খুলনা | রবিবার | ২৬ মে ২০১৯ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ |

শিরোনাম :
দলে অনুপ্রবেশকারী কোন জামায়াত-বিএনপিকে আ’লীগের টিকিট দেয়া যাবে না : মিজানজনগণের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রীসাতক্ষীরায় প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের একাধিক চক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে জনতার বিক্ষোভের মুখে দুই কর্মকর্তাসহ ৮ পুলিশ প্রত্যাহার : তদন্ত কমিটিধান কেনায় আরো ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি বিএনপি’রখুলনা চেম্বারে ফের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হতে যাচ্ছেন কাজী আমিনচার মাসে বন্দুকযুদ্ধে ১১৮ নাগরিক নিহত নারী ধর্ষণ ৩৫৪, শিশু ২৩৪ : গুম ৬ নির্বাচন কমিশনই এই নির্বাচনের ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ ‘ওপেন গেম’ খেলেছে ওরা : মমতার অভিযোগ 

Shomoyer Khobor

ফতে’র পান্তা ইলিশের গল্প

শফিক শিমু | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৬:০০

ফতে’র পান্তা ইলিশের গল্প


চৈত্রের এই খর রোদে করিম চাষির মাথার উপর সূর্য ডগবগ করছে। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে শ্রাবণের বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছে। আর মাঝে মধ্যে লাঙ্গলের তাড়া শক্ত করে ধরে হালের বলদকে বলছে ‘ডি ডি ডি ডানি যা, সোজা আইল বরাবর যা। আর এক পালো চষে তোদের জিরান দিব, যা।’ বলে গরুর পিঠে চড় দিয়ে গরু তাড়াতে শুরু করে। 
এমন সময় পথচারী কালু হাঁক দিয়ে বললো, ‘করিম ভাই হালের বলদের একটু জিরান দেন। চৈত্রের এ রোদে গরুর জিভ বের হয়ে যাচ্ছে। আর তোমার গতর থেকেও তীরঘাম ছুটে যাচ্ছে।’ তখন করিম বলল, ‘আরে হাটখুঁড়ো কালু তোর তো ছেলে-পুলে নেই, তুই কি করে বুঝবি ছেলে-পুলের বায়না।’ 
তখন কালু কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো, ‘করিম ভাই কি হয়েছে একটু খলোসা মনে বলত।’ করিম হাল ছেড়ে দিয়ে গরু মেহগনি গাছের ছায়ায় বেঁধে মাজার গামছা খুলে হাত-মুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘এইহ্যানে বস কালু। দম ছেড়ে দম নিয়ে বলল, হাল চাষ কি আমি সাধে করি। আমাকে হাল চাষ করাই।’ করিমের এমন আক্ষেপে কালু প্রশ্ন করল, ‘ক্যান করিম ভাই, ভাবীর সাথে তোমার বকাবকি হয়েছে?’ তখন করিম বললো, ‘না রে কালু না। 
আমার বাপ দাদার আমলেও এহেন কথা শুনিনি। এখনকের পুলা-পাইলা যে সব আবদার করে তা পূরণ করা কি করে সম্ভব কালু।’ কালু আবারও বললো, ‘আরে কি হইছে?’ করিম তখন গড় গড় করে বলতে শুরু করল। ‘পুলা কইল দু’দিন বাদে পহেলা বৈশাখ। পুলার কথায় সুর দিয়ে মেয়েডা কইল বাপজান এবার বৈশাখে আমাদের পান্তা ইলিশ খাওয়াবা।’ 
হ্যাঁরে কালু মাইয়াডার কথা না করতে পারলাম না। তাই ভরদুপুরে খইরার জমিতে হাল দিতেছি।’ করিমের এসব হৃদয়ভারাক্রান্ত কথা শুনে কালু চলে গেল কিন্তু কোন জবাব দিলো না। করিম বিকেল পর্যন্ত হাল চাষ করে বাড়ি ফিরলো। গরু গোয়াল ঘরে বেঁধে কাঁধে গামছা রেখে বউকে বললো, ‘কই গেলে ফতের মা? আমারে খাউন দাও। দ্যাখি সকাল সকাল বাজারে গিয়ে একটা ইলিশ কেনা যায় কিনা।’ 
