খুলনা | সোমবার | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৮ আশ্বিন ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

কারাগার থেকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল অধ্যক্ষ সিরাজ

নুসরাতের গায়ে সরাসরি আগুন দেয়  শামীমসহ ৪ জন : দু’নারীসহ জড়িত ১৩

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:০৭:০০

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল ওই মাদ্রাসার শিক্ষক সিরাজ উদ দৌলা। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। আর নুসরাতের গায়ে সরাসরি আগুন দেয় চারজন। তাদের মধ্যে একজন ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম। আরেকটি মেয়ে ছিল (যার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে)। আগুন দিয়ে মাদ্রাসার মূল গেট দিয়েই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেড কোয়ার্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। ব্রিফিং করেন পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।
জড়িত ১৩ : নুসরাত জাহান রাফির গায়ে অগ্নিসংযোগ করে হত্যার ঘটনার সঙ্গে ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত সাতজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নুসরাতের গায়ে সরাসরি আগুন দেয় যে চারজন তার মধ্যে এক নারীসহ দুইজনকে চিহ্নিত করা গেছে। এই দুইজনের একজন শাহাদাত হোসেন শামীমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাকে এখনও পিবিআই’র কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। পিবিআই তাকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনকে গ্রেফতারের অভিযানে আছে।
গ্রেফতার যারা : এজাহারভুক্ত সাতজন গ্রেফতার আছে। তারা হলো মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা (৫৫), মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন (২০) ও শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৪৫), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯) এবং আফসার উদ্দিন (৩৫)। এজাহারে নাম উল্লেখ থাকা হাফেজ আবদুল কাদের পলাতক আছে। বাকি পাঁচজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সন্দেহভাজন যে ছয়জন গ্রেফতার আছে তারা হলো কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ও আলাউদ্দিন। পুরো ঘটনায় দুই নারীর সম্পৃক্ততা পেয়েছে পিবিআই।
যেভাবে পরিকল্পনা : ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত ৪ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। এদের মধ্যে ছিল শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন। দেখা করার পর সিরাজের নির্দেশে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শামীম নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয়। কীভাবে হত্যা করা হবে পরে নূরউদ্দিন ও শামীমের নেতৃত্বে তার বিশদ পরিকল্পনা করা হয়।
দুই কারণে হত্যার পরিকল্পনা : দুই কারণে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলা করে নুসরাত আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করে তারা। আরেকটি কারণ হলো শামীম দীর্ঘদিন ধরে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। নুসরাত তা বারবারই প্রত্যাখ্যান করছিল। এই ক্ষোভ থেকে শামীম তাকে পুড়িয়ে হত্যার প্রস্তাব দেয়। দুই কারণ মিলিয়ে নুসরাতকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
যেভাবে হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন : ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার আগেই (আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে) ওই মাদ্রাসায় লুকিয়ে ছিল হত্যাকারীরা। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে দু’টি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল তারা। চার হত্যাকারীর মধ্যে যে মেয়েটি ছিল সেই মেয়েই বাকি তিনজনকে বোরকা ও কোরোসিন এনে দেয়। আর চম্পা নামের একটি মেয়ে (পঞ্চম জন) পরীক্ষার হলে গিয়ে নুসরাতকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই কথা শুনে নুসরাত দৌড়ে ছাদে যায়। এরপর তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সবার সামনে দিয়ে পালায় হত্যাকারীরা : হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। 
পিবিআইয়ের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নুর, হাফেজ আবদুল কাদেরসহ পাঁচজন গেট পাহারা দিচ্ছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে মাদ্রাসার বাইরে লোকজনের মধ্যে বোরকা পরে বের হয়ে যান শাহাদাতসহ অন্যরা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গা ঢাকা দেয়।
বোরকা পরা চারজনের তিনজনই পুরুষ : মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়ার সময় উপস্থিত বোরকা পরা চারজনের তিনজনই ছিল পুরুষ। অন্য একজন নারী সদস্য। তারা সবাই ওই মাদ্রাসার বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার প্রস্তাবটি ছিলো শাহাদাত হোসেন শামীমের (২০)। এই হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া বোরকা পরা তিন পুরুষের একজন সে। তাকে আটক করেছে পিবিআই।
ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সাংবাদিকদের আরও জানান, রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার একদিন আগে (৫ এপ্রিল) সোনাগাজীর একটি হোটেলে অবস্থান করে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, হাফেজ আবদুল কাদের ও জাবেদ হোসেনসহ পাঁচজন। সেখানে বসেই রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, সেই বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তারা আরও পাঁচজনকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। যাদের মধ্যে দু’জন মেয়েও ছিল। তাদের একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহের জন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন শামীমের কাছে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহ করে মেয়েটি।
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এঁদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ আটজন গ্রেফতার রয়েছেন। বাকি আরও অনেকের নাম উঠে আসতে পারে। তবে পরিকল্পনাকারীরা ২০১৬ সালে নুসরাতের চোখে চুন মেরেছিল। তখন মেয়েটির হাসপাতালে চিকিৎসা হয়। এরপর ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। সেসব ঘটনা তারা সামাল দিয়েছিল। এবারও তাই নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেন নুর, শাহাদাতেরা।
মাদ্রাসার ছাত্রলীগের সভাপতি শামীম গ্রেফতার : নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আরেক আসামি সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রলীগের সভাপতি (অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ঘোষিত কমিটি) শাহাদাত হোসেন শামীমকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শুক্রবার রাত ১২টার দিকে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে পিবিআই ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মোঃ মনিরুজ্জামান জানিয়েছে। তিনি আরও জানান, গ্রেফতারের পর তাকে ফেনীতে আনা হচ্ছে। 
নুসরাত হত্যার প্রধান আসামি বারবার খোলস বদলানো ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার নিজস্ব বলয়ের অন্যতম সদস্য শামীম। এই হত্যাকান্ডে জড়িতদের একজন। ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিল এই ছাত্রলীগ নেতা।
প্রসঙ্গত গত ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষার কেন্দ্রে গেলে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে পালিয়ে যায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা।  এ সময় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ- দৌলার বিরুদ্ধে করা যৌন হয়রানির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নুসরাতকে চাপ দেয় তারা। পরে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে সবার প্রার্থনা-চেষ্টাকে বিফল করে ১০ এপ্রিল রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান প্রতিবাদী নুসরাত।
জাবেদ সাতদিনের রিমান্ডে : নুসরাত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি জাবেদ হোসেনকে আদালতে উপস্থাপন করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের শাহ আলম।  ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক জাকির হোসেন আসামি জাবেদ হোসেনের সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর ও মামলার ৪ নম্বর আসামি মাকসুদ আলমের রিমান্ডের শুনানি সোমবার অনুষ্ঠিত হবে।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









দেশ জুয়াড়িদের হয়ে গেছে : ফখরুল

দেশ জুয়াড়িদের হয়ে গেছে : ফখরুল

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:১৯





ব্রেকিং নিউজ











কয়রায় সাবেক ইউপি মেম্বরকে কুপিয়ে জখম

কয়রায় সাবেক ইউপি মেম্বরকে কুপিয়ে জখম

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:৪৬