খুলনা | বুধবার | ২১ অগাস্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’

মাওলা বক্স | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫:০০

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’


আজ পহেলা বৈশাখ। নতুন স্বপ্ন, নব উদ্যম ও কাক্সিক্ষত প্রত্যাশার আলোয় রাঙানো নতুন বাংলা বৎসরের শুভ দিন। অতীতের সব পাওয়া না পাওয়ার বেদনাকে ধুয়ে মুছে আবারো  নবরূপে এসেছে পহেলা বৈশাখ। আজকের এই নতুন প্রভাতেই বাঙালির কায়-মনো-বাক্যে প্রার্থনা হোক, যা কিছু ক্লেদাক্তময়, গ্লানিময়, যা কিছু জরা-জীর্ণ-শীর্ণ, সবই বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। গ্রীষ্মের এই তাপস নিশ্বাসে ভর করে পুরনো বছরের সব নিষ্ফল উড়ে যাক, যাক দূর দিগন্তে মিলিয়ে। বর্ষবরণের উৎসবের আমেজে মুখরিত থাক বাংলার চর্তুদিক। প্রতিটি পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাক কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্যতা। পৃথিবীর সমস্ত বাঙালির পরম আনন্দের দিনটিই পহেলা বৈশাখ। 
চৈত্র মাসের শেষে বৈশাখের আগমনে বাঙালির হৃদয়ে ঝংকার দিয়ে উঠুক নববর্ষের এই বার্তা। এক সময় অধিকাংশ বাঙালিই পহেলা বৈশাখ উৎসবকে শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব বলে উড়িয়ে দিত। কিন্তু কালাবর্তে তা সকল বাঙালি জাতির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। 
বাঙালির যে কয়টি সর্বজনীন উৎসবের মাঝে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে, এর অন্যতম হলো পহেলা বৈশাখ। এর রূপ-রস-ছন্দে বাঙালি জীবন যেন নব থেকে নবতর হয়ে উঠে। শুধু উপলব্ধিতে এর আনন্দময় বীণার তান্ সদা ধ্বনিত হতে থাকে হৃদয়ে। তাই বছর ঘুরে বৈশাখ আসে বাঙালির জীবনে তার চিরচেনা মোহিনীরূপে। 
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, মোগল সম্রাট আকবর তাঁর রাজকীয় জ্যোতিষী আমির ফাতেউল্লাহ সিরাজীর মাধ্যমে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সনের সংস্কার সাধন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় রূপান্তরিত বঙ্গাব্দের জন্মবেদন রহস্য। সেই সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। তাই পহেলা বৈশাখ আজ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল পরিচয়কে ছাপিয়ে বাঙালি জীবনের এক অত্যাবশ্যকীয় সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বহুকাল পূর্ব থেকে এই উৎসবে বাঙালিরা প্রত্যেকে তাদের ঘরে ঘরে পান্তাভাত, খই, মোয়া, হরেক রকম পিঠা ও বাঙ্গালি ঐতিহ্যের বিভিন্ন খাবার রন্ধন করে মহা ধুমধাম এবং জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে অতিথিদের আপ্যায়নের মাধ্যমে লোকজ উৎসব সার্থক করত। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশের নাগরিকরা  তাদের  নববর্ষকে বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে বরণ করে নেয়। বাংলাদেশের মানুষও বাংলা সালের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে ব্যাপক আনন্দ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদ্যপন করে। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালির একান্ত স্বকীয় উৎসব। বাঙালির একটি প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। বাংলা সনের প্রথম দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলার নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালি জাতির একটি সার্বজনীন লোকজ উৎসব। এ দিন অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। মঙ্গল ও নবজীবনের শুভযাত্রার প্রতীক হলো এ নববর্ষ। বাঙালিদের বিশ্বাস নববর্ষ অতীতের জীর্ণ-শীর্ণ, দুঃখ-দুর্দশা, বিষাদ ও ক্লীবতা ভুলে গিয়ে মানুষকে নবোদ্যমে পথ চলার আশা জাগায়। অতীতের ভুলত্র“টি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যপিত হয় নববর্ষ। এক সময় এ নববর্ষ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতু নির্ভর। ধারণা করা হচ্ছে, কৃষিকাজের সুবিধার্থেই ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের গোঁড়াপত্তন হয়েছিল। প্রবর্তিত নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত থাকলেও, পরবর্তীতে তা বঙ্গাব্দ নামে বিশ্বমাজারে পরিচিতি পায়। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত সম্রাট আকবর শাসনামল থেকেই। সেই সময় কৃষকরা পুরো বছরের খাজনা চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত রাজা, জমিদার ও মহাজনদের পরিশোধ করতো এবং তারা পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে প্রজা, বর্গাচাষি ও কৃষকদের মিষ্টিমুখ করাতেন। সকল ভেদা-ভেদ ভুলে গিয়ে তখন এককাঁথারে রাজা-প্রজা মিলেমিশে বিভিন্ন লোকজ উৎসবে মেতে উঠতেন। বাংলা কৃষকের কাছে বৈশাখ মাসে খাজনা দেয়ার মাস শুরু হওয়ায় এতে নতুন মাত্রা যোগ হয় নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁনের আমলে। সম্রাট আকবরের সূত্র ধরেই নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁন খাজনা আদায়ে প্রজাদের অনুরোধে বৈশাখের প্রথম দিনে পুণ্যাহ নীতি চালু করেন। প্রজারা এই দিনে খাজনা দিতে আসতেন এবং পরবর্তী নতুন বছরের জন্য জমি পত্তন নিতেন। এ উপলক্ষে জমিদারগণ প্রজাদের খাজনা আদায়সহ হরেক রকমের সুস্বাদু মহাভোজন আয়োজনের ব্যবস্থা করতেন। পরবর্তীতে একই ধরণের রীতিতে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও জন্ম হয় এক নতুন অনুষ্ঠানের-যার নাম হালখাতা। সারা বছর ক্রেতারা বাকিতে কেনাকাটা করে বছরের নতুন দিনে অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে পাওনা পরিশোধ করবে। বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের সুস্বাদু মিষ্টি এবং খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কালাবর্তে পয়লা বৈশাখ আর নববর্ষ আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। বৈশাখের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে জমে উঠে বৈশাখী মেলা ও লোকজ উৎসব। নতুন উৎসবের আনন্দে মুখর হয়ে উঠে সমগ্র বাংলাদেশ। }} ৪ পাতার ৩ কলাম 
নববর্ষে বাঙালির ঘরে ঘরে মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরীর ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। নববর্ষ উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে বাংলা নববর্ষেও মূল উৎসব ছিল হালখাতা। বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়েরা এদিনে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা ও ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে অতি প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বাস করে আসছেন। তাই এই দিনে হিন্দুরা বাড়ি-ঘর ধোঁয়ামোছা ও স্নানাদি সেরে পূত-পবিত্র হয়।
বাংলা নববর্ষ বা বৈশাখী মেলা বাঙালির এক চিরায়ত মিলনমেলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে হাজার হাজার বছর ধরে বাংলার লোকায়ত জনগোষ্ঠি এই উৎসব পালন করে আসছে। সুপ্রাচীনকালে বৈশাখ আসতো বিশাখা নক্ষত্রের সংযোগে। এর অর্থ হচ্ছে উৎপাদন, সম্মিলন, উপভোগ, আয়োজন ও বন্ধন। বাঙালির এই চিরায়ত কর্মকান্ড ও অতিথিপরায়ণতা এই বৈশাখ বা নববর্ষেরই অবদান। বছর ঘুরে আবার এলো নববর্ষের দিন বাঙালির প্রাণের উৎসব। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের লোকায়ত মানস আর আমাদের জীবনের প্রবাহকে একসঙ্গে উপলব্ধি করার দিন। সম্মিলিত প্রাণের সাড়া আমাদের উৎসাহিত করে আলস্য ঝেড়ে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে যেতে। পুরানো সরিয়ে রেখে সামনের উজ্জ্বলতাকে বরণ করে নিতে। পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনকে আবাহন করার আকাংখা থেকেই পালিত হয়ে আসছে বর্ষবরণ-উৎসব। নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশায় নতুনকে বরণ করার এই রীতি বাঙালি জাতীয়তাবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। পহেলা বৈশাখ নানা ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কোথাও এর উপলক্ষ ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত, কোথাও আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে। পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজনের মধ্যে বাঙালির হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য প্রতিফলিত হয়। সঙ্গত কারণে বাঙালি জাতিসত্তা-অনুভূতি নবায়নের দিনও এটি। বাঙালির আত্মানুসন্ধানে বারবার আমাদের ফিরে যেতে হয় লৌকিক বিশ্বাস আশ্রিত গ্রাম্য সংস্কৃতি ও লৌকিক উৎসবের গভীরে।
বাঙালির যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে তা ধারণ করে জীর্ণ পুরাতনকে সরিয়ে নতুন সত্তায় জাগ্রত হয়ে নবজাগরণ, পরিবর্তমান-সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জীর্ণ-পুরাতনকে সরিয়ে নতুন সত্তায় জাগ্রত হওয়ার উৎস সন্ধানের মাধ্যমে সোনালী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় পহেলা বৈশাখ। গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় হোক এবারের পহেলা বৈশাখের প্রেরণা।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

কুরবানীর ইতিহাস ও বিধান

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:৩৯

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

ঈদুল আযহা : তাৎপর্য

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৯







জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

জবাইয়ে যে ভুল করলে কুরবানী হয় না

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৬

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

গরুর মাংসের সাদা ভুনা

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:১৪

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

পোলাওয়ের সাথে মাটন কোফতা কারি

১১ অগাস্ট, ২০১৯ ০০:০৯


ব্রেকিং নিউজ