করিম খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সদাই করার ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে রওনা হলো গঞ্জের বাজারে। খেয়া ঘাটের পাঁড়ে ছোট একটা বাজার। বাজারে মাছ, মাংশ, তরিতরকারী সবই পাওয়া যায়। কিন্তু সন্ধ্যার পর পরই হাট ভেঙে যায়। কেন না বেশি রাত হলে পথে চুরি-ছিনতাইসহ ডাকাতির ভয়। করিম হাল চাষের তিনশ’ টাকা মুজুরি নিয়ে প্রথমেই মাছ বাজারে ঢুকলো। ঘুরে ঘুরে কয়েকটা ইলিশের দোকান দেখলো। 
বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশের দাম চড়া হওয়ায় কিনতে সাহস পাচ্ছে না। এদিকে ছেলে-মেয়ের আবদারও ভুলতে পারছে না করিম চাষি। এবার সাহস করে একটা ইলিশ উঁচু করে দাম জিজ্ঞাসা করলো। দোকানী চারশ’ টাকা কেজি বলতেই যেন হাত থেকে মাছ পড়ে গেল। করিম বলল, ‘কম হয় না।’ দোকানী বলল, ‘পরশুদিন বৈশাখ কম কোথাও পাবে না।’ ইলিশের এমন চড়া দর শুনে অন্য বাজার সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরলো করিম চাষি। 
সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলে-মেয়েদের বললো, ‘কাল বৈশাখ, আজ রাতে তোমাদের জন্য ইলিশ কিনা আনবো। তুমরা সহালে পান্তা ইলিশ খাইবা। করিম চাষির এমন প্রতিশ্র“তি শুনে ছেলে-মেয়ের আনন্দ আর ধরে না। ছেলে বললো, ‘কি আনন্দ বুবু। সকালে আমরা পান্তা ইলিশ খাব।’ এরপর করিম আর কথা না বলে বউকে বললো, লাঙ্গল জোয়াল বের করে রাখতে। এক খিলি পান মুখে দিয়ে লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে আর হালের গরুর মুখে ঠুসি পরিয়ে চললো জমি চষতে। 
জমিতে কয়েক আতর চাষ দিতে না দিতে বে-খেয়ালে ডান পাশে গরুর পায়ে ফাল লেগে যায়। ফালের যন্ত্রনায় গরু হাঁটতে পারছে না। চাষও দিতে পারছে না। করিম গরুর পা দিয়ে রক্ত ঝরা আর খুড়ানো দেখে হাল চাষ বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলো। বউকে বললো রসুন আর শুকনা ঝালের গরম তেল দিতে। গরম তেল আস্তে আস্তে গরুর পায়ে দিয়ে কাপড় বেঁধে দিলো। তারপর বিকেলে আবারও বাজারের ব্যাগ নিয়ে রওলা হলো বাজারে। 
আজ বাজারে ঢুকেই দেখলো একটা দোকানে ইলিশ মাছ ছাড়া অন্যকোন দোকানে ইলিশ নেই। করিম চাষি দুঃশ্চিন্তায় পড়লো। তারপরও দোকানীর কাছে গিয়ে ইলিশের দাম জিজ্ঞাসা করলো। দোকানী বললো, ‘চারশ’ টাকা কেজি।’ একথা শুনে করিম চাষি আরো দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। ভাবলো কাল না কিনে ভুল করলাম। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। বুদ্ধি কাজে লাগাতে এক সেরের বেশি ওজনের একটা সিলভার কার্প কিনলো একশ’ টাকা দিয়ে। সিলভার কার্প নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে বউকে সব ঘটনা বললো। আর একথাও বললো, মাছ একটু বড় বড় করে কেটে ডুবা তেলে ভাঁজবে আর ভাতে পানি দিয়ে রাখতে। ফতের মা করিম চাষির কথামতো সব ঠিকঠাক করে রাখলো। 
