খুলনা | সোমবার | ২২ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬ |

শিরোনাম :
খুলনায় ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত ২১ রোগী শনাক্তপ্রিয়ার বিরুদ্ধে খুলনা যশোরসহ ৪ জেলায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার ছয়টি আবেদন খারিজযশোরসহ ৪ জেলার মাত্র একজন বিচারকের হাতে ১৭শ’ ৭০ মামলা : স্টাফ মাত্র দু’জনখুলনার বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে এ্যাডেনিয়াম ফুল গাছ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের আগে আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’প্লাটিনাম জুট মিলের চারটি ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা জীবনের ঝুঁকিতে শ্রমিক পরিবারের সদস্যরারাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতি একসঙ্গে অনুসরণ করুন : রাষ্ট্রদূতদের প্রধানমন্ত্রীপ্রি-একনেকে অনুমোদনের পর কেটেছে ১০ মাস, একনেকে ওঠেনি শের-এ বাংলা রোড চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প

Shomoyer Khobor

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

তরুণ কুমার বিশ্বাস | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭:০০

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

ষড় ঋতুর রঙ্গশালায় টগরে-বকুলে ছাওয়া এই বাংলা। আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। ঋতুরাজ বসন্তের অন্তিম পদধক্ষনিতে আমাদের নববর্ষের প্রীতিপদ শুভাগমনÑ শুভ-পদার্পণ। প্রাপ্তির প্রত্যাশায় অনিন্দ্যসুন্দর মাহেন্দ্রক্ষণ পহেলা বৈশাখ ১৪২৬, বঙ্গাব্দ ‘নববর্ষ’ বুঝি এলো-রে। ছন্দে ছন্দে সুরের ঝংকার-
‘এসো হে-বৈশাখ, এসো এসো।’
বৈশাখ বরণের রঙিন নেশায় বাঙলিরা আজ মনে-প্রাণে নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, ডাক-ঢোল-তবলা, ইলিশ-পান্তাসহ নানান আনন্দ ঘন জমকালো আনুষ্ঠানিকতায় মাত্র একদিনের জন্যেই খাঁটি বাঙালির কৃত্রিম ভূমিকায় মেতে উঠি। সত্যিকার অর্থে আমরা নববর্ষের পহেলা বৈশাখেই বিদেশি সংস্কৃতিকে মন থেকে বিতাড়িত করি। আমরা ভুলে যাই, খাঁটি বাঙালির অতীত ঐতিহ্যের সেই সব হারানো দিনগুলোকে। বাঙালিত্ব বাঙালিরি অস্থি-মজ্জায়-শোণিতে মিশে আছে কালে-কালে, যুগে-যুগে। স্মর্তব্য যে, বাঙালির বাঙালিত্ব নয় ক্ষণিকের, নয় একদিনের।
ইতিহাসে হাতড়ালে খুঁজে পাওয়া যায়, এক সময়ে নববর্ষসহ বিবিধ অনুষ্ঠানে (একুশে ফেব্র“য়ারি) অঙ্কিত আল্পনা ছিল হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি তথা অস্তিত্ববাদের নিদর্শন। এই অপপ্রচারে হিন্দু/মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সমাধানকল্পে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন খাঁটি বাঙালিত্বের পরিচয় দেন। তিনি খাঁটি বাঙালি হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রমাণ করতে সক্ষম হন- “আমি খাঁটি বাঙালি, বাংলা আমার মা, বৈশাখ আমার সংস্কৃতি এবং নববর্ষ আমার সনাতনি ঐতিহ্য- বাঙালিত্ব একদিনের নয়।” 
জাতির জনক, জাতির পিতা, স্বাধীনতার স্থপতি, কিংবদন্তির ধারক-বাহক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনে-প্রাণে খাঁটি বাঙালি এবং দেশ প্রেমিক ছিলেন। তিনি ‘উড় ড়ৎ ফরব’ অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আমাদের উপহার দেন লাল-সবুজের পতাকা, জাতীয় সংগীত, পৃথিবীর মানচিত্রে প্রিয়স্বদেশ জন্মভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ। উল্লেখ্য যে, ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্র“য়ারি শহিদ দিবস তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির জাতির জীবনে এক মহিমোজ্জল দিন। ভাষার জন্যে জীবন দিতে হয়েছে এমন ইতিহাস বিশ্বে বিরল। আর এই বিরল ইতিহাসের সাক্ষী সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম-না-জানা আরও অনেক বীর বাঙালি, বীর শহিদ- যাঁদের রক্তের দামে কেনা এই মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা আর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্যে আজকের দিনে তাঁদেরকেও জানাই শ্রদ্ধান্বিত প্রণতি। কাজেই আমরা বীর বাঙালী, আমরা হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের, আমারা নমস্যের। এই বাঙালিত্ব আমাদের অহঙ্কার, অলঙ্কার, গর্বের, চিরদিনের-চিরকালের। 
