খুলনা | বুধবার | ১৯ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬ |

Shomoyer Khobor

নিউজপ্রিন্ট মিলের ৫০ একর জমি হস্তান্তর না হলেও বিক্রির চেষ্টা!

নিজস্ব প্রতিবেদক  | প্রকাশিত ০২ এপ্রিল, ২০১৯ ০১:৩০:০০

খুলনায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের ৫০ একর জমি কেনার চুক্তি করেছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড। গত ১১ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর হলেও জমির কোনো কাগজ এখনও বুঝে পায়নি কোম্পানিটি। কিন্তু ওই জমির মধ্যে থাকা নিউজপ্রিন্ট মিলের সব স্থাপনা ও গাছপালা যেখানে যে অবস্থায় আছে তা বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে নর্থ-ওয়েস্ট কোম্পানি। 
এদিকে ঋণ নেওয়ায় বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট মিলের সব স্থাপনা ও জমি ওই ব্যাংকটির কাছে দ্বায়বদ্ধ। ফলে টেন্ডার নোটিশ চোখে পড়ার পর পরই সোনালী ব্যাংক বিসিআইসি’কে চিঠি দিয়ে কীভাবে ওই টেন্ডার প্রক্রিয়া আহ্বান করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছে। ব্যাংকের কাছে দ্বায়বদ্ধ থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশ বিশেষ বিক্রি করা যায় না বলেও জানিয়ে দিয়েছে তারা। সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধ না হলে এবং ওই জমির কোনো কিছুর ক্ষতি সাধন করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য বিসিআইসি বলছে ঋণের মূল টাকা ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়েছে। আর সুদের টাকা মওকুফের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। 
অন্যদিকে গত ১২ মার্চ শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ খালেকুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে জমির মালিকানা হস্তান্তর না হওয়ার পরও নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় কঠোর সমালোচনা করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, যেহেতু নর্থ-ওয়েস্ট কোম্পানির কাছে এখনও ৩৮৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে তাই ওই জমি, স্থাপনা ও গাছপালার মালিকানা স্বত্ত্ব এখনও হস্তান্তর হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নিলামের বিক্রয়লব্ধ অর্থ বিসিআইসি’র বকেয়া পাওনার সঙ্গে সমন্বয় এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিসিআইসি’র একজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সম্প্রতি নিউজপ্রিন্ট মিলের মধ্যে গিয়ে দেখা যায়, মিলের দক্ষিণ পাশে মূলতঃ আবাসিক এলাকা। সেদিকে এদিয়ে যেতেই দেখা যায় বড় একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘রূপসা ৮০০  মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের নির্ধারিত স্থান, সংরক্ষিত এলাকা, অনুমতি ব্যতিত প্রবেশ নিষেধ’। আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখা মেলে নর্থ-ওয়েস্ট  কোম্পানির তল্লাশী চৌকির। সেখানে থাকা নিরাপত্তা প্রহরীরা ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। অনুমতি ছাড়া ওই সীমানার মধ্যে প্রবেশ করা যাবে না বলে জানান তাঁরা। তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভেতরে ঢুকতে অনুমতি নিতে হবে নর্থ-ওয়েস্ট কোম্পানির। 
নর্থ-ওয়েস্ট ও নিউজপ্রিন্ট মিলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা নগরের  গোয়ালখালীতে ২৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে নর্থ ওয়েস্ট কোম্পানির। আরও ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য খুলনায় একটি সরকারি জমি খুঁজছিল  কোম্পানিটি। পরে নিউজপ্রিন্ট মিলের অভ্যন্তরে পড়ে থাকা আবাসিক এলাকার ৫০ একর জমি পছন্দ হয় তাদের। নিউজপ্রিন্ট মিলের বিক্রি করা ৫০ একর আবাসিক এলাকার মধ্যে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, সেগুন, সিরিজসহ বিভিন্ন প্রজাতির এক হাজার ৪৯৭টি গাছ। ওই গাছগুলো বয়স ২০ থেকে ৫০ বছর। এ ছাড়া রয়েছে কয়েকটি আবাসিক ভবন, কর্মকর্তাদের বাংলো, মিলনায়তন, শ্রমিক কলোনি, মসজিদ, স্কুল ও মাদ্রাসা। 
এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিআইসি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কয়েকদফা ত্রি-পক্ষীয় আলোচনা হওয়ার পর ওই জায়গা নর্থ-ওয়েস্টকে দিতে সম্মত হয় বিসিআইসি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ৫০ একর জমির মধ্যে যা কিছু আছে তা সহ ৫৮৬ কোটি ৫২ লাখ টাকায় বিক্রি করবে বিসিআইসি। তবে ওই জমির সীমানার মধ্যে থাকা একটি বিদ্যালয় ও একটি মসজিদ সীমানার বাইরে নিউজপ্রিন্ট মিলের অন্য জায়গায় স্থাপন করে দেওয়ার কথা নর্থ-ওয়েস্টের।  
গত ১১ ডিসেম্বর চুক্তি হওয়ার পরপরই ২০০ কোটি টাকা বিসিআইসিকে বুঝিয়ে দেয়  কোম্পানিটি। এরপর চলতি বছরের ফেব্র“য়ারি মাসের ৫ ও ৬ তারিখে দু’টি পত্রিকায় ওই সীমানার মধে যা কিছু তাছে তা বিক্রি করতে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নর্থ-ওয়েস্ট  কোম্পানি। ওই নিলাম বিজ্ঞপ্তি সোনালী ব্যাংকের নজরে আসার পরপরই নড়েচড়ে বসে ব্যাংকটি। ২৭ ফেব্র“য়ারি ব্যাংকের কাছে দ্বায়বদ্ধ থাকা সম্পত্তির কীভাবে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলো তা জানতে চেয়ে বিসিআইসি’র চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় সোনালী ব্যাংক। ওই চিঠিতে দ্রুত ব্যাংকের সব দায় দেনা পরিশোধের অনুরোধ জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আর দ্বায় দেনা পরিশোধ না করে নিউজপ্রিন্ট মিলের কোনো স্থাপনা বা কোনো কিছুর ক্ষতি করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুমকি দেয় ব্যাংকটি।  
সোনালী ব্যাংকের খুলনা করপোরেট শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে নিউজপ্রিন্ট মিল প্রায় ৭২ কোটি টাকা ঋণ নেয় সোনালী ব্যাংকের খুলনা করপোরেট শাখা থেকে। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদসহ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭০ কোটি ৭০ লাখ টাকারও  বেশি। এর মধ্যে চুক্তি হওয়ার পর গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ৫৫ কোটি  ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা পরিশোধ করে বিসিআইসি। 
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সব মিলিয়ে ওই জমির বর্তমান মূল্য এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু প্রায় ‘পানির দামে’ তা বিক্রি করা হয়েছে। 
সোনালী ব্যাংকের খুলনা করপোরেট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) বিভাশ চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ওই জমি এখনও সোনালী ব্যাংকের কাছে দ্বায়বদ্ধ। কিন্তু পুরো সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধ না করেই সেখানকার নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, এটা সম্পূর্ণ  বেআইনি।  নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে তাঁদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা করা হয়নি বলে জানান তিনি। 
জানতে চাইলে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার মজুমদার বলেন, জমি হস্তান্তর চুক্তি হয়েছে কিন্তু পুরো টাকা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে  সোনালী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তারাও নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে পুরো টাকা পরিশোদের জন্য চিঠি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুরো ব্যাপারটি নির্ভর করছে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ওপর। 
বিসিআইসি’র পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) মোঃ শাহিন কামাল বলেন, চুক্তি অনুযায়ী প্রথমেই ২০০ কোটি টাকা দিয়েছে নর্থ-ওয়েস্ট কোম্পানি। আগামী অর্থবছরে বাকী টাকা পরিশোধ করবে। যে ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে তা দিয়ে ব্যাংকের ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করা হয়েছে। ঋণের বাকি টাকা মওকুফ করে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় ওই সমস্যা তৈরি হয়েছে।     
নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের নির্মাণাধীন রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প প্রধান মোঃ মশিউর রহমান বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণের কাজটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া দরকার। এ কারণে চুক্তি হওয়ার পরই সেখানকার জায়গা খালি করতে ওই নিলাম বিজ্ঞপ্তি আহ্বান করা হয়, তবে তা এখনও প্রক্রিয়াধীন। কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