সকালে ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে পরিবারের সবাই একসাথে খেতে বসলো। করিম চাষির বউ পান্তা ভাত, মাছ ভাজি আর শুকনা মরিচ ভাজির সাথে কাঁচা পেঁয়াজ দিলো। ছেলে-মেয়ে খুব আনন্দ করে খেতে খেতে ছেলে বললো, ‘বাপজান আমাদের কথা রাখল বুবু। এবার পাড়ায় খেলতে খেলতে আমিও বলবো বৈশাখে আমারাও পান্তা ইলিশ খেয়েছি।’ তখন মেয়ে বললো, ‘বাবা ইলিশের স্বাদ এমন কেন ?’ করিম চাষি কোন কথা না বলে চোখ মুখ মুছে চুপচাপ থাকলো। তখন মেয়ে আবারও বললো, ‘ও বাবা বলো না ইলিশের স্বাদ এমন কেন?’ এবার করিম চাষির বউ বললো, ‘সব কথা শুনতে নেই, খেয়েনে।’ মেয়ে নাছোড় বান্দা হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলো, এবার করিম চাষি মুখ খুলে বলল, ‘এটা দেশি ইলিশ মা। তাই স্বাদ একটু কম।’ 
বিকেলে সালাম শেখের মেয়ের সাথে খেলতে খেলতে ফতে বলল, ‘জানো ফুলি আমার বাপজান কাল হাট থেকে দেশি ইলিশ আনছিলো। আমরা সকালে পান্তা ইলিশ খেয়েছি।’ ফুলি একথা শুনে হো হো করে হেসে দিয়ে বললো, ‘তুমি জান ফতে ওটা ইলিশ না, ওটা সিলভার কার্প মাছ।’ একথা শুনে ফতে ছুটে এলেন বাড়ি। মাকে ফুলির কথা বললেন। মা তখন সত্য কথা বলে ফতেকে বুঝালেন। ফতে সবকথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বাপজানের আর কষ্ট দিব না মা। আর কোনদিন পান্তা ইলিশ খেতে চাইব না।’ ফতের মা তখন ফতের মাথায় হাত বুলিযে শান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘মন খারাপ করতে নেই মা। একদিন তোরা বড় হয়ে ঠিক ঠিক পান্তা ইলিশ খাবি। আমাদের কথা মনে করবি। যা মা রাগ করিস নে, খেলে আয়।’ 
ছোট বেলার সেই গল্প গড় গড় করে বলতে লাগলো ফতে। আজও ভুলে যায়নি ছোট বেলার স্মৃতি। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ এলেই বার বার মা, বাবাসহ সেই স্মৃতি মনে পড়ে। গা শিউরে উঠে। এসব ছোট বেলার স্মৃতি বলতে বলতে ফতের মেয়ে হাসিকে আরো এক পিচ ইলিশ ভাজি দিয়ে বললো, ‘নে মা পেট ভরে খা। তুইও একদিন আমার মতো তোর ছেলে-মেয়েকে এসব গল্প বলবি।’   
লেখব, আইসিটি সম্পাদক
মণিরামপুর প্রেসক্লাব।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বৈশাখ ও বাঙালি : নববর্ষ ১৪২৬

বৈশাখ ও বাঙালি : নববর্ষ ১৪২৬

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

বৈশাখী ভাবনা

বৈশাখী ভাবনা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৪০


বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা

বাঙালির পহেলা বৈশাখ ভাবনা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৮

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

বাঙালিত্ব একদিনের নয়

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ খেলাধুলা

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৭

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’

বাঙালির ঐতিহ্য ‘পহেলা বৈশাখ’

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

রঙ্গিন বৈশাখ

রঙ্গিন বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৬

বৈশাখের হাওয়া

বৈশাখের হাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

বৈশাখী মঙ্গলযাত্রা এবং

বৈশাখী মঙ্গলযাত্রা এবং

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৫

জোৎস্না রাত

জোৎস্না রাত

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৪

বৈশাখ হোক বৈশাখের মত

বৈশাখ হোক বৈশাখের মত

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩৪


ব্রেকিং নিউজ