আজ বিক্ষোভ মিছিল, কাল থেকে ৯৬ ঘন্টার ধর্মঘটসহ অবরোধ


বাঙালির সার্বজনীন একটি লোকউৎসব পহেলা বৈশাখ। এদিন সবাই যখন বৈশাখী উৎসবে মেতে উঠবে, তখন ন্যায্য দাবি আদায়ে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করতে হচ্ছে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের। বছর ঘুরে বৈশাখ আসলেও উৎসব নেই এসব শ্রমিকদের মাঝে। অন্যরা (সরকারি চাকুরিজীবী) যেখানে উৎসব ভাতা পেয়ে পরিবার নিয়ে বৈশাখী উৎসব পালন করছে। সেখানে ঘাম ঝরিয়ে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ও মজুরি কমিশনসহ ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নামতে হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের দিন অনেকেই পান্তা-ইলিশ খেয়ে দিনের সূচনা করবেন, অথচ ৬ থেকে ১০ সপ্তাহ মজুরি না পাওয়া পাটকল শ্রমিকরা রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল বের করবেন। শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি না পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন অতিবাহিত করছেন। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচতো দূরের কথা তিন বেলা মুখের আহার যোগাতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে। এমন দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের নেই বৈশাখী উৎসব। গতকাল শনিবার দুপুরে খুলনার বিভিন্ন পাটকল শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এমন দুর্দশার কথা জানা গেছে। 
খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক আব্দুল জলিল বলেন, কিসের পহেলা বৈশাখ, যেখানে দু’বেলা খাবার জুটছে না সেখানে উৎসব আসবে কোথা থেকে। সপ্তাহে মজুরি পেয়ে সেই টাকা দিয়ে পরিবার চলে। এখন মজুরি নেই ১০ সপ্তাহ। ঘরে বাজার নেই, সদাই নেই। ছেলে-মেয়েদের মুখে কি দিবো। দোকানদাররা প্রথম দিকে বাকী দিলেও এখন আর দিতে চায় না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অতিকষ্টে দিন পার করছি। এ যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। 
প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক নূর ইসলাম বলেন, সাধারণ দিনের মতোই পহেলা বৈশাখ। অন্যদের কাছে উৎসবের হলেও আমাদের কাছে কষ্টের। মিলে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া। উৎসবের দিনে ডাল-ভাত খাবো, তাও জুটছে না। ছেলে-মেয়েদের দাবি পূরণ করতে পারছি না। 
একই মিলের শ্রমিক মিজানুর রহমান বলেন, কিসের বৈশাখ। শ্রমিকদের মাঝে কোন আনন্দ নেই। পেটের ক্ষুধাই রাজপথে নেমেছে। এদিন দাবি আদায়ের আন্দোলনে সকালে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করবো। ছেলে-মেয়েদের প্রথম সাময়িক পরীক্ষা সামনে। তাদের মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি পরিশোধ করতে পারছি না। যেখানে সরকারি চাকুরিজীবীরা উৎসব ভাতা পাচ্ছে, সেখানে আমাদের ন্যায্য মজুরিই মিলছে না। 
বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের আহ্বায়ক মোঃ সোহরাব হোসেন জানান, শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি পাচ্ছে না। আর মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের সঙ্গে শ্রমিকদের রুটি-রুজি জড়িত। এ অবস্থায় পরিবার নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনেও মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাটকল শ্রমিকরা অবহেলায় রয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামতে হয়েছে। 
বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগের খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক মোঃ মুরাদ হোসেন বলেন, শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। উৎসব বলে কিছুই নেই। রবিবার পহেলা বৈশাখ হলেও সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামীকাল  থেকে ১৮ এপ্রিল টানা ৯৬ ঘন্টা পাটকল ধর্মঘট এবং প্রতিদিন কাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা করে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ। আগামী ২৫ এপ্রিল গেটসভা এবং ২৭, ২৮ ও ২৯ এপ্রিল ৭২ ঘন্টার পাটকল ধর্মঘটসহ প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টা করে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।  
ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্প প্রধান গাজী শাহাদাৎ হোসেন জানান, আর্থিক সংকটের কারণে শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। মিলের শ্রমিকদের ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে শ্রমিকদের প্রায় ৯০ লাখ টাকা মজুরি দিতে হয়। সেই অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রায় ৯ কোটি টাকার শুধু মজুরি বকেয়া পড়েছে। তবে সোমবার শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। 
পাটকলগুলোর কর্মকর্তারা জানায়, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত খালিশপুর, দৌলতপুর, ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, স্টার, ইস্টার্ণ, আলীম, জেজেআই ও কার্পেটিং মোট ৯টি জুট মিলের প্রায় ৩৩ হাজার শ্রমিক রয়েছে। তাদের ৬ থেকে ১০ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে তাদের নিয়মিত মজুরি প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে মিলগুলোতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার উৎপাদিত পাটজাত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হলে শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হতো।    
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মোঃ সাজ্জাদ হোসেন জানান, খুলনা অঞ্চলের ৯টি পাটকলের শ্রমিকদের ৪২ কোটি টাকার মজুরি এবং কর্মচারী-কর্মকর্তাদের আরো ১০ কোটি টাকার বেতন বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিষয়টি বিজেমমসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। শিগগিরি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশাবাদী। 


footer logo

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।