বিশ্ববন্দিত ও নন্দিত কবি কবিগুরু, কবিবর, কবি সস্রাট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে ‘নোবেল পুরস্কার’ প্রাপ্তির সুবাদে অনেক পাশ্চাত্য দেশ ঘুরে উপলব্দি করেন- তুলনামূলক ভাবে বাঙালির ঐহিত্য ও সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ। 
তাই বিদেশি সংস্কৃতি প্রেমী মুর্খ বাঙালিদের উদ্দ্যেশ্য করে রবি ঠাকুর উচ্চারণ করেন-
 “মানুষ হ মানুষ হ
 আবার তোরা মানুষ হ
 অনুকরণ খোলস ভেদি
 কায়মনে বাঙালি হ।”
কবি বিদেশি কৃত্রিম সংস্কৃতি ভুলে, পরানুকরণ ভুলে খাঁটি বাঙালী হওয়ার কথা বলেছেন। 
মহাককি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল ধ্র“বতারা। তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিককে উপেক্ষা করে ইংরেজি সাহিত্যে বড় কবি হওয়ার দুর্মর বাসনায় ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে যান। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্বনামধন্য ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ “ঞযব ঈধঢ়ঃরাব ষধফু’’ রচনার পরে ঈর্ষান্বিত ইংরেজরা উচ্চারণ করেন- “ডব ফড়হ’ঃ ধিহঃ ধহু ড়ঃযবৎ ঝযধশবংঢ়বধৎব ড়ৎ গরষঃড়হ রহ ঊহমষরংয ষরঃবৎধঃঁৎব” প্রাপ্তির পত্যাশার পরিবর্তে অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস কুঁরে কুঁরে খায় তার মৃতপ্রায় হৃৎপিন্ডটাকে। তাইতো  কবির বেদনা বিধুর বিলাপ- ‘সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে’/‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’/‘কেলুনি-শৈবালে, ভুলি কমল কানন।’  সুতরাং জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ষোল আনা খাঁটি বাঙালি হবো-এই হোক আমাদের কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা ও প্রতিজ্ঞা। 
আমরা জাতে বাঙালি, ভাতে বাঙালি, মাছে বাঙালি, একতারা-দোতারায় বাঙালি আর বাঙালিত্ব আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ব, সম্পদ ও সত্তা। অথচ আমরা নববর্ষের পহেলা বৈশাখকেই কেবলমাত্র বাঙালি হিসেবে ভাবতে পছন্দ করি। কিন্তু নববর্ষ উদ্যাপন শেষ হতে না হতেই }} ৪ পাতার ১ কলাম 
আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে, সত্তাকে অস্বীকার করি। আমরা ভাবি, আমাদের ‘স্টাটার্স’ মূলতঃ দক্ষতার সাথে ইংরেজিতে কথা বলার আর চাইনিজ রেস্টুরেন্টে উন্নতমানের খাবার খাওয়ার। তাই বোধ করি, বোবা সংস্কৃতি তথা বুর্জুয়া বিলাসী নির্বোধ মূর্খ বাঙালির ‘পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উদ্যাপন।’ 
পরিশেষে বলতে চাই, বাঙালি যদি বিদেশি হতে চাও-তাহলে কেন বায়ান্নর ভাষা শহিদেরা ভাষার জন্যে জীবন দিল? বাঙালি যতি বিদেশি হতে চাও, তা’হলে স্বাধীনতা যুদ্ধে কেন ত্রিশ লাখ শহিদ প্রাণ হারালো? মা কেন স্বামী-সন্তান হারিয়ে পথের ভিখারিনী হলো, কেন মা-বোনের সম্ভ্রম আর ইজ্জত ভূ-লুন্ঠিত হলো? জাগো-বাঙালি জাগো। সুতরাং বাঙালিত্ব একদিনের নয়-বাঙালিত্ব চির ভাস্বর, চির অন্তান। তাই আসুন, সকল বাঙালি সমস্বরে উচ্চারণ করি-‘জয় হোক বাংলার, জয় হোক বাঙালির, জয় হোক বাঙালিত্বের।’

লেখক : সহকারি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (বাংলা)
বাঁকড়া ডিগ্রী (অনার্স) কলেজ
ঝিকরগাছা, যশোর।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন






ব্রেকিং নিউজ