খুলনা | বুধবার | ২১ অগাস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা

ওমর খালেদ রুমি | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৮:০০

বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা


ঐ নতুনের কেতন ওরে কাল-বোশেখীর ঝড়। 
তোরা সব জয় ধ্বনী কর! তোরা সব জয় ধ্বনী কর!
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঃ প্রলয়োল্লাস
প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। এই দিনটিতে সরকার জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছেন এবং সারাদেশে সাড়ম্বড়ে দিনটি উদযাপিতও হচ্ছে। একথা সত্য যে আমরা কম বেশি সবাই এই সংস্কৃতির সাথে যেমন যুক্ত তেমনই এর একটু আধটু ইতিহাসও সবার জানা। আর কিছু না হোক প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আমরা পুরুষেরা যেমন লাল আর সাদা মেশানো পাঞ্জাবি-পাজামা তেমনি মহিলারা লাল আর সাদা মেশানো শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজ অথবা ফতুয়া পরে থাকি। সেই সাথে সাথে বাঙালির চিরন্তন আয়োজন পান্তা ইলিশ তো থাকছেই। যদিও বলা হয় পান্তা ইলিশ কিন্তু সাথে থাকে নানা ধরনের ভর্তা, শুটকির বিভিন্ন পদ আর শুকনো মরিচ পোড়ানোর মতো সুস্বাদু আয়োজন। বছরে অন্ততঃ এই একটি দিনের জন্য হলেও আমরা খাঁটি বাঙালি হওয়ার চেষ্টা করি। আমি এমনটাও দেখেছি যে বিদেশে অবস্থানরত অনেক বাঙালিই একটি দিন উদযাপনের জন্য দেশে চলে আসেন। বলাবাহুল্য এটা শুধু কোন উৎসব নয়। এটা আমাদের এক ধরনের নাড়ির টান, শেকড়ের সন্ধান। আবহমান বাংলার যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যার মূলে রয়েছে মূলত মায়া-মমতা, স্নেহ- ভালোবাসা, প্রেম আর আতিথেয়তা তার মর্ম অনুসন্ধানের যে চিরন্তন চেষ্টা তারই বহিঃ প্রকাশ এই পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ তাই শুধু বাংলা বছরের শুরুই নয়, এটা যেন আমাদের সংস্কৃতিরই একটা সুগভীর আর চেতনাময় পার্বণ। 
পুরনো বছরের ক্লান্তি আর কালিমা মুছে ফেলে দিয়ে নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ের আহবানে নতুন শুরুর লক্ষ্যে অস্তিত্বের মর্মমূলে এই যে অবগাহন তার মূলে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলা নববর্ষেও যে ইতিহাস তার সন্ধান অনেকেই আকবরের শাসনামলের মধ্যে সন্ধান করলেও মূলতঃ ইতিহাস যে সাক্ষ্য দেয় তাতে এর মূল অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলা সনের যে প্রকাশ হয় “বঙ্গাব্দ” শব্দের মাধ্যমে তার সন্ধান পাওয়া যায় আরো অনেক অতীতে হিন্দু মন্দির গাত্রে উল্লেখিত লিপিতে। এমনকি শুধুমাত্র বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা ও আসাম এর কিছু অংশে এটা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উদযাপিত হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন দক্ষিণ ভারত, উত্তর প্রদেশ কিংবা আরো কোন কোন এলাকায় পৃথক নামে যেমন মধ্য ও উত্তর ভারতে “বৈশাখি”, কেরালায় “বিশু” নামে উদযাপিত হতে দেখা যায়। সেসব জায়গায় অবশ্য ব্যাপারটি কিছুটা হলেও ধর্মীয় পূজা পার্বণ এর মাধ্যমে উদযাপিত হতে দেখা যায়। বৈশাখ শব্দটির সাথে বিশাখা নক্ষত্রের যে সম্পর্ক সে কথা বিশাখা নামক দেবীর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। 
