই তাদের কেউ কেউ মঙ্গলশোভাযাত্রা বের করছে। পহেলা বৈশাখ অসাম্প্রদায়িক উৎসব; সকল ধর্ম-বর্ণের মিলন নববর্ষে। তবে সেটা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে।”
বুটিকস্ হাউজ ‘গৃহসুখন’-এর স্বত্বাধিকারী সালমা রহমান বলেন, “বিদেশী ফ্যাশানে বাঙালি নারী আজ দেশীয় পোশাক ভুলতে বসেছে। টিভি সিরিয়ালে যেমন দেখেন, তেমন পোশাক চাই। এমনকি বিয়ের পোশাকেও পরিবর্তন এসেছে। রুচিশীল আধুনিক পোশাক অবশ্যই ভালো; তবে নগ্নতা বাড়ছে কেন?”
নাট্য নিকেতনের কর্মী নিয়ামুল ইসলাম কচি বললেন, “মঞ্চ নাটকের আবেদন নেই এখন আর। ইন্টারনেটযুক্ত মুঠোফোনেই গোটা বিশ্ব/বাংলা সংস্কৃতি আজ নিঃস্ব, ঘরে ঘরে ডিশ/ হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ইশ্..!” একটু রসাত্মক ভঙ্গিতে এভাবেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন এ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
এদিকে, দিঘলিয়ার সেনহাটির পালপাড়ার কুমার বিনয় কুমার পাল বলেন, “প্রতিদিন আয় কমছে। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমছে; বাজার এখন প্লাটিকের দখলে রে দাদা। বংশপরম্পরার ঐতিহ্যের এ পেশা ছেড়ে জুটমিলে কাজ করছে অনেকেই। এবার পহেলা বৈশাখে খুলনার নিউমার্কেটের জন্য মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক, হরিণ, হাড়ি, চুলা ও কিছু খেলনা বিক্রি করেছি; তাতে হাজার ত্রিশেক টাকা আয় হইছে। এর আগে পঞ্চাশ হাজারের বেশি আয় হতো। মাটির জিনিসপত্র এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। বাঙালি এখন চায়না জিনিসপত্রে ডুবে আছে। এখনকার দিনে পালকি-ই হারিয়ে গেছে আর কোথায় কামার-কুমার!”
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

এখন বর্ষাকাল : আরও গাছ লাগান

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

ঘর হোক নারীর নিরাপদ স্থান

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

জাতীয় শোক দিবসের অঙ্গীকার 

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪১


বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৪৩



ভারত ভ্রমণে নয় দিন

ভারত ভ্রমণে নয় দিন

০৮ মে, ২০১৯ ০০:৫৯

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

হাতে হাত রেখে গড়বো খুলনা

২৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:১৬

গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

গ্রন্থাগার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ফসল

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০০:১০



ব্রেকিং নিউজ









লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

লবণচরায় এক বছরে তিন দফায় গরু চুরি

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:৫৩