সবচেয়ে বড় কথা আজ আর কেউ অতীতের এইসব যোগসূত্র খুঁজতে রাজি নয়। ইতিহাসে বিষয়টি নিয়ে সবাই এতোটুকুই ঘাটতে রাজী যে সম্রাট আকবর তার ফসলের খাজনা আদায় করার লক্ষ্যে আরবি ও ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসরণ করতে গিয়ে যে সমস্যায় পড়েছিলেন তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে তার সভাসদদের মধ্যে থেকে একজন পন্ডিত ফতুল্লা সিরাজি কে একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার ফলশ্র“তিতে সম্ভবত তিনি পুরনো বাংলা ক্যালেন্ডার সংশোধন করে সময় এবং কার্যোপযোগী একটি বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিলেন। আর সেই থেকে ব্যাপারটিও বাংলা সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে যায়। সম্রাটের রাজকীয় প্রয়োজনে পুরনো প্রথা সংস্কার করা হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীদের আয়োজনে পহেলা বৈশাখ রাষ্ট্রীয় উদযাপনের মর্যাদা পায়। সেই থেকে প্রতিবছর এটা একটা ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। এখন প্রতিবছরই এটা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে আরো নতুন নতুন সাজে নতুন মাত্রায় এমনকি নতুন ব্যাপ্তিতে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হতে দেখা যায়। 
সাম্প্রতিক সময়ে এটি উদযাপনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ এটাকে পুরোপুরি বর্জন করতে বলেছেন। কেউ আপত্তি করেছেন এর শোভাযাত্রা নিয়ে। কেউ বলেছেন শোভাযাত্রায় প্রাণীর প্রতিকৃতি ব্যবহার সঠিক নয়। কেউ কেউ আবার বলেছেন নারী-পুরুষের এই যৌথ মহড়া আর মিলন মেলা ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী।
আচার-অনুষ্ঠান যাই হোক আর তর্ক-বিতর্ক যাই থাকুক শৈশবে আমরাও দেখেছি আমাদের মা-খালা-চাচিরা বছরের প্রথম দিনে ভালো-মন্দ রান্না করেছেন, নানা ধরনের পিঠা-পায়েস তৈরি করেছেন। সবাই নতুন অথবা ভালো আর পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করেছেন। লোকজন এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গেছে বেড়াতে কিংবা নেমন্তন্ন খেতে। নানা ধরনের মিষ্টি দ্রব্য কিনে আনা হয়েছে কিংবা বাড়িতেই তৈরি করা হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে কোথাও কোথাও জমে উঠেছে গান-বাজনা, যাত্রাপালা। দোকানিরা মেতে উঠেছে হালখাতার আয়োজনে। পুরনো বছরের হিসাব মিলিয়ে নতুন বছরের নতুন হিসাব দিয়ে তারা নতুন করে তাদের লেনদেন শুরু করেছে। 
এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমরা এর দ্বারা পিড়ীত এবং তাড়িত হয়েছি। আমাদের সমাজ জীবনে এর ব্যাপক প্রভাব। একে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ কখনোই ছিল না। না চাইলেও সবাই এর সাথে কোন না কোন ভাবে জড়িয়ে যেত। মূলত আমাদের নাগরিক প্রজন্মকে বছরে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য যে আয়োজন তাকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। 
যদিও আজকাল বাংলা তারিখ শুধু তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আবহমান বাংলার কৃষি প্রধান সমাজ তার চাষবাস, বীজ বপন, চারা রোপন, ফসল তোলা এসবের সবই জড়িত ছিল এই বাংলা ক্যালেন্ডার এর সাথে। ঘরে ঘরে তখন পঞ্জিকা ছিল অতি প্রয়োাজনীয় একটা বস্তু। বর্তমান প্রজন্ম পঞ্জিকা কি জিনিস তা হয়তো জানেই না। বাঙালির যে সংস্কৃতি তাকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ খুব একটা বাঙালির নেই। কখনো ছিলোও না। আধুনিকতা যতই আমাদের গ্রাস করুক না কেন আমাদের মূল মূলত এই মাটি আর মানুষের মাঝেই প্রোথিত। গ্রাম বাংলার চিরন্তন সংস্কৃতির মধ্যেই আমাদের প্রকৃত বাঙালিয়ানা। পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে বার বার ফিরে আসুক এই প্রত্যাশাই রইল। 
সবাইকে পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